অন্তর্বর্তীকালীন গ্যাস বিপণন প্রসঙ্গে

নেছার আহমদ

বর্তমান অস্থিতিশীল বিশ্বে জ্বালানি খাতকে অন্যতম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতির ত্রাহি মধূসুদন অবস্থায় বাংলাদেশের জ্বালানি খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। ডলারের দাম বৃদ্ধি, দেশীয় গ্যাস ক্ষেত্রসমূহ হতে চাহিদানুযায়ী গ্যাস না পাওয়া, এলএনজির বিশ্ব বাজারের উত্থান-পতন প্রভৃতি কারণে দেশে গ্যাসের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি এবং নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় নানাবিধ কারণে বিনিয়োগকারীদের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। একলাফে ডাবলের চেয়ে বেশি গ্যাস মূল্য বৃদ্ধিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবার আশঙ্কা রয়েছে। রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পও মারাত্মক ক্ষতির মধ্যে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গ্যাস বিপণন কোম্পানিসমূহের একশ্রেণীর অতি উৎসাহী কিছু কর্মকর্তাদের কারণে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো আরো মারাত্মক ক্ষতির মধ্যে পতিত হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

বিপণন কোম্পানীগুলো সরকার গঠিত বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বোর্ডের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। সেখানে পেট্রোবাংলার ন্যায় একটি মাথাভারি প্রসাশনের উপস্থিতি নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা হতাশ। বিপণন বা বিতরণ ব্যবস্থাপনায় যদি বোর্ডের সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত হয় সেখানে পেট্রোবাংলা একটি পোস্টঅফিস মার্কা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে পেট্রোবাংলার বিপণন কোম্পানিসমূহে তদন্তের নামে হয়রানি, চিঠি আদান-প্রদানকারী এবং প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। কর্মবিহীন পেট্রোবাংলাকে বিলুপ্ত করে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কোম্পানিগুলো সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে কাজ করতে পারে বলে মতামত প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞমহল।

জ্বালানি সেক্টরের সবাই নিয়মকানুনের বিষয়ে এবং জ্বালানি ব্যবহারে সরকার নতুন পদ্ধতি চালু করার পরিকল্পনা নিয়েছে দীর্ঘ দিন আগে কিন্তু এখনো পর্যন্ত চূড়ান্ত করতে পারেনি। এর মধ্যে সরকারের তরফ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে বেসরকারি উদ্যোক্তারা জ্বালানি আমদানি করে বিপণন করতে পারবে। এতে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির বিষয়টিও রয়েছে। ফলে গ্যাস বিপণনে নতুন বিধি যুক্ত করে নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চললেও বিগত কয়েক বছরেও এ বিধিমালা চুড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টরা মতামত দিলেও তা চূড়ান্ত হয়নি।

নতুন গ্যাস বিপণন বিধিমালা ২০১৯ এর খসড়া দেশের সাধারণ মানুষের মতামতের জন্য জ্বালানি বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হলেও এ বিষয়ে কোন মতামত পাওয়া যায়নি। গ্যাস ব্যবহারের শুরু থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত বিতরণ কোম্পানিভিত্তিক প্রণীত নিয়ম অনুযায়ী গ্যাস বিপণন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। পরবর্তীতে সব বিতরণ কোম্পানির জন্য গ্যাস বিপণন নিয়মাবলী ২০০৪ কার্যকর করা হয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী ব্যবহার হিসেবে গ্যাস বিপণন নিয়মাবলী-২০১৪ প্রস্তুত করা হয়।

নিয়মাবলী-২০১৪ প্রণয়নের সময় চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স এবং চট্টগ্রাম গ্যাস পানি বিদ্যুৎ গ্রাহক কল্যাণ পরিষদের পক্ষ হতে অনেকগুলো সংশোধনী ও প্রস্তাবনা প্রেরণ করা হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ গ্যাস আইন ২০১০ ধারা ২৮ অনুযায়ী গ্যাস ২০১৯ এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু গ্যাস বিপণন নীতিমালা ২০১৯ এখনো অনুমোদন না হওয়ায় অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে গ্যাস বিপণন নিয়মাবলী-২০১৪ অনুযায়ী কোম্পানিগুলো পরিচালিত হচ্ছে।

