গাজীপুর : জাহাঙ্গীরকে দুদকে তলব, সবার নজর মেয়র পদে প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের দিকে

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সবার নজর এখন মেয়র পদের প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের দিকে। মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের বিরামহীন প্রচারণায় মহানগরীর নির্বাচনী মাঠে উত্তাপ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সিটির সর্বস্তরের ভোটার ও নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি ক্রমশ নিবদ্ধ হচ্ছে মেয়র প্রার্থীদের দিকে। তা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশনের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে কি-না সে সংশয় কাটছে না ভোটারদের। এছাড়া মেয়র পদে আট জন প্রার্থীর মধ্যে পাঁচ জন প্রার্থী প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দুজনের নামই এখন ঘুরে-ফিরে সবার মাঝে উচ্চারিত হচ্ছে। এদিকে সরকারি দল আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর কাঙ্খিত ফলাফলের ব্যাপারটি দলের জন্য মর্যাদার বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে এমনটিই ভাবছেন অনেকেই।

মেয়র পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আজমত উল্লা খান এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মা জায়েদা খাতুন প্রচারণার ঝড় তুলে নির্বাচনী মাঠ সরগরম করে তুলেছেন। রাজনীতি ও নির্বাচনের মাঠে একেবারে নবাগত জায়েদা খাতুনের মেয়র পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়াটা চমক সৃষ্টি করলেও শুরুর দিকে তাকে নিয়ে ভোটারদের ভাবনাচিন্তা তেমন গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মনোনয়নপত্র ঋণখেলাপির অভিযোগে বাতিল করা হলে এবং আপিলেও সে রায় বজায় থাকলে জাহাঙ্গীর আলমের প্রতি ভোটারদের যে সহানুভূতি ও সমর্থন ক্রমশঃ তা তার মায়ের দিকে প্রবাহিত হতে থাকে। সে সমর্থন দিন দিন উচ্চতর মাত্রার দিকে উন্নীত হতে থাকলে জায়েদা খাতুন স্বভাবতই আজমত উল্লা খানের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে থাকেন এমন অভিমত অনেকের। তার প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থনের পাল্লা এখন সরকারি দলের প্রার্থী ও দলীয় নেতাকর্মী-সমর্থকদের ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের মতে এবারের নির্বাচনে এ দুজনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা পাশাপাশি জয়-পরাজয় সরকারি দলের জন্য মর্যাদার বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে। নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের ধারণা যদি নির্বাচন যথা সময়ে অনুষ্ঠিত হয় এবং নির্বাচনে কোন বিঘœ না ঘটে তবে কে হবেন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কর্ণধার তার জন্য ২৫ মে’র নির্বাচন ও ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

এদিকে নানান দুর্ভোগ ও টানাপোড়নে বিপর্যস্থ জাহাঙ্গীর আলমের নিয়তি যেন পিছু ছাড়ছে না। মেয়র পদে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির দায়ে এবং ৭ হাজার ৪ শত কোটি টাকা আত্মসাৎ ও মনোনয়নপত্রের হলফনামায় সম্পদ গোপন করার অভিযোগে তাকে আগামী ২২ ও ২৩ মে দুর্নীতির দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে তলব করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতেরও অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে মেয়র প্রার্থী আজমত উল্লা খানের সঙ্গে প্রায় সমানতালে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় জায়েদা খাতুনের প্রচারণায় বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে তার ছেলে ও প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম অভিযোগ করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন আমি নৌকার পক্ষে প্রচারণা চালাতে কাউকে মানা করিনি এবং করবোও না। তবে আমাদের নির্বাচনী প্রচারণায় যাতে বাধা না দেয়া হয় এবং আমাদের যেন হয়রানি করা না হয় সে জন্য আমি নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি।

