ইসরায়েলের ফাঁদে হামাস

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

অক্টোবর ৭, ২০২৩, সকাল সাড়ে ছয়টা; ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ইসরায়েলের ওপর এক নজিরবিহীন আক্রমণ শুরু করে। হামাস পাঁচ হাজার রকেটও ছুড়েছে; অধিকাংশ রকেট মাটি বা কোন স্থাপনায় আঘাত করার আগেই ইসরায়েল তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোম দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছে। তারপরও ইসরায়েলের তেরশ লোক হতাহত হয়েছে। রকেট ছোড়ার পাশাপাশি গাজা সীমান্তে শক্তিশালী সীমানা প্রাচীর ভেঙে ইসরায়েলে ঢুকে পড়ে হামাস যোদ্ধারা। হামাস যোদ্ধারা সুরক্ষিত সীমান্ত বেড়া ডিঙিয়ে গাজা উপত্যকার কাছাকাছি ইসরায়েলি বসতিগুলোতে ঢুকে অতর্কিত হামলা চালায়। হামাস যোদ্ধারা ইসরাইলের উন্মুক্ত স্থানে একটি সঙ্গীত উৎসবে অংশ নেয়া মানুষের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে এবং কিছু লোককে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে গাজায় নিয়ে জিম্মি করে রেখেছে। ইসরায়েলের উদ্ধারকর্মীরা এই স্থান থেকে ২৬০ জনের মরদেহ উদ্ধার করে। হামাসের পক্ষ থেকে এমন একটি নৃশংস সশস্ত্র অভিযান হতে পারে তা কেউ কল্পনাও করেনি। ইসরায়েলের নতুন প্রজন্ম তাদের দেশ এমন ভয়াবহ আক্রমণের শিকার হতে কখনো দেখেনি।

গাজা-ইসরায়েল সীমান্তের কোথাও কোথাও কংক্রিটের দেয়াল, আবার কোথাও কোথাও তারের বেড়া রয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেয়ালের সর্বত্র মোশন সেন্সর ও সিসি ক্যামেরা রয়েছে; মোশন সেন্সরের সাহায্যে বেড়ার আশপাশের কোন প্রাণীর নড়াচড়াও শনাক্ত করা যায়। উপরন্তু অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সেনা টহলের ব্যবস্থাও রয়েছে। হামাস যোদ্ধারা প্রথমে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সুরক্ষিত সীমান্ত বেড়া ভেঙে ফেলে, পরে বুলডোজার দিয়ে বেড়ার ভাঙা অংশটি বড় করা হয়, যাতে গাড়ি ঢুকতে পারে। সশস্ত্র হামাসের অনেকে আবার মোটরসাইকেলে সীমান্ত পার হয়েছে। আবার অনেক হামাস ছত্রীসেনা সমুদ্র থেকে প্যারাগ্লাইডার দিয়ে ইসরায়েলে ঢুকে পড়ে। সীমান্তে নজরদারির জন্য এই অভিযানে ড্রোনও ব্যবহার করা হয়েছে।

দীর্ঘক্ষণ ধরে হামাসের এসব কর্মকা- ইসরাইলিদের নজরে কেন পড়ল না তা রহস্যাবৃত। উপরন্তু ইসরায়েল তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা হামাসদের জন্য এভাবে দীর্ঘক্ষণ অরক্ষিত রাখার কথা নয়। সেন্সর, সিসি ক্যামেরা, সেনাদের টহলের সুরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দেয়ার কারিগরি জ্ঞান হামাস আয়ত্ব করতে পেরেছে- এমন বিশ্বাসে স্বস্তি আসে। কিন্তু ইসরায়েল এবং ইহুদিদের জ্ঞান-গরিমা বিচার করলে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে হামাসের অনুপ্রবেশ অবিশ্বাস্য মনে হয়। আরও বহুবিধ কারণে হামাসের এমন সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ জাগে। ২০০৫ সালে গাজা থেকে ইসরায়েল সেটেলার ও সেনাদের প্রত্যাহার করে নিলেও গাজার আকাশ, সমুদ্র ও সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের হাতেই রয়েছে।