বর্তমানে গ্যাস বিপণন নীতিমালা যেন হয়রানির একটি মারাত্মক অস্ত্র হিসেবে দেখা দিয়েছে। কর্মকর্তারা এ নীতিমালাকে ব্যবহার করে গ্রাহক হয়রানি করে আসছে। যদিওবা এ নীতিমালাটি এখন সময়ের ধারাবাহিকতায় অকার্যকর বলে মনে করছেন বিশেজ্ঞরা।

নীতিমালা-২০১৪ অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণীর গ্রাহকদের (আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প, সিএনজি, ক্যাপটিভ, চা বাগান বা অন্যান্য) যে সুযোগ সুবিধা বা সেবা প্রদানের ধারাসমূহ সম্পৃক্ত রয়েছে। বর্তমানে কর্মকর্তারা সে ধারাসমূহ অনুসরণ বা বাস্তবায়ন করেন না, অনুমোদনের ক্ষেত্রে নীতিমালায় ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ক্ষমতা দেয়া হলেও তার কার্যকারিতা নেই। ক্ষমতা নিয়ে নেয়া হয়েছে কোম্পানির পরিচালনা বোর্ডে। বিভিন্ন সময়ে জারিকৃত সার্কুলার বা বিজ্ঞপ্তি এবং মন্ত্রণালয়ের সময়ে সময়ে দেয়া নিদের্শনাসমূহ অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত ও অনুমোদন দেয়ার নিয়ম চলছে; কিন্তু যখন বিভিন্ন ক্যাটাগরির গ্রাহকদের জরিমানা আদায় বা তাদের ওপর অন্যায়ভাবে বিভিন্ন নিয়মকানুন নিরাপত্তা জামানত আরোপিত করা হয় তখন গ্যাস বিপণন নীতিমালা-২০১৪ অনুসরণ করা হয় যা একটি স্বাধীন দেশের জন্য অনৈতিক ও অমানবিক কর্মকাণ্ড। এ ব্যাধিতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত চট্টগ্রামের জন্য প্রতিষ্ঠিত ‘কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লি.’ যা বর্তমানে চট্টগ্রামের সবাই শ্রেণীর গ্রাহকদের জন্য অভিশাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

৮ সেপ্টেম্বর ২০১০ তারিখে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সংযোগ এবং সেবা প্রদানের লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর পর থেকেই ‘কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লি.’ হতে আশানুরূপ সেবা জনগণ পায়নি। শুরুর পর হতে গ্যাস সংকটে ত্রাহি অবস্থা। হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ নষ্ট্র হয়ে যাওয়া প্রভৃতি বিষয়ে বার বার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেও কাংখিত সেবা পায়নি চট্টগ্রামের জনগণ। ২৮/০২/২০১৮ তারিখে চট্টগ্রাম চেম্বারের বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কক্ষে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী (বীরবিক্রম) এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অনেক সুপারিশমালা গৃহীত হয়। এ সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের অথবা গ্যাস বিপণন কোম্পানিগুলো সুপারিশসমূহ বাস্তবায়ন করে ২ মাসের সমপরিমাণ অর্থ জামানত হিসেবে গ্রহণ করে আসছে; কিন্তু কেজিডিসিএল এ বিষয়ে কোন পরিবর্তিত মনোভাব না দেখিয়ে নিজেদের ইচ্ছামতো মনগড়া আইন তৈরি করে এবং পূর্বের ন্যায় ৩ মাসের/৬ মাসের জামানত গ্রহণ করে আসছে। এছাড়াও গ্রাহক সেবা দূরে থাক বরং গ্রাহক হয়রানির যতরকমের নিয়মকানুন রয়েছে তা প্রয়োগ করছে।

