আর ঝাঁপি খুলবে না নিউমার্কেটের ‘জিনাত বুক’ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ৬০ বছরের পুরনো বইয়ের দোকান

কথা ছিল এপ্রিলের ৩০ তারিখই হবে শেষ দিন। কিন্তু পাঠক, শুভানুধ্যায়ী, ক্রেতাদের অনুরোধে সময় বাড়িয়ে ১৫ মে বন্ধের ঘোষণা আসে। কিন্তু আবারও সময় বাড়ানোর অনুরোধ। দেশি বিদেশি পাঠকদের অনুরোধে দ্বিতীয়বারের মতো সময় বাড়ানো হলো, পুরো মাস। অর্থাৎ ৩১ মে পর্যন্ত খোলা থাকবে ৬০ বছরের পুরনো বইয়ের দোকান জিনাত বুক সাপ্লাই লিমিটেড। এরপরই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দেশের পুরনো এই বই এর দোকান-এমনটাই জানালেন এর স্বত্বাধিকারী সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সাল।

রাজধানীর নিউমার্কেটের ১ নম্বর গেট থেকে ভেতরে ঢুকে হাতের বাঁয়ে প্রথমেই যে গলি রয়েছে, সেটি সবার কাছে পরিচিত ‘লাইব্রেরি গলি’ হিসেবে। এই গলির ৪ নম্বর দোকানটিই জিনাত বুক। বহু ঘটনার সাক্ষী, একই সঙ্গে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক এই দোকান বলে জানান সেখান থেকে বই সংগ্রহ করা বহু পাঠক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে পাঠকদের স্মৃতিচারণা চলছে বেশ কয়েক দিন ধরে।

‘ফয়সাল ভাই, কি যে কষ্ট লাগছে খবরটা কয়েকদিন আগে জানার পর থেকেই। আমার জীবনের কত স্মৃতি আপনার এই জিনাত বুক আর আপনার সঙ্গে...। আমার বই পড়ার এই অভ্যেসের পিছনে আপনার যে কত বড় অবদান। কত রকমের বইয়ের সঙ্গে আপনি আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন...। নিউ মার্কেট গেলে আপনার ঐখানে আর ঢুঁ মারা যাবে না চিন্তাই করতে পারছি না,’ একজন পাঠক তার অনুভুতি লিখেছেন ফেইসবুকে।

আরেক জন লিখেছেন, ‘এই বই এর দোকানের সঙ্গে আমাদের পারিবারিক পাঠক হিসেবে সম্পর্ক অন্তত ৫০ বছর। আপনার আম্মা আর আর আমার মা বান্ধবী ছিলেন। বড় ভাইজান..., মেজ ভাই, বোনেরা, এমন কি ভাতিজা/ ভাগিনারা ও আপনার ওখানে নিত্য যাওয়া আসা করতো। বিশেষ করে আপনার দোকানে যখন বই কেনার জন্য বিভিন্ন বই ঘাটাঘাটি করতাম, তখন কত যে পরিশীলিত পাঠক ও আপনার সঙ্গে চমৎকার আড্ডা হতো...।’

রাজধানীর নিউমার্কেটে ১৯৬৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করেছিল জিনাত বুক সাপ্লাই লিমিটেড। এর বর্তমান কর্ণধার সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সালেরও মন ভালো নেই। তিনি নিরুপায়, তাই বন্ধ করে দিচ্ছেন দোকানটি।

এতো বছরের পুরনো ব্যবসা বন্ধ করা নিয়ে ফয়সাল সংবাদকে বলেন, ‘পাইরেসির দৌরাত্মে বইয়ের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ৬০ বছরের কতো লড়াই, কতো ঘটনা, কতো যে ভালোলাগা এই দোকানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তা বলতে গেলে সময়ের দিকে তাকানো যাবে না। এতোগুলো বছর অন্য কিছুতে নিজেকে জড়াইনি। শুধু বইয়ে মুখ গুঁজে ছিলাম। কিন্তু জীবন জীবিকার কাছে আজ হেরে গেলাম।

‘ব্যবসা বন্ধ করার সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু বই পাইরেসি একমাত্র কারণ নয়। আরও কিছু কারণ আছে যেমন, অনলাইন ব্যবসার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারা একটি। এছাড়া, আমদানি করা বইয়ের শুল্ক এবং আমার অসুস্থতা,’ বলেন ফয়সাল।

বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠক ও বইপোকার আনাগোনা ছিল এখানে। দেশি-বিদেশি ছোটগল্প, উপন্যাস সব ধরনের অরিজিনাল বইয়ের সংগ্রহ ছিল এই দোকানে। একটা সময় পর্যন্ত ঐতিহ্যবাহী এ বইয়ের দোকান কৌলীন্য ধরে রেখেছিল। সারা দিনই ভিড় লেগে থাকত ক্রেতাদের। ক্রেতাদের আগ্রহে দোকানের কর্ণধার ফয়সাল দেশি-বিদেশি বই সংগ্রহে ব্যস্ত থাকতেন সব সময়।

ফয়সাল বলেন, ‘আমদানি করা অরিজিনাল বইয়ের দাম অনেক বেশি। এখনকার পাঠক-ক্রেতা কম টাকায় পাইরেটেড বই কেনে। কিন্তু আমি তো তা করবো না। পাইরেসি বই বিক্রি হয় হয়তো ১ হাজার বা ৫শ’ টাকায়। আর আমদানি করা মূল বইয়ের দাম ২ হাজার ৩০০ টাকা। ব্যবসায় টিকে থাকার জন্য ওই বই বিক্রি করতে হতো লস দিয়ে ১ হাজার ৭৯০ টাকায়। এভাবে তো আর ব্যবসা চলে না।

‘অনলাইন ব্যবসার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারার কারণেও বিক্রি কমে গেছে। আমার এখানে ২০-৩০ বছর ধরে কাজ করছেন তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়ার চেষ্টা করেও অনলাইন ব্যবসার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়া সম্ভব হয়নি। আবার তাদের বাদ দিয়ে নতুন কাউকে নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাবো সেটাও সম্ভব না।’

‘গত ৯ বছরে প্রায় ৩০ লাখ টাকার লোকসান হয়েছে; বইয়ের ব্যবসা এমন জায়গায় চলে গেছে মাঝেমধ্যে মাসিক লোকসানের পরিমাণ ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকে। এই লোকসান বহন করা কঠিন।’

২০০ বর্গফুটের দোকানটির তাকে, তাকে সাজানো হাজার, হাজার আমদানি করা ইংরেজি বই আর কেনার জন্য দোকানের ভেতরে-বাইরে মানুষ-জিনাত বুক সাপ্লাই লিমিটেডের একসময়ের চিত্র এটি। গত ১০ বছরে ক্রমশ জৌলুশ হারিয়েছে এই দোকানটি।

ফয়সাল বলেন, ‘আমার বয়স এখন ৬৭। আমি ডায়াবেটিসসহ বেশকিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছি। যদিও এই বয়স অনেকের কাছেই তেমন কিছু নয়, তবে ব্যবসা বন্ধ করার সিদ্ধান্তের পিছনে আমার শারীরিক অসুস্থতা অন্যতম কারণ। এই বয়সে এসে আমি নতুন করে ব্যবসা শুরুর চিন্তা করতে পারিনা।’

তিনি আরও বলেন, ‘এসব কারণে আমি গত কয়েক বছর ধরেই দোকান বন্ধ করার বিষয়ে ভাবছিলাম। এখন সময় এসেছে। দোকানটি একটি স্টেশনারি শপ হিসেবে ভাড়া দেয়া হবে।’

জিনাত বুক অনেকের কাছে শুধু বইয়ের দোকান ছিল না; বই পড়তে ভালোবাসেন, কিন্তু পকেটে টাকা নেই এমন পাঠকেরা এখান থেকে বই নিয়ে পড়ে আবার ফেরত দিতে পারতেন। বাকিতে বই নিয়ে যেকোন সময় তা পরিশোধ করার সুযোগ পেতেন ক্রেতারা।

মোহাম্মদ ফয়সালের বড় বোন জিনাত সালাউদ্দিনের নামে এই দোকান। এখন তিনি কানাডায় থাকেন। এই দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়া নিয়ে তিনি হোয়াটসঅ্যাপে ভাই ফয়সালকে বলেছেন, ‘এটি শুধু দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি ছিল বিদ্যা ও জ্ঞানের পাঠাগার। আজ দেশে- বিদেশে অনেকেই দুঃখ ও ধন্যবাদ জানাচ্ছে, সে সারিতে আমি জিনাতও আছি।’

শুরুর যাত্রা, পেছনের গল্প

মোহাম্মদ ফয়সালের বাবা সৈয়দ আবদুল মালেকের হাত ধরে ১৯৬৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর দোকানটির যাত্রা শুরু। বড় মেয়ে জিনাতের (জিনাত সালাউদ্দিন) নামে দোকান, কেনা হয়েছিল তাদের মা খন্দকার আশরোফা খাতুনের নামে।