গাজার এক চিলতে ভূখ-ের মধ্যে ফিলিস্তিনি হামাসেরা ইসরায়েল এবং মিসর দ্বারা অবরুদ্ধ; একদিকে ভূমধ্যসাগর, তিন দিকে ইসরায়েল এবং দক্ষিণ দিকের একটি চিকন করিডর রয়েছে মিসরের সিনাই সীমান্তে। ইসরায়েল এবং মিসর দুটি দেশই তাদের চলাফেরায় নজরদারি করে থাকে। কঠোর সীমান্ত প্রহরা আর চেক পয়েন্ট পেরিয়ে বাইরে যাওয়ার সুযোগ অতি সীমিত। ২০০৬ সালের ফিলিস্তিনি আইনসভার নির্বাচনে হামাস জয়ী হলে প্রতিদ্বন্দ্বী ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক দল ফাতাহর সঙ্গে তাদের সংঘাত সৃষ্টি হয়। এই অবস্থায় হামাস গাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিলে শুধু পশ্চিম তীরে ফাতাহর নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে। আমেরিকা এবং ইসরায়েলের মিত্র রাষ্ট্রগুলো হামাসকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে গণ্য করে বিধায় হামাসের নিয়ন্ত্রণাধীন গাজায় ইসরায়েল ও মিসর তাদের নজরদারি আরও জোরদার করে তোলে।

২০১৪ সাল থেকে মিসর গাজা সীমান্ত একেবারেই বন্ধ করে দেয়। মিসর হামাসদের পছন্দ করে না, কারণ এই হামাস মিসরে নিষিদ্ধ মুসলিম ব্রাদারহুড সংগঠনের শাখা। এমন অবরুদ্ধ পরিস্থিতির গাজা হচ্ছে পৃথিবীর বৃহত্তম উন্মুক্ত কারাগার। এই অবরুদ্ধ গাজায় কড়া নজরদারির মধ্যে এক হাজার হামাস যোদ্ধার বিরাট বহর কিভাবে ৭ অক্টোবর আক্রমণের প্রস্তুতি নিল তা নিরূপণ করা কঠিন। হামাসের এই সশস্ত্র অভিযানের পূর্বাভাস ইসরায়েল পায়নি- এই কথাটি বিশ্বাস করা কঠিন। ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ‘শিন বেট’, বহিরাগত হুমকি নিয়ে কাজ করা গুপ্তচর সংস্থা ‘মোসাদ’ এবং ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর কোন শাখা এই হামলার আভাস পায়নি- এমন ধারণা পোষণ করতে কষ্ট হয়। পৃথিবীব্যাপী ইসরায়েলের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক রয়েছে। ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ পারে না এমন কোন কাজ নেই। এই সংস্থার ক্ষীপ্রতা বিশ্বের কাছে এক বিস্ময়। মোসাদ এখনো পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লুকিয়ে থাকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদিদের নির্যাতনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিটলারের নাজি বাহিনীর কর্মকর্তাদের খুঁজে খুঁজে অপহরণ করে ইসরায়েলে ফেরত এনে বিচারে সোপর্দ করছে।

এখনো ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিকে ইসরায়েলি খেলোয়াড়দের ওপর গুলি চালানো ফিলিস্তিনিদের খুঁজে খুঁজে বের করে মোসাদ হত্যা করছে। ইসরায়েল বিরোধী কোন মুসলিম দেশ, বিশেষ করে হামাস ও পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিরা যাতে কোনভাবেই ভয়ানক মারণাস্ত্রের অধিকারী হতে না পারে সেজন্য গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ তাদের নজরদারির বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত মনিটরিং করে যাচ্ছে। ইরাকের দূরপাল্লার কামানের গবেষক জেরাল্ড বুল, হামাসের ড্রোন প্রজেক্টের দলনেতা মোহাম্মদ জাওয়ারি, রকেট আধুনিকায়নের ফিলিস্তিনি গবেষক ফাদি আল বাৎশ, ফিলিস্তিনের ফাতাহ আন্দোলনের উপপ্রধান আবু জিহাদ, ফিলিস্তিনের ইসলামিক জিহাদ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ফাতহি শাকিকীসহ আবাবিল-১ ড্রোনের আবিষ্কারক মোহাম্মদ আল-জাওয়ারিকে ইসরায়েলের মোসাদ এত নিখুঁতভাবে হত্যা করেছে যে, হত্যার পর গবেষণা করে শুধু ধারণা করা হয়েছে, মোসাদ ছাড়া এমন গুপ্তহত্যা আর কারও পক্ষে করা সম্ভব নয়।