কর্মকর্তাদের মাঝে সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বিদ্বেষী মনোভাব কাজ করে। সুপারিশ অনুযায়ী দেশের অন্যান্য বিপণন কোম্পানীতে ১/২ মাসের সমপরিমাণ অর্থ নিরাপত্তা জামানত হিসেবে নেয়া হচ্ছে। কিন্তু কেজিডিসিএল নিজস্বভাবে সবাই নিয়মকানুন উপক্ষো করে ৩ মাসের/৬ মাসের সমপরিমাণ অর্থ আদায় করছে। চট্টগ্রাম চেম্বারের সুপারিশ অন্য কোম্পানিতে বাস্তবায়িত হলেও চট্টগ্রামের কর্ণফুলী গ্যাসে তা বাস্তবায়িত হয়নি। এ বিষয়গুলো চট্টগ্রাম চেম্বারের পক্ষ হতে দেখভাল করার প্রয়োজন ছিল। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিমিটেডের জন্য গ্যাস বিপণন নীতিমালা-২০১৪ যেন গ্রাহক হয়রানির একটি মারাত্মক অস্ত্র। এ অস্ত্র ব্যবহার করে চট্টগ্রামে গ্রাহক হয়রানি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

(ক) গ্রাহক সেবা প্রদানের জন্য যেসব দিক-নির্দেশনা নীতিমালায় রয়েছে তা কোন সময়ই কেজিডিসিএল কর্তৃপক্ষ অনুসরণ করেনি। (খ) গ্রাহকদের বিরুদ্ধে যখন কোন আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয় তখন গ্যাস নীতিমালা-২০১৪ এর আলোকে জরিমানা বা যে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার সময় সব নিয়মকানুন প্রতিপালিত হয়।

২০১৮ হতে এখন পর্যন্ত উপদেষ্টা কমিটি এবং পরবর্তীতে কেজিডিসিএল বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত অনেক প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগ কার্যক্রম গৃহীত হয়নি বরং বিভিন্ন বিষয়ে তদন্তের নামে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করা হচ্ছে। বিগত এক বছরের অধিক সময় ধরে চট্টগ্রামের শিল্প গ্রাহকদের কোন আবেদন অনুমোদন হয়নি। অনেক আবেদন এবং জ্বালানি উপদেষ্টা কর্তৃক অনুমোদিত অনেক প্রতিষ্ঠানে ইচ্ছাকৃতভাবে হয়রানিমূলকভাবে এখনো সংযোগ প্রদান করা হয়নি, বরং এ বিষয়ে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া বেজা, কোরিয়ান ইপিজেড এবং চট্টগ্রাম ইপিজেডেরও অনেক আবেদন দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে আছে। কোন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়নি।

সম্প্রতি পুনঃসংযোগ, নাম পরিবর্তন বা স্থান পরিবর্তনজনিত অনুমোদন নেয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। নাম পরিবর্তন বা পুনঃসংযোগ নিতে গেলে ভূমির কাগজপত্র পরীক্ষার নামে ভূমি অফিসের ছাড়পত্রের ন্যায় নব্য আইন চালু করেছে কেজিডিসিএল; যা দেশের অন্যান্য বিপণন কোম্পানিতে চালু নেই। গ্যাস সংযোগের ক্ষেত্রে এবং শিল্প বিনিয়োগকারীদের কাক্সিক্ষত সেবা প্রদান না করার ফলে শিল্পায়নে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। এতে সরকারের শিল্পনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

সময়ের প্রয়োজনে গ্রাহকসেবা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সংযোগ এবং পুনঃসংযোগের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা পরিহারে কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ক্ষমতা প্রদান করা জরুরি। সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রামবিদ্বেষী ও দায়িত্ব পালনে অনীহা পোষণকারী কর্মকর্তা কর্মচারীদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন। চট্টগ্রামের জন্য প্রতিষ্ঠিত ‘কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লি.’ কোম্পানীটি বর্তমানে যেন আন্তরিকতার সংকটে ভূগছে। বর্ণিত বিষয়াবলী দ্রুত সমাধানপূর্বক চট্টগ্রামের গ্রাহকসেবার মান বৃদ্ধি করা খুবই প্রয়োজন।

[লেখক: প্রাবন্ধিক]

শুক্রবার, ১৯ মে ২০২৩ , ০৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩০, ২৮ শাওয়াল ১৪৪৪

