আদিবাসী ফোরাম প্রসঙ্গে

মিথুশিলাক মুরমু

গত ২৮ এপ্রিল রাজধানী ঢাকার আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম’-এর ৫ম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই সময়ে ‘উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরাম’ দিনাজপুর ফুলবাড়ীতে ভূমি অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে থানা ও জেলা পর্যায়ের নেতাদের নিয়ে সেমিনারের আয়োজন করেছিল। উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট প্রভাত টুডু, মেল্কিসেদেক হাঁসদাসহ বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা পর্যায়ক্রমে রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও সফর করেছেন। প্রত্যেকটি জায়গায় জেলার নেতাদের নিয়ে আগামীর আন্দোলনের দিক-নির্দেশনা, সম্ভাব্য উদ্যোগ ও কার্যসূচি সম্পর্কে মতবিনিময় করে নিজেদের বন্ধনকে আরো শক্তপোক্ত করার চেষ্টা করে চলেছে।

সাধারণভাবেই কতকগুলো প্রশ্ন দেখা দেয়- ‘উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরাম’ কী ‘বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম’-এর চার্টার্ড মেম্বার নয়। উত্তরবঙ্গের ‘জাতীয় আদিবাসী পরিষদ’ দীর্ঘদিন থেকেই বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের চার্টার্ড মেম্বার, তাহলে কী জাতীয় আদিবাসী পরিষদ উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের প্রাণের কথা, জীবনের দাবি-দাওয়া, নৈমিত্তিক নিরাপত্তার বিষয়ে যত্নশীল নয়? অপরদিকে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের নেতাদের উপেক্ষা, উদাসীনতার মতো অন্য কোনো কারণ লুকিয়ে আছে কিনা- সেটিও ভাববার বিষয়।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের ৫ম জাতীয় সম্মেলনের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিলো- ‘আদিবাসী জনগণের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি জোরদার করুন’। প্রতিপাদ্যটি সময়ের বিবেচনায় প্রণিধানযোগ্য। উত্তরবঙ্গের বিস্তৃর্ণ ভূমিতে প্রায় ২০ লক্ষাধিক আদিবাসীদের বসবাস। সেখানকার আদিবাসীরা বরাবরই পিছিয়ে পড়া, বিচ্ছিন্ন এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠী।

১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে রাজশাহীর তানোর থানার বাবুলডাং আদিবাসী সাঁওতাল পল্লীর উচ্ছেদ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘জাতীয় আদিবাসী পরিষদ’-এর বীজ রোপিত হয়েছিলো। ধারণা করা হয়, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ আদিবাসীদের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাক্সক্ষা, প্রাপ্তি-প্রত্যাশা কিংবা স্বপ্ন-দর্শন পূরণে লেজুড়বৃত্তি করেছে অথবা ফিকে হয়ে পড়েছে। বোধ করি, এরূপ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়েই ২০১২ খ্রিস্টাব্দে ‘উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরাম’-এর জন্ম হয়েছে। এটি নির্মম সত্য যে, অধিকার আদায়ে আদিবাসীরা ঐক্যবদ্ধ না হলে, পারস্পারিক সমঝোতা ও বোঝাপড়া না থাকলে আন্দোলনের তীব্রতা স্থিমিত হয়ে যায়। খুঁজে দেখা দরকার উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের অনৈক্যের মূলে কী আদর্শগত ভিন্নতা বা অন্য কোনো বিভ্রান্তি রয়েছে কিনা। উত্তরবঙ্গের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা হয়েছে। ‘উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরাম’-এর উত্থানের প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলেছি। সাংগঠনিকভাবে কতকগুলো অনৈক্য দেখা গেছে পর্যায়ক্রমে। জাতীয় আদিবাসী পরিষদ জাতিগোষ্ঠী-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের সংহতিতে অগ্রগামী হলেও পরবর্তীতে ধর্ম, ভাষা, জাতিগোষ্ঠী ভেদাভেদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