ইরান যাতে পরমাণু শক্তির অধিকারী হতে না পারে সেজন্য মোসাদ সক্রিয়; তারা মাটির নিচে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় কয়েকবার আক্রমণ করেছে। ইরানের কয়েকজন পরমাণু বিজ্ঞানীর রহস্যজনক মৃত্যুর সঙ্গেও মোসাদ জড়িত বলে সবাই ধারণা করছে। তাই মোসাদের দৃষ্টি এড়িয়ে হামাস কী করে এমন ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করলো তা বিশ্ববাসীর নিকট অবিশ্বাস্য রূপে প্রতীয়মান হচ্ছে। সংসদে একটি বিতর্কিত আইন পাশ করা নিয়ে হামাসের সশস্ত্র অভিযানের পূর্ব পর্যন্ত বিগত কয়েক মাস ধরে ইসরায়েলে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর আদালতের ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপ রহিতকরণ সংশ্লিষ্ট আইনের সংশোধন ঘিরে ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণবিক্ষোভ বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকারকে নড়বড় করে দেয়।

আদালতের ক্ষমতা হ্রাস করে সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধির এই প্রয়াসে জনগণ এত ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে যে, ইসরাযেয়লি বিমানবাহিনীর পাইলটসহ হাজার হাজার রিজার্ভ সৈন্য প্রতিরক্ষা বাহিনীতে অংশ না নেয়ার হুমকি দিয়েছিল। ইসরায়েলের নিরাপত্তা সার্ভিসের সাবেক প্রধান, দেশের প্রধান বিচারপতি, বিশিষ্ট আইনজীবী এবং ব্যবসায়ী নেতারাও সরকারের এই আইন সংশোধনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। এই গণবিক্ষোভ প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করায় তার পরিকল্পিত ফাঁদে হামাস পা দেয়নি তো? সীমান্তে কর্মরত এমন একজন ইসরায়েলি ভিডিওতে এসে উল্লেখ করেছেন যে, অক্টোবরের ১ তারিখ থেকে সীমান্ত রক্ষীদের কেন নিরস্ত্র করা হয় তা অজ্ঞাত। এছাড়াও সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখের বিভিন্ন রিপোর্টে গাজা সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করার উল্লেখ করায় গাজার সীমান্তবর্তী ইসরায়েলের সিটি কর্পোরেশনগুলো ইহুদিদের আসন্ন উৎসব বাতিলের কথা বলে, কিন্তু সেনা কর্তৃপক্ষ সব আশঙ্কা নাকচ করে দেয়।

ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভেতরেও ইসরায়েলের গোয়েন্দা আছে। গোয়েন্দা কাজে ব্যবহৃত সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল সরঞ্জাম উৎপাদনে ইসরায়েল এত অগ্রগামী যে, আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এই সরঞ্জামের জন্য ইসরায়েলের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশও গোয়েন্দা কাজের জন্য তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ইসরায়েলের সরঞ্জাম কিনেছে বলে জানা যায়। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে ইসরায়েলের এমন আকাশচুম্বী সক্ষমতার মধ্যে হামাসের সশস্ত্র অভিযান শুধু বিস্ময় সৃষ্টি করে না, এই অভিযানে ইসরায়েলি গোয়েন্দার প্ররোচনা থাকার সম্ভাবনাও উয়িয়ে দেয়া যায় না। হামাসের এই অভিযানে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু একদিকে জনরোষ থেকে উদ্ধার পাওয়ার পাশাপাশি হামাসের যুদ্ধ করার সক্ষমতা দীর্ঘদিনের জন্য পঙ্গু করে দেয়া সম্ভব হলো।

[লেখক : সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, টাকশাল ]