অন্তর্বর্তীকালীন গ্যাস বিপণন প্রসঙ্গে

নেছার আহমদ

বর্তমান অস্থিতিশীল বিশ্বে জ্বালানি খাতকে অন্যতম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতির ত্রাহি মধূসুদন অবস্থায় বাংলাদেশের জ্বালানি খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। ডলারের দাম বৃদ্ধি, দেশীয় গ্যাস ক্ষেত্রসমূহ হতে চাহিদানুযায়ী গ্যাস না পাওয়া, এলএনজির বিশ্ব বাজারের উত্থান-পতন প্রভৃতি কারণে দেশে গ্যাসের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি এবং নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় নানাবিধ কারণে বিনিয়োগকারীদের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। একলাফে ডাবলের চেয়ে বেশি গ্যাস মূল্য বৃদ্ধিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবার আশঙ্কা রয়েছে। রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পও মারাত্মক ক্ষতির মধ্যে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গ্যাস বিপণন কোম্পানিসমূহের একশ্রেণীর অতি উৎসাহী কিছু কর্মকর্তাদের কারণে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো আরো মারাত্মক ক্ষতির মধ্যে পতিত হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

বিপণন কোম্পানীগুলো সরকার গঠিত বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বোর্ডের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। সেখানে পেট্রোবাংলার ন্যায় একটি মাথাভারি প্রসাশনের উপস্থিতি নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা হতাশ। বিপণন বা বিতরণ ব্যবস্থাপনায় যদি বোর্ডের সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত হয় সেখানে পেট্রোবাংলা একটি পোস্টঅফিস মার্কা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে পেট্রোবাংলার বিপণন কোম্পানিসমূহে তদন্তের নামে হয়রানি, চিঠি আদান-প্রদানকারী এবং প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। কর্মবিহীন পেট্রোবাংলাকে বিলুপ্ত করে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কোম্পানিগুলো সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে কাজ করতে পারে বলে মতামত প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞমহল।

জ্বালানি সেক্টরের সবাই নিয়মকানুনের বিষয়ে এবং জ্বালানি ব্যবহারে সরকার নতুন পদ্ধতি চালু করার পরিকল্পনা নিয়েছে দীর্ঘ দিন আগে কিন্তু এখনো পর্যন্ত চূড়ান্ত করতে পারেনি। এর মধ্যে সরকারের তরফ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে বেসরকারি উদ্যোক্তারা জ্বালানি আমদানি করে বিপণন করতে পারবে। এতে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির বিষয়টিও রয়েছে। ফলে গ্যাস বিপণনে নতুন বিধি যুক্ত করে নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চললেও বিগত কয়েক বছরেও এ বিধিমালা চুড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টরা মতামত দিলেও তা চূড়ান্ত হয়নি।

নতুন গ্যাস বিপণন বিধিমালা ২০১৯ এর খসড়া দেশের সাধারণ মানুষের মতামতের জন্য জ্বালানি বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হলেও এ বিষয়ে কোন মতামত পাওয়া যায়নি। গ্যাস ব্যবহারের শুরু থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত বিতরণ কোম্পানিভিত্তিক প্রণীত নিয়ম অনুযায়ী গ্যাস বিপণন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। পরবর্তীতে সব বিতরণ কোম্পানির জন্য গ্যাস বিপণন নিয়মাবলী ২০০৪ কার্যকর করা হয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী ব্যবহার হিসেবে গ্যাস বিপণন নিয়মাবলী-২০১৪ প্রস্তুত করা হয়।

নিয়মাবলী-২০১৪ প্রণয়নের সময় চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স এবং চট্টগ্রাম গ্যাস পানি বিদ্যুৎ গ্রাহক কল্যাণ পরিষদের পক্ষ হতে অনেকগুলো সংশোধনী ও প্রস্তাবনা প্রেরণ করা হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ গ্যাস আইন ২০১০ ধারা ২৮ অনুযায়ী গ্যাস ২০১৯ এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু গ্যাস বিপণন নীতিমালা ২০১৯ এখনো অনুমোদন না হওয়ায় অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে গ্যাস বিপণন নিয়মাবলী-২০১৪ অনুযায়ী কোম্পানিগুলো পরিচালিত হচ্ছে।