জাতীয় আদিবাসী পরিষদ দাবি করে, আদিবাসী সাঁওতালরা যারা খ্রিস্টধর্ম অনুসরণ করেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে, তাদের আদিবাসী হিসেবে গণ্য করা যাবে না। পরিষদের দাবি হচ্ছেÑ খ্রিস্টানুসারীরা কোনোভাবেই আদিবাসী হতে পারে না। আদিবাসী পরিষদ এই দাবি করেই ক্ষান্ত হননি, স্থানীয় ইউনিয়ন, উপজেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়েও ‘সনদ’ বা ‘সার্টিফিকেট’ প্রাপ্তিতে বাধাদানের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালিয়েছে। তবে হ্যাঁ, এ বিষয়ে কলকাতা হাইকোর্ট যুগান্তকারী রায় দিয়েছে। আদালত বলেছে, ধর্ম পরিবর্তনের কারণে সাঁওতালদের আদিবাসীর মর্যাদা ক্ষুণœ হয় না।

বাংলাদেশ সরকার ২০১০ খ্রিস্টাব্দে ৬টি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর (সাঁওতাল, উরাঁও, গারো, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা) মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও আদিবাসী অধ্যুষিত বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদানের উদ্যোগ গ্রহণ করে। আমরা দেখেছি, সাঁওতাল ব্যতীত অন্য ৫টি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন এবং পাঠদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, যদিও পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভবপর হয়নি। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, সংখ্যাধিক্য আদিবাসী সাঁওতালদের মাতৃভাষার বর্ণমালা বির্তক আজ পর্যন্ত ফয়সালা হয়নি। বিতর্কের আভ্যন্তরীণ সাবজেক্ট হচ্ছে ধর্ম।

খ্রিষ্টানুসারীদের পছন্দ হচ্ছে ‘সাঁওতালী রোমান বর্ণমালা’, যেটির আবিষ্কার ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে। অন্যদিকে সারণা ধর্মের অনুসারী সাঁওতালদের মতামত হচ্ছে ‘অলচিকি বর্ণমালা’; যেটির শুরু হয়েছে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে। উত্তরবঙ্গের ১২টি জেলার সাঁওতালদের মধ্যে অনৈক্যের অন্যতম এজেন্ডারূপে সামনে এসেছে ধর্ম। জাতীয় আদিবাসী পরিষদ ভাষার বর্ণমালা প্রশ্নেও সংখ্যাধিক্যের মতামতকে উপেক্ষা করে ধর্মকে পুঁজি করে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে ঘোলা জলে মাছ শিকারে ব্যস্ত রয়েছে। ভাষার সমুদ্রে আদিবাসী সাঁওতালদের বর্ণমালার কিরূপ দশা সেটি একই পরিবার কর্তৃক দু’টি বর্ণমালা (বাংলা ও অলচিকি) দাবি পুরো উত্তরবঙ্গের আদিবাসীরা হতবাক হয়ে পড়েছে। এছাড়া আদিবাসী জাতিগত আভ্যন্তরীণ বৈষম্যও ক্রমশই প্রকট হয়ে উঠেছে।

‘বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম’ উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের সমস্যা নিরসনে কিংবা সমাধানে যতটুকু উদ্বিগ্ন বা সক্রিয় হয়ে ওঠেন অন্যস্থানের আদিবাসীদের নিয়ে কি ততটুকু হন- সেটা একটা প্রশ্ন। উত্তরবঙ্গের একাধিক নেতারা বলেছেন, কখনো কখনো কেন্দ্রীয় ফোরামের নেতারা সূক্ষ্মভাবে প্রতিনিধিত্ব সম্পৃক্ততা, উপস্থিতিকে এড়িয়ে গিয়েছেন। এড়িয়ে গেছেন সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এমনকি নেতৃত্বের মানদণ্ডকেও। জাতীয় সম্মেলনে মূলসুর ‘আদিবাসী জনগণের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি জোরদার করুন’- নিঃসন্দেহে এটি ভালো আহবান, সিদ্ধান্ত এবং আন্দোলনের হাতিয়ার। উত্তরবঙ্গের আদিবাসীরা উপলব্ধি করেছে, উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের ঐক্যের দরকার নিজেদের স্বার্থে, অন্যের স্বার্থকে চরিতার্থ করার স্বার্থে নয়। সেই চেতনা থেকেই ‘উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরাম’ সমগ্র উত্তরবঙ্গের ছোট-বড় জাতিগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় সচেষ্ট। নিজেদের মধ্যে পারস্পারিক ভ্রাতৃত্ববোধ, সম্মান, ভালোবাসা, চাওয়া-পাওয়ার বিষয়গুলো একই সুতোয় মেলাতে পারলেই ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব এবং সেটি অটুট থাকবে।

[লেখক : কলামিস্ট]

সোমবার, ১৫ মে ২০২৩ , ০১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০, ২৪ শাওয়াল ১৪৪৪