আবদুল মালেক ও তার স্ত্রী ১৯৪৭ সালে মুর্শিদাবাদ থেকে ঢাকার গেন্ডারিয়ায় এসে স্থায়ী হন। করতেন সরকারি চাকরি, পাশাপাশি সদরঘাটে মুর্শিদাবাদ সিল্ক ক্লথ স্টোর নামের একটি শাড়ির দোকান ছিল। চালিয়েছিলেন ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত।

নিউমার্কেটের গেটের নকশা করেছিলেন আবদুল মালেকের আত্মীয় প্রকৌশলী শরীফ ইমাম। তারই পরামর্শে বইয়ের দোকান দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন আবদুল মালেক।

দোকান যখন চালু হয় মোহাম্মদ ফয়সাল বেশ ছোট, জন্ম তার ১৯৫৫ সালে। তিন ভাই দুই বোনের মধ্যে সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সাল মেজ। পরিবারের সিদ্ধান্তেই এইচএসসি পর্যন্ত পড়া মোহাম্মদ ফয়সালকে দোকানের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। তিনি দোকানে বসা শুরু করেছিলেন ১৯৭৪ সালের শেষ দিকে। বাবা সদ্য চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। সংসার খরচ চালানোর অন্য কোন বিকল্প নেই।

আর নব্বইয়ের দশকে পরিবারের সিদ্ধান্তে মোহাম্মদ ফয়সালের নামে জিনাত বুক সাপ্লাই লিমিটেড হস্তান্তর করা হয়। তবে দোকানের নাম আর পরিবর্তন করা হয়নি।

মোহাম্মদ ফয়সাল যখন দোকানে বসা শুরু করেন, তখন দোকানের অবস্থা বেশ খারাপ, বেশ দেনাও ছিল। মাত্র দুই লাখ টাকায় দোকানটি বিক্রি করে দেয়ার কথাও হয়েছিল। পরে দেনা শোধ করে সেই জায়গা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন ফয়সাল। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিজে গিয়ে বই পৌঁছে দিতেন, বিল পেতেন অনেক পরে। শুধু পাঠক তৈরির জন্য অনেককে বাকিতে বই দিতেন।

ফয়সালের স্মৃতি

বইয়ের শুরুতে বা শেষ প্রচ্ছদে লেখা সারাংশ পড়া ছিল মোহাম্মদ ফয়সালের নেশা। যে কারণে ক্রেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন বই নিয়ে আলোচনা করতে পারতেন। কে কোন বই পছন্দ করবেন, তা বুঝতে পারতেন।

মোহাম্মদ ফয়সাল বললেন, ‘চাইলে হাজার পাঠকের নাম বলতে পারব, জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক লুঙ্গি ও ফতুয়া পরে দোকানে এসে দাঁড়িয়েই অনেক বই পড়তেন। বই কিনতেন। প্রয়াত প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান, অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, কবি শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মহাবুবুর রহমান খান, ব্যারিস্টার নিহাদ কবির,...এমন অনেক নাম আছে।’

তার কথা, ‘বই বিক্রির চেয়েও আমি পাঠক তৈরি করতে চেয়েছি। আমি পাঠক তৈরি করতে পেরেছি, এটাই আমার বড় অর্জন।’

বুক হাউসটা বন্ধ না করে দিয়ে উত্তরসূরি কাউকে দিয়ে তো চালানো যেত এমন প্রশ্নে ফয়সাল বলেন- ‘আমার দুই কন্যা। বড়জন স্বামী সন্তান নিয়ে প্রবাসী। ছোট মেয়ে একটা বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা। ব্যবসাটা এতো বেশি রমরমা না যে মেয়েকে চাকরি করতে না দিয়ে, ব্যবসায় বসাবো। এই ব্যবসাকে এগিয়ে নেয়া এখন দুরুহ। পাইরেটেড বই আমি বা আমার সন্তান কেউ বিক্রি করবে না’।

সব বই বিক্রি না হলে কি করবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সব বই তো বিক্রি হবে না। যেসব বই বিক্রি হবে না সেগুলো আপাতত আমার একটা গোডাউন আছে, সেখানে রাখবো। এরপর ভেবে দেখবো কি করা যায়।’

বুধবার, ১৭ মে ২০২৩ , ০৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০, ২৬ শাওয়াল ১৪৪৪