ভোটারদের ইভিএম-এ ভোটদান সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ

গাজীপুর সিটি করপোরেশন উপলক্ষে ভোটারদের ইভিএম-এর মাধ্যমে সঠিকভাবে ভোটপ্রদান প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনের রিটার্নিং কার্যালয়ের মিডিয়ার দায়িত্বে থাকা মঞ্জুরুল ইসলাম খান জানান ২৫ মে নির্বাচনে যাতে ভোটারদের ভোট দিতে সমস্যা না হয় তার জন্যই নির্বাচন কমিশন এ কার্যক্রম শুরু করেছে। তিনি বলেন ১৫ মে থেকে শুরু হওয়া ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম)-এ ভোট প্রদান প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলবে ২১ মে পর্যন্ত। প্রতিটি ওয়ার্ডের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ইভিএম ছাড়াও প্রজেক্টরের ডিসপ্লে ব্যবহার করে ভোটারদের সঠিকভাবে ভোট প্রদানের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত টেকনিক্যাল টিম এ প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বলে তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, গতকাল থেকে নিজস্ব অপারেটর ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন একজন ব্যক্তির মাধ্যমে ভোটারদের প্রশিক্ষণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন যাতে ভোটারদের মনে ইভিএম সংক্রান্ত ভ্রান্ত ধারণা দূর হয়।

সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীরকে দুদকে তলব

বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ ও ভুয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের অভিযোগে গাজীপুরের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তলবি নোটিশে জাহাঙ্গীর আলমকে আগামী ২২ ও ২৩ মে দুদক-এর প্রধান কার্যালয়ে হাজির হয়ে বক্তব্য দেয়ার জন্য বলা হয়েছে বলে গতকাল সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে। এর আগে মঙ্গলবার দুদকের পক্ষ থেকে পাঠানো দুটি তলবি নোটিশ গ্রহণ করেন জাহাঙ্গীর আলম। গত সোমবার দুদকের উপ-পরিচালক মো. আলী আকবর স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি নোটিশ সাবেক মেয়রের বাসার ঠিকানায় পাঠানো হয়।

প্রচারণায় মেয়র প্রার্থীরা

আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আজমত উল্লা খান গতকাল নগরীর শিল্পাঞ্চল কোনাবাড়ি থানার বিভিন্ন ওয়ার্ডে ব্যাপক গণসংযোগ করেন। তিনি সকাল ১১টার দিকে ১২ নম্বর ওয়ার্ডের বাইমাইল বাজার এলাকা থেকে প্রচারণা শুরু করেন। পরে তিনি জরুন, কোনাবাড়ি বাজার, আমবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি পথসভায় বক্তব্য রাখেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শাহাবুদ্দিন শামুর সভাপতিত্বে এসব পথসভায় মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি আফজাল হোসেন সরকার রিপন, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ আক্কাস আলী, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শেখ মো. আসাদুল্লা, কোনাবাড়ি থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুর রহমান মাস্টার, মো. শহীদুল ইসলাম ও অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

পথসভায় আজমত উল্লা খান বলেন, প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত জনবসতিপূর্ণ শিল্পসমৃদ্ধ এলাকা কোনাবাড়িসহ গাজীপুরকে সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত করেছেন। এ এলাকার মানুষের উন্নয়নের জন্য তিনি সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেন। এত টাকা বরাদ্দ পাওয়া সত্ত্বেও পরিকল্পিতভাবে সিটির উন্নয়ন কাজ করা হয়নি। তিনি বলেন, টাকা থাকলে কাজ হয় না এটা মেনে নেয়া যায় না। কোন জায়গায় যদি দুর্নীতি থাকে তাহলে ভালো কাজ করা যায় না। তিনি বলেন আমি মেয়র পদে নির্বাচিত হলে সব শ্রেণীর মানুষের জন্য মেয়রের দরজা উন্মুক্ত থাকবে যাতে কোন মানুষ এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে না থাকে। তিনি বলেন গত তিন বছরে সাবেক মেয়রের বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেছে। অথচ আমি আঠারো বছর টঙ্গী পৌরসভার মেয়র পদে দায়িত্ব পালনকালে কেউ আমার বিরুদ্ধে কোন দুর্র্নীতির অভিযোগ আনতে পারেনি। আমি নির্বাচিত হলে গাজীপুর সিটি করপোরেশনকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত সিটি হিসেবে গড়ে তুলব। এদিকে মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক কামরুল আহসান সরকার রাসেলের নেতৃত্বে যুবলীগের নেতাকর্মীরা নৌকার পক্ষে বাসন মেট্রো থানার চান্দনা-চৌরাস্তাসহ বিভিন্ন স্থানে প্রচারপত্র বিলি করে ভোটারদের কাছে ভোট চান।