বর্তমানে গ্যাস বিপণন নীতিমালা যেন হয়রানির একটি মারাত্মক অস্ত্র হিসেবে দেখা দিয়েছে। কর্মকর্তারা এ নীতিমালাকে ব্যবহার করে গ্রাহক হয়রানি করে আসছে। যদিওবা এ নীতিমালাটি এখন সময়ের ধারাবাহিকতায় অকার্যকর বলে মনে করছেন বিশেজ্ঞরা।

নীতিমালা-২০১৪ অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণীর গ্রাহকদের (আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প, সিএনজি, ক্যাপটিভ, চা বাগান বা অন্যান্য) যে সুযোগ সুবিধা বা সেবা প্রদানের ধারাসমূহ সম্পৃক্ত রয়েছে। বর্তমানে কর্মকর্তারা সে ধারাসমূহ অনুসরণ বা বাস্তবায়ন করেন না, অনুমোদনের ক্ষেত্রে নীতিমালায় ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ক্ষমতা দেয়া হলেও তার কার্যকারিতা নেই। ক্ষমতা নিয়ে নেয়া হয়েছে কোম্পানির পরিচালনা বোর্ডে। বিভিন্ন সময়ে জারিকৃত সার্কুলার বা বিজ্ঞপ্তি এবং মন্ত্রণালয়ের সময়ে সময়ে দেয়া নিদের্শনাসমূহ অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত ও অনুমোদন দেয়ার নিয়ম চলছে; কিন্তু যখন বিভিন্ন ক্যাটাগরির গ্রাহকদের জরিমানা আদায় বা তাদের ওপর অন্যায়ভাবে বিভিন্ন নিয়মকানুন নিরাপত্তা জামানত আরোপিত করা হয় তখন গ্যাস বিপণন নীতিমালা-২০১৪ অনুসরণ করা হয় যা একটি স্বাধীন দেশের জন্য অনৈতিক ও অমানবিক কর্মকাণ্ড। এ ব্যাধিতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত চট্টগ্রামের জন্য প্রতিষ্ঠিত ‘কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লি.’ যা বর্তমানে চট্টগ্রামের সবাই শ্রেণীর গ্রাহকদের জন্য অভিশাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

৮ সেপ্টেম্বর ২০১০ তারিখে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সংযোগ এবং সেবা প্রদানের লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরুর পর থেকেই ‘কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লি.’ হতে আশানুরূপ সেবা জনগণ পায়নি। শুরুর পর হতে গ্যাস সংকটে ত্রাহি অবস্থা। হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ নষ্ট্র হয়ে যাওয়া প্রভৃতি বিষয়ে বার বার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেও কাংখিত সেবা পায়নি চট্টগ্রামের জনগণ। ২৮/০২/২০১৮ তারিখে চট্টগ্রাম চেম্বারের বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কক্ষে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী (বীরবিক্রম) এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অনেক সুপারিশমালা গৃহীত হয়। এ সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের অথবা গ্যাস বিপণন কোম্পানিগুলো সুপারিশসমূহ বাস্তবায়ন করে ২ মাসের সমপরিমাণ অর্থ জামানত হিসেবে গ্রহণ করে আসছে; কিন্তু কেজিডিসিএল এ বিষয়ে কোন পরিবর্তিত মনোভাব না দেখিয়ে নিজেদের ইচ্ছামতো মনগড়া আইন তৈরি করে এবং পূর্বের ন্যায় ৩ মাসের/৬ মাসের জামানত গ্রহণ করে আসছে। এছাড়াও গ্রাহক সেবা দূরে থাক বরং গ্রাহক হয়রানির যতরকমের নিয়মকানুন রয়েছে তা প্রয়োগ করছে।