রবিবার, ১২ নভেম্বর ২০২৩ , ২৬ কার্তিক ১৪৩০, ২৬ রবিউস সানি ১৪৪৫

ইসরায়েলের ফাঁদে হামাস

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

অক্টোবর ৭, ২০২৩, সকাল সাড়ে ছয়টা; ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ইসরায়েলের ওপর এক নজিরবিহীন আক্রমণ শুরু করে। হামাস পাঁচ হাজার রকেটও ছুড়েছে; অধিকাংশ রকেট মাটি বা কোন স্থাপনায় আঘাত করার আগেই ইসরায়েল তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোম দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছে। তারপরও ইসরায়েলের তেরশ লোক হতাহত হয়েছে। রকেট ছোড়ার পাশাপাশি গাজা সীমান্তে শক্তিশালী সীমানা প্রাচীর ভেঙে ইসরায়েলে ঢুকে পড়ে হামাস যোদ্ধারা। হামাস যোদ্ধারা সুরক্ষিত সীমান্ত বেড়া ডিঙিয়ে গাজা উপত্যকার কাছাকাছি ইসরায়েলি বসতিগুলোতে ঢুকে অতর্কিত হামলা চালায়। হামাস যোদ্ধারা ইসরাইলের উন্মুক্ত স্থানে একটি সঙ্গীত উৎসবে অংশ নেয়া মানুষের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে এবং কিছু লোককে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে গাজায় নিয়ে জিম্মি করে রেখেছে। ইসরায়েলের উদ্ধারকর্মীরা এই স্থান থেকে ২৬০ জনের মরদেহ উদ্ধার করে। হামাসের পক্ষ থেকে এমন একটি নৃশংস সশস্ত্র অভিযান হতে পারে তা কেউ কল্পনাও করেনি। ইসরায়েলের নতুন প্রজন্ম তাদের দেশ এমন ভয়াবহ আক্রমণের শিকার হতে কখনো দেখেনি।

গাজা-ইসরায়েল সীমান্তের কোথাও কোথাও কংক্রিটের দেয়াল, আবার কোথাও কোথাও তারের বেড়া রয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেয়ালের সর্বত্র মোশন সেন্সর ও সিসি ক্যামেরা রয়েছে; মোশন সেন্সরের সাহায্যে বেড়ার আশপাশের কোন প্রাণীর নড়াচড়াও শনাক্ত করা যায়। উপরন্তু অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সেনা টহলের ব্যবস্থাও রয়েছে। হামাস যোদ্ধারা প্রথমে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সুরক্ষিত সীমান্ত বেড়া ভেঙে ফেলে, পরে বুলডোজার দিয়ে বেড়ার ভাঙা অংশটি বড় করা হয়, যাতে গাড়ি ঢুকতে পারে। সশস্ত্র হামাসের অনেকে আবার মোটরসাইকেলে সীমান্ত পার হয়েছে। আবার অনেক হামাস ছত্রীসেনা সমুদ্র থেকে প্যারাগ্লাইডার দিয়ে ইসরায়েলে ঢুকে পড়ে। সীমান্তে নজরদারির জন্য এই অভিযানে ড্রোনও ব্যবহার করা হয়েছে।

দীর্ঘক্ষণ ধরে হামাসের এসব কর্মকা- ইসরাইলিদের নজরে কেন পড়ল না তা রহস্যাবৃত। উপরন্তু ইসরায়েল তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা হামাসদের জন্য এভাবে দীর্ঘক্ষণ অরক্ষিত রাখার কথা নয়। সেন্সর, সিসি ক্যামেরা, সেনাদের টহলের সুরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দেয়ার কারিগরি জ্ঞান হামাস আয়ত্ব করতে পেরেছে- এমন বিশ্বাসে স্বস্তি আসে। কিন্তু ইসরায়েল এবং ইহুদিদের জ্ঞান-গরিমা বিচার করলে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে হামাসের অনুপ্রবেশ অবিশ্বাস্য মনে হয়। আরও বহুবিধ কারণে হামাসের এমন সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ জাগে। ২০০৫ সালে গাজা থেকে ইসরায়েল সেটেলার ও সেনাদের প্রত্যাহার করে নিলেও গাজার আকাশ, সমুদ্র ও সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের হাতেই রয়েছে।