অন্যদিকে টেবিল ঘড়ি প্রতীকের স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী জায়েদা খাতুন গতকাল বিকেলে ছয়দানা ডেগেরচালা এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে লিফলেট বিতরণ করে গণসংযোগ করেন। পরে তিনি টঙ্গীর পূর্ব থানা এলাকায় প্রচারণা চালান। এ সময় তার ছেলে সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমসহ কর্মী-সমর্থকরা উপস্থিত ছিলেন। গণসংযোগকালে প্রার্থী জায়েদা খাতুন বলেন, আমি মহিলা মানুষ, আমাকে এত ভয় কেন। আমরা অন্য কারো প্রচারণায় বাধা দিচ্ছি না। আমি সুষ্ঠু নির্বাচন চাই, এ জন্য আপনারা টেবিল ঘড়ি প্রতীকে ভোট দিবেন। তিনি বলেন, জনগণ আমার পাশে আছেন। আগামী ২৫ মে নির্বাচনে ভোটাররা আমাকে বিজয়ী করবেন এটা আমার আশা।

একই দিন সকালে জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী এমএম নিয়াজ উদ্দিন শহরের গাজীপুর জর্জ কোর্ট প্রাঙ্গণ এলাকায় গণসংযোগ করেন। দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে তিনি প্রচারপত্র বিলি করে লাঙ্গল মার্কায় ভোট চান।

এদিকে হাতপাখা প্রতীকের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী গাজী আতাউর রহমান দুপুরে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন উপলক্ষে ৩৪ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন। গতকাল দুপুরে শহরের হাবিবউল্লা সরণির একটি পত্রিকা অফিসে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নগরবাসীর উদ্দেশে এ ইশতেহার তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমি নির্বাচিত হলে নগরবাসীর জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাসহ বিশেষজ্ঞ কমিটির সমন্বয়ে নগর সরকার, দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড, যাকাত বোর্ড গঠন করব। ৩৪ দফা ইশতেহার তুলে ধরে তিনি ঘোষণা দেন জয়ী হলে নগর ভবন ধনী-গরিব সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। সিটি নির্বাচনের প্রতীক বরাদ্দের পর এই প্রথম কোন প্রার্থী ইশতেহার ঘোষণা করলেন।

হাতি প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী সরকার শাহনুর ইসলাম রনি সকাল থেকে টঙ্গীর ৪৯ ও ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের এরশাদ নগর ও গাজীপুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করেন।

বৃহস্পতিবার, ১৮ মে ২০২৩ , ০৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০, ২৭ শাওয়াল ১৪৪৪

নগর নির্বাচন

গাজীপুর : জাহাঙ্গীরকে দুদকে তলব, সবার নজর মেয়র পদে প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের দিকে

প্রতিনিধি, গাজীপুর

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সবার নজর এখন মেয়র পদের প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের দিকে। মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের বিরামহীন প্রচারণায় মহানগরীর নির্বাচনী মাঠে উত্তাপ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সিটির সর্বস্তরের ভোটার ও নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি ক্রমশ নিবদ্ধ হচ্ছে মেয়র প্রার্থীদের দিকে। তা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশনের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে কি-না সে সংশয় কাটছে না ভোটারদের। এছাড়া মেয়র পদে আট জন প্রার্থীর মধ্যে পাঁচ জন প্রার্থী প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দুজনের নামই এখন ঘুরে-ফিরে সবার মাঝে উচ্চারিত হচ্ছে। এদিকে সরকারি দল আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর কাঙ্খিত ফলাফলের ব্যাপারটি দলের জন্য মর্যাদার বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে এমনটিই ভাবছেন অনেকেই।

মেয়র পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আজমত উল্লা খান এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মা জায়েদা খাতুন প্রচারণার ঝড় তুলে নির্বাচনী মাঠ সরগরম করে তুলেছেন। রাজনীতি ও নির্বাচনের মাঠে একেবারে নবাগত জায়েদা খাতুনের মেয়র পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়াটা চমক সৃষ্টি করলেও শুরুর দিকে তাকে নিয়ে ভোটারদের ভাবনাচিন্তা তেমন গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের মনোনয়নপত্র ঋণখেলাপির অভিযোগে বাতিল করা হলে এবং আপিলেও সে রায় বজায় থাকলে জাহাঙ্গীর আলমের প্রতি ভোটারদের যে সহানুভূতি ও সমর্থন ক্রমশঃ তা তার মায়ের দিকে প্রবাহিত হতে থাকে। সে সমর্থন দিন দিন উচ্চতর মাত্রার দিকে উন্নীত হতে থাকলে জায়েদা খাতুন স্বভাবতই আজমত উল্লা খানের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে থাকেন এমন অভিমত অনেকের। তার প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থনের পাল্লা এখন সরকারি দলের প্রার্থী ও দলীয় নেতাকর্মী-সমর্থকদের ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের মতে এবারের নির্বাচনে এ দুজনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা পাশাপাশি জয়-পরাজয় সরকারি দলের জন্য মর্যাদার বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে। নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের ধারণা যদি নির্বাচন যথা সময়ে অনুষ্ঠিত হয় এবং নির্বাচনে কোন বিঘœ না ঘটে তবে কে হবেন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কর্ণধার তার জন্য ২৫ মে’র নির্বাচন ও ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