আদিবাসী ফোরাম প্রসঙ্গে

মিথুশিলাক মুরমু

গত ২৮ এপ্রিল রাজধানী ঢাকার আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম’-এর ৫ম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই সময়ে ‘উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরাম’ দিনাজপুর ফুলবাড়ীতে ভূমি অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে থানা ও জেলা পর্যায়ের নেতাদের নিয়ে সেমিনারের আয়োজন করেছিল। উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট প্রভাত টুডু, মেল্কিসেদেক হাঁসদাসহ বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা পর্যায়ক্রমে রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও সফর করেছেন। প্রত্যেকটি জায়গায় জেলার নেতাদের নিয়ে আগামীর আন্দোলনের দিক-নির্দেশনা, সম্ভাব্য উদ্যোগ ও কার্যসূচি সম্পর্কে মতবিনিময় করে নিজেদের বন্ধনকে আরো শক্তপোক্ত করার চেষ্টা করে চলেছে।

সাধারণভাবেই কতকগুলো প্রশ্ন দেখা দেয়- ‘উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরাম’ কী ‘বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম’-এর চার্টার্ড মেম্বার নয়। উত্তরবঙ্গের ‘জাতীয় আদিবাসী পরিষদ’ দীর্ঘদিন থেকেই বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের চার্টার্ড মেম্বার, তাহলে কী জাতীয় আদিবাসী পরিষদ উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের প্রাণের কথা, জীবনের দাবি-দাওয়া, নৈমিত্তিক নিরাপত্তার বিষয়ে যত্নশীল নয়? অপরদিকে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের নেতাদের উপেক্ষা, উদাসীনতার মতো অন্য কোনো কারণ লুকিয়ে আছে কিনা- সেটিও ভাববার বিষয়।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের ৫ম জাতীয় সম্মেলনের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিলো- ‘আদিবাসী জনগণের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি জোরদার করুন’। প্রতিপাদ্যটি সময়ের বিবেচনায় প্রণিধানযোগ্য। উত্তরবঙ্গের বিস্তৃর্ণ ভূমিতে প্রায় ২০ লক্ষাধিক আদিবাসীদের বসবাস। সেখানকার আদিবাসীরা বরাবরই পিছিয়ে পড়া, বিচ্ছিন্ন এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠী।

১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে রাজশাহীর তানোর থানার বাবুলডাং আদিবাসী সাঁওতাল পল্লীর উচ্ছেদ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘জাতীয় আদিবাসী পরিষদ’-এর বীজ রোপিত হয়েছিলো। ধারণা করা হয়, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ আদিবাসীদের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাক্সক্ষা, প্রাপ্তি-প্রত্যাশা কিংবা স্বপ্ন-দর্শন পূরণে লেজুড়বৃত্তি করেছে অথবা ফিকে হয়ে পড়েছে। বোধ করি, এরূপ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়েই ২০১২ খ্রিস্টাব্দে ‘উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরাম’-এর জন্ম হয়েছে। এটি নির্মম সত্য যে, অধিকার আদায়ে আদিবাসীরা ঐক্যবদ্ধ না হলে, পারস্পারিক সমঝোতা ও বোঝাপড়া না থাকলে আন্দোলনের তীব্রতা স্থিমিত হয়ে যায়। খুঁজে দেখা দরকার উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের অনৈক্যের মূলে কী আদর্শগত ভিন্নতা বা অন্য কোনো বিভ্রান্তি রয়েছে কিনা। উত্তরবঙ্গের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা হয়েছে। ‘উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরাম’-এর উত্থানের প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা বলেছি। সাংগঠনিকভাবে কতকগুলো অনৈক্য দেখা গেছে পর্যায়ক্রমে। জাতীয় আদিবাসী পরিষদ জাতিগোষ্ঠী-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের সংহতিতে অগ্রগামী হলেও পরবর্তীতে ধর্ম, ভাষা, জাতিগোষ্ঠী ভেদাভেদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