গাজার এক চিলতে ভূখ-ের মধ্যে ফিলিস্তিনি হামাসেরা ইসরায়েল এবং মিসর দ্বারা অবরুদ্ধ; একদিকে ভূমধ্যসাগর, তিন দিকে ইসরায়েল এবং দক্ষিণ দিকের একটি চিকন করিডর রয়েছে মিসরের সিনাই সীমান্তে। ইসরায়েল এবং মিসর দুটি দেশই তাদের চলাফেরায় নজরদারি করে থাকে। কঠোর সীমান্ত প্রহরা আর চেক পয়েন্ট পেরিয়ে বাইরে যাওয়ার সুযোগ অতি সীমিত। ২০০৬ সালের ফিলিস্তিনি আইনসভার নির্বাচনে হামাস জয়ী হলে প্রতিদ্বন্দ্বী ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক দল ফাতাহর সঙ্গে তাদের সংঘাত সৃষ্টি হয়। এই অবস্থায় হামাস গাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিলে শুধু পশ্চিম তীরে ফাতাহর নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে। আমেরিকা এবং ইসরায়েলের মিত্র রাষ্ট্রগুলো হামাসকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে গণ্য করে বিধায় হামাসের নিয়ন্ত্রণাধীন গাজায় ইসরায়েল ও মিসর তাদের নজরদারি আরও জোরদার করে তোলে।

২০১৪ সাল থেকে মিসর গাজা সীমান্ত একেবারেই বন্ধ করে দেয়। মিসর হামাসদের পছন্দ করে না, কারণ এই হামাস মিসরে নিষিদ্ধ মুসলিম ব্রাদারহুড সংগঠনের শাখা। এমন অবরুদ্ধ পরিস্থিতির গাজা হচ্ছে পৃথিবীর বৃহত্তম উন্মুক্ত কারাগার। এই অবরুদ্ধ গাজায় কড়া নজরদারির মধ্যে এক হাজার হামাস যোদ্ধার বিরাট বহর কিভাবে ৭ অক্টোবর আক্রমণের প্রস্তুতি নিল তা নিরূপণ করা কঠিন। হামাসের এই সশস্ত্র অভিযানের পূর্বাভাস ইসরায়েল পায়নি- এই কথাটি বিশ্বাস করা কঠিন। ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ‘শিন বেট’, বহিরাগত হুমকি নিয়ে কাজ করা গুপ্তচর সংস্থা ‘মোসাদ’ এবং ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর কোন শাখা এই হামলার আভাস পায়নি- এমন ধারণা পোষণ করতে কষ্ট হয়। পৃথিবীব্যাপী ইসরায়েলের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক রয়েছে। ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ পারে না এমন কোন কাজ নেই। এই সংস্থার ক্ষীপ্রতা বিশ্বের কাছে এক বিস্ময়। মোসাদ এখনো পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লুকিয়ে থাকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদিদের নির্যাতনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিটলারের নাজি বাহিনীর কর্মকর্তাদের খুঁজে খুঁজে অপহরণ করে ইসরায়েলে ফেরত এনে বিচারে সোপর্দ করছে।

এখনো ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিকে ইসরায়েলি খেলোয়াড়দের ওপর গুলি চালানো ফিলিস্তিনিদের খুঁজে খুঁজে বের করে মোসাদ হত্যা করছে। ইসরায়েল বিরোধী কোন মুসলিম দেশ, বিশেষ করে হামাস ও পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিরা যাতে কোনভাবেই ভয়ানক মারণাস্ত্রের অধিকারী হতে না পারে সেজন্য গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ তাদের নজরদারির বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত মনিটরিং করে যাচ্ছে। ইরাকের দূরপাল্লার কামানের গবেষক জেরাল্ড বুল, হামাসের ড্রোন প্রজেক্টের দলনেতা মোহাম্মদ জাওয়ারি, রকেট আধুনিকায়নের ফিলিস্তিনি গবেষক ফাদি আল বাৎশ, ফিলিস্তিনের ফাতাহ আন্দোলনের উপপ্রধান আবু জিহাদ, ফিলিস্তিনের ইসলামিক জিহাদ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ফাতহি শাকিকীসহ আবাবিল-১ ড্রোনের আবিষ্কারক মোহাম্মদ আল-জাওয়ারিকে ইসরায়েলের মোসাদ এত নিখুঁতভাবে হত্যা করেছে যে, হত্যার পর গবেষণা করে শুধু ধারণা করা হয়েছে, মোসাদ ছাড়া এমন গুপ্তহত্যা আর কারও পক্ষে করা সম্ভব নয়।