এদিকে নানান দুর্ভোগ ও টানাপোড়নে বিপর্যস্থ জাহাঙ্গীর আলমের নিয়তি যেন পিছু ছাড়ছে না। মেয়র পদে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির দায়ে এবং ৭ হাজার ৪ শত কোটি টাকা আত্মসাৎ ও মনোনয়নপত্রের হলফনামায় সম্পদ গোপন করার অভিযোগে তাকে আগামী ২২ ও ২৩ মে দুর্নীতির দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে তলব করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতেরও অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে মেয়র প্রার্থী আজমত উল্লা খানের সঙ্গে প্রায় সমানতালে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় জায়েদা খাতুনের প্রচারণায় বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে তার ছেলে ও প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম অভিযোগ করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন আমি নৌকার পক্ষে প্রচারণা চালাতে কাউকে মানা করিনি এবং করবোও না। তবে আমাদের নির্বাচনী প্রচারণায় যাতে বাধা না দেয়া হয় এবং আমাদের যেন হয়রানি করা না হয় সে জন্য আমি নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি।

ভোটারদের ইভিএম-এ ভোটদান সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ

গাজীপুর সিটি করপোরেশন উপলক্ষে ভোটারদের ইভিএম-এর মাধ্যমে সঠিকভাবে ভোটপ্রদান প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনের রিটার্নিং কার্যালয়ের মিডিয়ার দায়িত্বে থাকা মঞ্জুরুল ইসলাম খান জানান ২৫ মে নির্বাচনে যাতে ভোটারদের ভোট দিতে সমস্যা না হয় তার জন্যই নির্বাচন কমিশন এ কার্যক্রম শুরু করেছে। তিনি বলেন ১৫ মে থেকে শুরু হওয়া ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম)-এ ভোট প্রদান প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলবে ২১ মে পর্যন্ত। প্রতিটি ওয়ার্ডের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ইভিএম ছাড়াও প্রজেক্টরের ডিসপ্লে ব্যবহার করে ভোটারদের সঠিকভাবে ভোট প্রদানের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত টেকনিক্যাল টিম এ প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বলে তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, গতকাল থেকে নিজস্ব অপারেটর ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন একজন ব্যক্তির মাধ্যমে ভোটারদের প্রশিক্ষণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন যাতে ভোটারদের মনে ইভিএম সংক্রান্ত ভ্রান্ত ধারণা দূর হয়।

সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীরকে দুদকে তলব

বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ ও ভুয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের অভিযোগে গাজীপুরের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তলবি নোটিশে জাহাঙ্গীর আলমকে আগামী ২২ ও ২৩ মে দুদক-এর প্রধান কার্যালয়ে হাজির হয়ে বক্তব্য দেয়ার জন্য বলা হয়েছে বলে গতকাল সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে। এর আগে মঙ্গলবার দুদকের পক্ষ থেকে পাঠানো দুটি তলবি নোটিশ গ্রহণ করেন জাহাঙ্গীর আলম। গত সোমবার দুদকের উপ-পরিচালক মো. আলী আকবর স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি নোটিশ সাবেক মেয়রের বাসার ঠিকানায় পাঠানো হয়।

প্রচারণায় মেয়র প্রার্থীরা

আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আজমত উল্লা খান গতকাল নগরীর শিল্পাঞ্চল কোনাবাড়ি থানার বিভিন্ন ওয়ার্ডে ব্যাপক গণসংযোগ করেন। তিনি সকাল ১১টার দিকে ১২ নম্বর ওয়ার্ডের বাইমাইল বাজার এলাকা থেকে প্রচারণা শুরু করেন। পরে তিনি জরুন, কোনাবাড়ি বাজার, আমবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি পথসভায় বক্তব্য রাখেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শাহাবুদ্দিন শামুর সভাপতিত্বে এসব পথসভায় মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি আফজাল হোসেন সরকার রিপন, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ আক্কাস আলী, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শেখ মো. আসাদুল্লা, কোনাবাড়ি থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুর রহমান মাস্টার, মো. শহীদুল ইসলাম ও অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