আর ঝাঁপি খুলবে না নিউমার্কেটের ‘জিনাত বুক’ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ৬০ বছরের পুরনো বইয়ের দোকান

জাহিদা পারভেজ ছন্দা

image

নিউমার্কেটে প্রাচীন বইয়ের দোকান জিনাত বুকশপে বইপ্রেমীদের ভিড় -সংবাদ

কথা ছিল এপ্রিলের ৩০ তারিখই হবে শেষ দিন। কিন্তু পাঠক, শুভানুধ্যায়ী, ক্রেতাদের অনুরোধে সময় বাড়িয়ে ১৫ মে বন্ধের ঘোষণা আসে। কিন্তু আবারও সময় বাড়ানোর অনুরোধ। দেশি বিদেশি পাঠকদের অনুরোধে দ্বিতীয়বারের মতো সময় বাড়ানো হলো, পুরো মাস। অর্থাৎ ৩১ মে পর্যন্ত খোলা থাকবে ৬০ বছরের পুরনো বইয়ের দোকান জিনাত বুক সাপ্লাই লিমিটেড। এরপরই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দেশের পুরনো এই বই এর দোকান-এমনটাই জানালেন এর স্বত্বাধিকারী সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সাল।

রাজধানীর নিউমার্কেটের ১ নম্বর গেট থেকে ভেতরে ঢুকে হাতের বাঁয়ে প্রথমেই যে গলি রয়েছে, সেটি সবার কাছে পরিচিত ‘লাইব্রেরি গলি’ হিসেবে। এই গলির ৪ নম্বর দোকানটিই জিনাত বুক। বহু ঘটনার সাক্ষী, একই সঙ্গে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক এই দোকান বলে জানান সেখান থেকে বই সংগ্রহ করা বহু পাঠক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে পাঠকদের স্মৃতিচারণা চলছে বেশ কয়েক দিন ধরে।

‘ফয়সাল ভাই, কি যে কষ্ট লাগছে খবরটা কয়েকদিন আগে জানার পর থেকেই। আমার জীবনের কত স্মৃতি আপনার এই জিনাত বুক আর আপনার সঙ্গে...। আমার বই পড়ার এই অভ্যেসের পিছনে আপনার যে কত বড় অবদান। কত রকমের বইয়ের সঙ্গে আপনি আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন...। নিউ মার্কেট গেলে আপনার ঐখানে আর ঢুঁ মারা যাবে না চিন্তাই করতে পারছি না,’ একজন পাঠক তার অনুভুতি লিখেছেন ফেইসবুকে।

আরেক জন লিখেছেন, ‘এই বই এর দোকানের সঙ্গে আমাদের পারিবারিক পাঠক হিসেবে সম্পর্ক অন্তত ৫০ বছর। আপনার আম্মা আর আর আমার মা বান্ধবী ছিলেন। বড় ভাইজান..., মেজ ভাই, বোনেরা, এমন কি ভাতিজা/ ভাগিনারা ও আপনার ওখানে নিত্য যাওয়া আসা করতো। বিশেষ করে আপনার দোকানে যখন বই কেনার জন্য বিভিন্ন বই ঘাটাঘাটি করতাম, তখন কত যে পরিশীলিত পাঠক ও আপনার সঙ্গে চমৎকার আড্ডা হতো...।’

রাজধানীর নিউমার্কেটে ১৯৬৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করেছিল জিনাত বুক সাপ্লাই লিমিটেড। এর বর্তমান কর্ণধার সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সালেরও মন ভালো নেই। তিনি নিরুপায়, তাই বন্ধ করে দিচ্ছেন দোকানটি।

এতো বছরের পুরনো ব্যবসা বন্ধ করা নিয়ে ফয়সাল সংবাদকে বলেন, ‘পাইরেসির দৌরাত্মে বইয়ের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ৬০ বছরের কতো লড়াই, কতো ঘটনা, কতো যে ভালোলাগা এই দোকানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তা বলতে গেলে সময়ের দিকে তাকানো যাবে না। এতোগুলো বছর অন্য কিছুতে নিজেকে জড়াইনি। শুধু বইয়ে মুখ গুঁজে ছিলাম। কিন্তু জীবন জীবিকার কাছে আজ হেরে গেলাম।

‘ব্যবসা বন্ধ করার সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু বই পাইরেসি একমাত্র কারণ নয়। আরও কিছু কারণ আছে যেমন, অনলাইন ব্যবসার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারা একটি। এছাড়া, আমদানি করা বইয়ের শুল্ক এবং আমার অসুস্থতা,’ বলেন ফয়সাল।

বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠক ও বইপোকার আনাগোনা ছিল এখানে। দেশি-বিদেশি ছোটগল্প, উপন্যাস সব ধরনের অরিজিনাল বইয়ের সংগ্রহ ছিল এই দোকানে। একটা সময় পর্যন্ত ঐতিহ্যবাহী এ বইয়ের দোকান কৌলীন্য ধরে রেখেছিল। সারা দিনই ভিড় লেগে থাকত ক্রেতাদের। ক্রেতাদের আগ্রহে দোকানের কর্ণধার ফয়সাল দেশি-বিদেশি বই সংগ্রহে ব্যস্ত থাকতেন সব সময়।

ফয়সাল বলেন, ‘আমদানি করা অরিজিনাল বইয়ের দাম অনেক বেশি। এখনকার পাঠক-ক্রেতা কম টাকায় পাইরেটেড বই কেনে। কিন্তু আমি তো তা করবো না। পাইরেসি বই বিক্রি হয় হয়তো ১ হাজার বা ৫শ’ টাকায়। আর আমদানি করা মূল বইয়ের দাম ২ হাজার ৩০০ টাকা। ব্যবসায় টিকে থাকার জন্য ওই বই বিক্রি করতে হতো লস দিয়ে ১ হাজার ৭৯০ টাকায়। এভাবে তো আর ব্যবসা চলে না।

‘অনলাইন ব্যবসার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পারার কারণেও বিক্রি কমে গেছে। আমার এখানে ২০-৩০ বছর ধরে কাজ করছেন তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়ার চেষ্টা করেও অনলাইন ব্যবসার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়া সম্ভব হয়নি। আবার তাদের বাদ দিয়ে নতুন কাউকে নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাবো সেটাও সম্ভব না।’

‘গত ৯ বছরে প্রায় ৩০ লাখ টাকার লোকসান হয়েছে; বইয়ের ব্যবসা এমন জায়গায় চলে গেছে মাঝেমধ্যে মাসিক লোকসানের পরিমাণ ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকে। এই লোকসান বহন করা কঠিন।’

২০০ বর্গফুটের দোকানটির তাকে, তাকে সাজানো হাজার, হাজার আমদানি করা ইংরেজি বই আর কেনার জন্য দোকানের ভেতরে-বাইরে মানুষ-জিনাত বুক সাপ্লাই লিমিটেডের একসময়ের চিত্র এটি। গত ১০ বছরে ক্রমশ জৌলুশ হারিয়েছে এই দোকানটি।

ফয়সাল বলেন, ‘আমার বয়স এখন ৬৭। আমি ডায়াবেটিসসহ বেশকিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছি। যদিও এই বয়স অনেকের কাছেই তেমন কিছু নয়, তবে ব্যবসা বন্ধ করার সিদ্ধান্তের পিছনে আমার শারীরিক অসুস্থতা অন্যতম কারণ। এই বয়সে এসে আমি নতুন করে ব্যবসা শুরুর চিন্তা করতে পারিনা।’

তিনি আরও বলেন, ‘এসব কারণে আমি গত কয়েক বছর ধরেই দোকান বন্ধ করার বিষয়ে ভাবছিলাম। এখন সময় এসেছে। দোকানটি একটি স্টেশনারি শপ হিসেবে ভাড়া দেয়া হবে।’

জিনাত বুক অনেকের কাছে শুধু বইয়ের দোকান ছিল না; বই পড়তে ভালোবাসেন, কিন্তু পকেটে টাকা নেই এমন পাঠকেরা এখান থেকে বই নিয়ে পড়ে আবার ফেরত দিতে পারতেন। বাকিতে বই নিয়ে যেকোন সময় তা পরিশোধ করার সুযোগ পেতেন ক্রেতারা।

মোহাম্মদ ফয়সালের বড় বোন জিনাত সালাউদ্দিনের নামে এই দোকান। এখন তিনি কানাডায় থাকেন। এই দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়া নিয়ে তিনি হোয়াটসঅ্যাপে ভাই ফয়সালকে বলেছেন, ‘এটি শুধু দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি ছিল বিদ্যা ও জ্ঞানের পাঠাগার। আজ দেশে- বিদেশে অনেকেই দুঃখ ও ধন্যবাদ জানাচ্ছে, সে সারিতে আমি জিনাতও আছি।’