কর্মকর্তাদের মাঝে সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বিদ্বেষী মনোভাব কাজ করে। সুপারিশ অনুযায়ী দেশের অন্যান্য বিপণন কোম্পানীতে ১/২ মাসের সমপরিমাণ অর্থ নিরাপত্তা জামানত হিসেবে নেয়া হচ্ছে। কিন্তু কেজিডিসিএল নিজস্বভাবে সবাই নিয়মকানুন উপক্ষো করে ৩ মাসের/৬ মাসের সমপরিমাণ অর্থ আদায় করছে। চট্টগ্রাম চেম্বারের সুপারিশ অন্য কোম্পানিতে বাস্তবায়িত হলেও চট্টগ্রামের কর্ণফুলী গ্যাসে তা বাস্তবায়িত হয়নি। এ বিষয়গুলো চট্টগ্রাম চেম্বারের পক্ষ হতে দেখভাল করার প্রয়োজন ছিল। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিমিটেডের জন্য গ্যাস বিপণন নীতিমালা-২০১৪ যেন গ্রাহক হয়রানির একটি মারাত্মক অস্ত্র। এ অস্ত্র ব্যবহার করে চট্টগ্রামে গ্রাহক হয়রানি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

(ক) গ্রাহক সেবা প্রদানের জন্য যেসব দিক-নির্দেশনা নীতিমালায় রয়েছে তা কোন সময়ই কেজিডিসিএল কর্তৃপক্ষ অনুসরণ করেনি। (খ) গ্রাহকদের বিরুদ্ধে যখন কোন আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয় তখন গ্যাস নীতিমালা-২০১৪ এর আলোকে জরিমানা বা যে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার সময় সব নিয়মকানুন প্রতিপালিত হয়।

২০১৮ হতে এখন পর্যন্ত উপদেষ্টা কমিটি এবং পরবর্তীতে কেজিডিসিএল বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত অনেক প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগ কার্যক্রম গৃহীত হয়নি বরং বিভিন্ন বিষয়ে তদন্তের নামে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করা হচ্ছে। বিগত এক বছরের অধিক সময় ধরে চট্টগ্রামের শিল্প গ্রাহকদের কোন আবেদন অনুমোদন হয়নি। অনেক আবেদন এবং জ্বালানি উপদেষ্টা কর্তৃক অনুমোদিত অনেক প্রতিষ্ঠানে ইচ্ছাকৃতভাবে হয়রানিমূলকভাবে এখনো সংযোগ প্রদান করা হয়নি, বরং এ বিষয়ে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া বেজা, কোরিয়ান ইপিজেড এবং চট্টগ্রাম ইপিজেডেরও অনেক আবেদন দীর্ঘ সময় ধরে পড়ে আছে। কোন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়নি।

সম্প্রতি পুনঃসংযোগ, নাম পরিবর্তন বা স্থান পরিবর্তনজনিত অনুমোদন নেয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। নাম পরিবর্তন বা পুনঃসংযোগ নিতে গেলে ভূমির কাগজপত্র পরীক্ষার নামে ভূমি অফিসের ছাড়পত্রের ন্যায় নব্য আইন চালু করেছে কেজিডিসিএল; যা দেশের অন্যান্য বিপণন কোম্পানিতে চালু নেই। গ্যাস সংযোগের ক্ষেত্রে এবং শিল্প বিনিয়োগকারীদের কাক্সিক্ষত সেবা প্রদান না করার ফলে শিল্পায়নে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। এতে সরকারের শিল্পনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

সময়ের প্রয়োজনে গ্রাহকসেবা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সংযোগ এবং পুনঃসংযোগের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা পরিহারে কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ক্ষমতা প্রদান করা জরুরি। সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রামবিদ্বেষী ও দায়িত্ব পালনে অনীহা পোষণকারী কর্মকর্তা কর্মচারীদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন। চট্টগ্রামের জন্য প্রতিষ্ঠিত ‘কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লি.’ কোম্পানীটি বর্তমানে যেন আন্তরিকতার সংকটে ভূগছে। বর্ণিত বিষয়াবলী দ্রুত সমাধানপূর্বক চট্টগ্রামের গ্রাহকসেবার মান বৃদ্ধি করা খুবই প্রয়োজন।

[লেখক: প্রাবন্ধিক]