পথসভায় আজমত উল্লা খান বলেন, প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত জনবসতিপূর্ণ শিল্পসমৃদ্ধ এলাকা কোনাবাড়িসহ গাজীপুরকে সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত করেছেন। এ এলাকার মানুষের উন্নয়নের জন্য তিনি সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেন। এত টাকা বরাদ্দ পাওয়া সত্ত্বেও পরিকল্পিতভাবে সিটির উন্নয়ন কাজ করা হয়নি। তিনি বলেন, টাকা থাকলে কাজ হয় না এটা মেনে নেয়া যায় না। কোন জায়গায় যদি দুর্নীতি থাকে তাহলে ভালো কাজ করা যায় না। তিনি বলেন আমি মেয়র পদে নির্বাচিত হলে সব শ্রেণীর মানুষের জন্য মেয়রের দরজা উন্মুক্ত থাকবে যাতে কোন মানুষ এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে না থাকে। তিনি বলেন গত তিন বছরে সাবেক মেয়রের বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেছে। অথচ আমি আঠারো বছর টঙ্গী পৌরসভার মেয়র পদে দায়িত্ব পালনকালে কেউ আমার বিরুদ্ধে কোন দুর্র্নীতির অভিযোগ আনতে পারেনি। আমি নির্বাচিত হলে গাজীপুর সিটি করপোরেশনকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত সিটি হিসেবে গড়ে তুলব। এদিকে মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক কামরুল আহসান সরকার রাসেলের নেতৃত্বে যুবলীগের নেতাকর্মীরা নৌকার পক্ষে বাসন মেট্রো থানার চান্দনা-চৌরাস্তাসহ বিভিন্ন স্থানে প্রচারপত্র বিলি করে ভোটারদের কাছে ভোট চান।

অন্যদিকে টেবিল ঘড়ি প্রতীকের স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী জায়েদা খাতুন গতকাল বিকেলে ছয়দানা ডেগেরচালা এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে লিফলেট বিতরণ করে গণসংযোগ করেন। পরে তিনি টঙ্গীর পূর্ব থানা এলাকায় প্রচারণা চালান। এ সময় তার ছেলে সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমসহ কর্মী-সমর্থকরা উপস্থিত ছিলেন। গণসংযোগকালে প্রার্থী জায়েদা খাতুন বলেন, আমি মহিলা মানুষ, আমাকে এত ভয় কেন। আমরা অন্য কারো প্রচারণায় বাধা দিচ্ছি না। আমি সুষ্ঠু নির্বাচন চাই, এ জন্য আপনারা টেবিল ঘড়ি প্রতীকে ভোট দিবেন। তিনি বলেন, জনগণ আমার পাশে আছেন। আগামী ২৫ মে নির্বাচনে ভোটাররা আমাকে বিজয়ী করবেন এটা আমার আশা।

একই দিন সকালে জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী এমএম নিয়াজ উদ্দিন শহরের গাজীপুর জর্জ কোর্ট প্রাঙ্গণ এলাকায় গণসংযোগ করেন। দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে তিনি প্রচারপত্র বিলি করে লাঙ্গল মার্কায় ভোট চান।

এদিকে হাতপাখা প্রতীকের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী গাজী আতাউর রহমান দুপুরে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন উপলক্ষে ৩৪ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন। গতকাল দুপুরে শহরের হাবিবউল্লা সরণির একটি পত্রিকা অফিসে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নগরবাসীর উদ্দেশে এ ইশতেহার তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আমি নির্বাচিত হলে নগরবাসীর জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাসহ বিশেষজ্ঞ কমিটির সমন্বয়ে নগর সরকার, দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড, যাকাত বোর্ড গঠন করব। ৩৪ দফা ইশতেহার তুলে ধরে তিনি ঘোষণা দেন জয়ী হলে নগর ভবন ধনী-গরিব সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। সিটি নির্বাচনের প্রতীক বরাদ্দের পর এই প্রথম কোন প্রার্থী ইশতেহার ঘোষণা করলেন।

হাতি প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী সরকার শাহনুর ইসলাম রনি সকাল থেকে টঙ্গীর ৪৯ ও ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের এরশাদ নগর ও গাজীপুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করেন।