জাতীয় আদিবাসী পরিষদ দাবি করে, আদিবাসী সাঁওতালরা যারা খ্রিস্টধর্ম অনুসরণ করেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে, তাদের আদিবাসী হিসেবে গণ্য করা যাবে না। পরিষদের দাবি হচ্ছেÑ খ্রিস্টানুসারীরা কোনোভাবেই আদিবাসী হতে পারে না। আদিবাসী পরিষদ এই দাবি করেই ক্ষান্ত হননি, স্থানীয় ইউনিয়ন, উপজেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়েও ‘সনদ’ বা ‘সার্টিফিকেট’ প্রাপ্তিতে বাধাদানের প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালিয়েছে। তবে হ্যাঁ, এ বিষয়ে কলকাতা হাইকোর্ট যুগান্তকারী রায় দিয়েছে। আদালত বলেছে, ধর্ম পরিবর্তনের কারণে সাঁওতালদের আদিবাসীর মর্যাদা ক্ষুণœ হয় না।

বাংলাদেশ সরকার ২০১০ খ্রিস্টাব্দে ৬টি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর (সাঁওতাল, উরাঁও, গারো, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা) মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও আদিবাসী অধ্যুষিত বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদানের উদ্যোগ গ্রহণ করে। আমরা দেখেছি, সাঁওতাল ব্যতীত অন্য ৫টি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন এবং পাঠদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, যদিও পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভবপর হয়নি। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, সংখ্যাধিক্য আদিবাসী সাঁওতালদের মাতৃভাষার বর্ণমালা বির্তক আজ পর্যন্ত ফয়সালা হয়নি। বিতর্কের আভ্যন্তরীণ সাবজেক্ট হচ্ছে ধর্ম।

খ্রিষ্টানুসারীদের পছন্দ হচ্ছে ‘সাঁওতালী রোমান বর্ণমালা’, যেটির আবিষ্কার ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে। অন্যদিকে সারণা ধর্মের অনুসারী সাঁওতালদের মতামত হচ্ছে ‘অলচিকি বর্ণমালা’; যেটির শুরু হয়েছে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে। উত্তরবঙ্গের ১২টি জেলার সাঁওতালদের মধ্যে অনৈক্যের অন্যতম এজেন্ডারূপে সামনে এসেছে ধর্ম। জাতীয় আদিবাসী পরিষদ ভাষার বর্ণমালা প্রশ্নেও সংখ্যাধিক্যের মতামতকে উপেক্ষা করে ধর্মকে পুঁজি করে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে ঘোলা জলে মাছ শিকারে ব্যস্ত রয়েছে। ভাষার সমুদ্রে আদিবাসী সাঁওতালদের বর্ণমালার কিরূপ দশা সেটি একই পরিবার কর্তৃক দু’টি বর্ণমালা (বাংলা ও অলচিকি) দাবি পুরো উত্তরবঙ্গের আদিবাসীরা হতবাক হয়ে পড়েছে। এছাড়া আদিবাসী জাতিগত আভ্যন্তরীণ বৈষম্যও ক্রমশই প্রকট হয়ে উঠেছে।

‘বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম’ উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের সমস্যা নিরসনে কিংবা সমাধানে যতটুকু উদ্বিগ্ন বা সক্রিয় হয়ে ওঠেন অন্যস্থানের আদিবাসীদের নিয়ে কি ততটুকু হন- সেটা একটা প্রশ্ন। উত্তরবঙ্গের একাধিক নেতারা বলেছেন, কখনো কখনো কেন্দ্রীয় ফোরামের নেতারা সূক্ষ্মভাবে প্রতিনিধিত্ব সম্পৃক্ততা, উপস্থিতিকে এড়িয়ে গিয়েছেন। এড়িয়ে গেছেন সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এমনকি নেতৃত্বের মানদণ্ডকেও। জাতীয় সম্মেলনে মূলসুর ‘আদিবাসী জনগণের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি জোরদার করুন’- নিঃসন্দেহে এটি ভালো আহবান, সিদ্ধান্ত এবং আন্দোলনের হাতিয়ার। উত্তরবঙ্গের আদিবাসীরা উপলব্ধি করেছে, উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের ঐক্যের দরকার নিজেদের স্বার্থে, অন্যের স্বার্থকে চরিতার্থ করার স্বার্থে নয়। সেই চেতনা থেকেই ‘উত্তরবঙ্গ আদিবাসী ফোরাম’ সমগ্র উত্তরবঙ্গের ছোট-বড় জাতিগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার প্রচেষ্টায় সচেষ্ট। নিজেদের মধ্যে পারস্পারিক ভ্রাতৃত্ববোধ, সম্মান, ভালোবাসা, চাওয়া-পাওয়ার বিষয়গুলো একই সুতোয় মেলাতে পারলেই ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব এবং সেটি অটুট থাকবে।

[লেখক : কলামিস্ট]