শুরুর যাত্রা, পেছনের গল্প

মোহাম্মদ ফয়সালের বাবা সৈয়দ আবদুল মালেকের হাত ধরে ১৯৬৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর দোকানটির যাত্রা শুরু। বড় মেয়ে জিনাতের (জিনাত সালাউদ্দিন) নামে দোকান, কেনা হয়েছিল তাদের মা খন্দকার আশরোফা খাতুনের নামে।

আবদুল মালেক ও তার স্ত্রী ১৯৪৭ সালে মুর্শিদাবাদ থেকে ঢাকার গেন্ডারিয়ায় এসে স্থায়ী হন। করতেন সরকারি চাকরি, পাশাপাশি সদরঘাটে মুর্শিদাবাদ সিল্ক ক্লথ স্টোর নামের একটি শাড়ির দোকান ছিল। চালিয়েছিলেন ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত।

নিউমার্কেটের গেটের নকশা করেছিলেন আবদুল মালেকের আত্মীয় প্রকৌশলী শরীফ ইমাম। তারই পরামর্শে বইয়ের দোকান দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন আবদুল মালেক।

দোকান যখন চালু হয় মোহাম্মদ ফয়সাল বেশ ছোট, জন্ম তার ১৯৫৫ সালে। তিন ভাই দুই বোনের মধ্যে সৈয়দ আবু সালেহ মোহাম্মদ ফয়সাল মেজ। পরিবারের সিদ্ধান্তেই এইচএসসি পর্যন্ত পড়া মোহাম্মদ ফয়সালকে দোকানের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। তিনি দোকানে বসা শুরু করেছিলেন ১৯৭৪ সালের শেষ দিকে। বাবা সদ্য চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। সংসার খরচ চালানোর অন্য কোন বিকল্প নেই।

আর নব্বইয়ের দশকে পরিবারের সিদ্ধান্তে মোহাম্মদ ফয়সালের নামে জিনাত বুক সাপ্লাই লিমিটেড হস্তান্তর করা হয়। তবে দোকানের নাম আর পরিবর্তন করা হয়নি।

মোহাম্মদ ফয়সাল যখন দোকানে বসা শুরু করেন, তখন দোকানের অবস্থা বেশ খারাপ, বেশ দেনাও ছিল। মাত্র দুই লাখ টাকায় দোকানটি বিক্রি করে দেয়ার কথাও হয়েছিল। পরে দেনা শোধ করে সেই জায়গা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন ফয়সাল। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিজে গিয়ে বই পৌঁছে দিতেন, বিল পেতেন অনেক পরে। শুধু পাঠক তৈরির জন্য অনেককে বাকিতে বই দিতেন।

ফয়সালের স্মৃতি

বইয়ের শুরুতে বা শেষ প্রচ্ছদে লেখা সারাংশ পড়া ছিল মোহাম্মদ ফয়সালের নেশা। যে কারণে ক্রেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন বই নিয়ে আলোচনা করতে পারতেন। কে কোন বই পছন্দ করবেন, তা বুঝতে পারতেন।

মোহাম্মদ ফয়সাল বললেন, ‘চাইলে হাজার পাঠকের নাম বলতে পারব, জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক লুঙ্গি ও ফতুয়া পরে দোকানে এসে দাঁড়িয়েই অনেক বই পড়তেন। বই কিনতেন। প্রয়াত প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান, অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, কবি শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মহাবুবুর রহমান খান, ব্যারিস্টার নিহাদ কবির,...এমন অনেক নাম আছে।’

তার কথা, ‘বই বিক্রির চেয়েও আমি পাঠক তৈরি করতে চেয়েছি। আমি পাঠক তৈরি করতে পেরেছি, এটাই আমার বড় অর্জন।’

বুক হাউসটা বন্ধ না করে দিয়ে উত্তরসূরি কাউকে দিয়ে তো চালানো যেত এমন প্রশ্নে ফয়সাল বলেন- ‘আমার দুই কন্যা। বড়জন স্বামী সন্তান নিয়ে প্রবাসী। ছোট মেয়ে একটা বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা। ব্যবসাটা এতো বেশি রমরমা না যে মেয়েকে চাকরি করতে না দিয়ে, ব্যবসায় বসাবো। এই ব্যবসাকে এগিয়ে নেয়া এখন দুরুহ। পাইরেটেড বই আমি বা আমার সন্তান কেউ বিক্রি করবে না’।

সব বই বিক্রি না হলে কি করবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সব বই তো বিক্রি হবে না। যেসব বই বিক্রি হবে না সেগুলো আপাতত আমার একটা গোডাউন আছে, সেখানে রাখবো। এরপর ভেবে দেখবো কি করা যায়।’