ইরান যাতে পরমাণু শক্তির অধিকারী হতে না পারে সেজন্য মোসাদ সক্রিয়; তারা মাটির নিচে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় কয়েকবার আক্রমণ করেছে। ইরানের কয়েকজন পরমাণু বিজ্ঞানীর রহস্যজনক মৃত্যুর সঙ্গেও মোসাদ জড়িত বলে সবাই ধারণা করছে। তাই মোসাদের দৃষ্টি এড়িয়ে হামাস কী করে এমন ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করলো তা বিশ্ববাসীর নিকট অবিশ্বাস্য রূপে প্রতীয়মান হচ্ছে। সংসদে একটি বিতর্কিত আইন পাশ করা নিয়ে হামাসের সশস্ত্র অভিযানের পূর্ব পর্যন্ত বিগত কয়েক মাস ধরে ইসরায়েলে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর আদালতের ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপ রহিতকরণ সংশ্লিষ্ট আইনের সংশোধন ঘিরে ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণবিক্ষোভ বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকারকে নড়বড় করে দেয়।

আদালতের ক্ষমতা হ্রাস করে সরকারের ক্ষমতা বৃদ্ধির এই প্রয়াসে জনগণ এত ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে যে, ইসরাযেয়লি বিমানবাহিনীর পাইলটসহ হাজার হাজার রিজার্ভ সৈন্য প্রতিরক্ষা বাহিনীতে অংশ না নেয়ার হুমকি দিয়েছিল। ইসরায়েলের নিরাপত্তা সার্ভিসের সাবেক প্রধান, দেশের প্রধান বিচারপতি, বিশিষ্ট আইনজীবী এবং ব্যবসায়ী নেতারাও সরকারের এই আইন সংশোধনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। এই গণবিক্ষোভ প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করায় তার পরিকল্পিত ফাঁদে হামাস পা দেয়নি তো? সীমান্তে কর্মরত এমন একজন ইসরায়েলি ভিডিওতে এসে উল্লেখ করেছেন যে, অক্টোবরের ১ তারিখ থেকে সীমান্ত রক্ষীদের কেন নিরস্ত্র করা হয় তা অজ্ঞাত। এছাড়াও সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখের বিভিন্ন রিপোর্টে গাজা সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করার উল্লেখ করায় গাজার সীমান্তবর্তী ইসরায়েলের সিটি কর্পোরেশনগুলো ইহুদিদের আসন্ন উৎসব বাতিলের কথা বলে, কিন্তু সেনা কর্তৃপক্ষ সব আশঙ্কা নাকচ করে দেয়।

ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভেতরেও ইসরায়েলের গোয়েন্দা আছে। গোয়েন্দা কাজে ব্যবহৃত সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল সরঞ্জাম উৎপাদনে ইসরায়েল এত অগ্রগামী যে, আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এই সরঞ্জামের জন্য ইসরায়েলের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশও গোয়েন্দা কাজের জন্য তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ইসরায়েলের সরঞ্জাম কিনেছে বলে জানা যায়। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে ইসরায়েলের এমন আকাশচুম্বী সক্ষমতার মধ্যে হামাসের সশস্ত্র অভিযান শুধু বিস্ময় সৃষ্টি করে না, এই অভিযানে ইসরায়েলি গোয়েন্দার প্ররোচনা থাকার সম্ভাবনাও উয়িয়ে দেয়া যায় না। হামাসের এই অভিযানে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু একদিকে জনরোষ থেকে উদ্ধার পাওয়ার পাশাপাশি হামাসের যুদ্ধ করার সক্ষমতা দীর্ঘদিনের জন্য পঙ্গু করে দেয়া সম্ভব হলো।

[লেখক : সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, টাকশাল ]