অসুখের সন্ধানে

শেখ মোহাম্মদ সলীম উল্লাহ

সবাই তো সুখী হতে চায়, তবু কেউ সুখী হয়, কেউ হয় না। এ নিগূঢ় বাস্তবতা সত্ত্বেও জাগতিক ব্যবস্থা আমাদেরকে এই সুখের প্রলোভন দিয়েই কর্মে প্রবৃত্ত করে, অথবা কর্ম করতে বাধ্য করে। কর্মেই যদি সুখ হবে, বোধ করিপৃথিবীর কেউ অসুখী হওয়ার সুযোগ ?ছিল না। সুখের নামে চিরকাল মানুষ অজান্তেই অসুখের সন্ধানে ব্যাপৃত হয়।

মিথ্যে মরীচিকায় সুখ নামক অস্পৃশ্য দানবের পিছনে জীবনের উৎকৃষ্ট সময় ব্যয় করে অসুখের অনলে পুড়ে ধুঁকে ধুঁকে জীবন প্রদীপ নির্বাপিত করে। পড়ে থাকে আস্তাকুঁড়ে কাক্সিক্ষত সুখের ছাইভস্ম। নিজের ভেতরেই যত সুখ। অথচ তার টিকিটি পায় না সে। আজীবন তার কাছে সুখ অধরা, সোনার পাথরবাটি।

সুখের ধারণার প্রশ্নটি একটি প্রহেলিকা মাত্র। একে একটি ফ্রেমবন্দি করা সত্যি দুরূহ। আর সেকারণেই হয়তো জন উইলসন বলেছেন, “একেকটি মানুষের কাছে সুখের সংজ্ঞা একেক রকম।” সুখের উৎস অগণ্য। একেকজন মানুষ একেক বিষয়ে সুখ পায়। একজনের কাছে যেটি সুখ আরেক জনের কাছে সেটি নাও হতে পারে। তাই সুখ একটা আপেক্ষিক ব্যাপার। জৈবিক, মানসিক, মনস্তাত্ত্বিক, দর্শনভিত্তিক এবং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সুখের সংজ্ঞা নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়। এটি ঠিক যে, সুখ একটি মানবিক অনুভূতি- যার সঠিক পরিমাপ অত্যন্ত কঠিন এবং এটি নিয়ন্ত্রিত হয় মানুষের নিজস্ব তৃপ্তি, আনন্দ-উচ্ছ্বাস, ভালোবাসা ইত্যাদি দ্বারা। দর্শনশাস্ত্র এবং ধর্মীয় চিন্তাবিদরা প্রায়ই আবেগের পরিবর্তে একটি ভালো জীবন বা সমৃদ্ধশালী জীবনধারণের ক্ষেত্রকে সুখ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। ইসলাম ধর্মে সুখকে ‘রিদাহ বাই আল-কাদাহ’ বলা হয়। অর্থাৎ ভাগ্যে যা আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার নামই সুখ।

মানুষ সুখী হওয়ার জন্য ধন, সম্মান এবং স্বাস্থ্যের সন্ধান করে। জীবনের মান উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধি কামনা করে। ১৭৭৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থমাস জেফারসন কর্তৃক লিখিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে ‘সুখের অনুধাবন করা একটি সর্বজনীন অধিকার’ এরূপ উল্লেখ করা হয়েছিল। মানুষ প্রকৃতিগতভাবে সুখান্বেষী। সুখের লক্ষ্যেই তার পথচলা, সকল কর্মযজ্ঞ। ইসলাম ধর্মে মহান আল্লাহকে স্মরণ করা এবং সকল পুণ্যকর্মের মাধ্যমে প্রশান্তি লাভ বা সুখানুভূতির কথা বলা হয়েছে।বৌদ্ধ ধর্মে সুখী হওয়ার উপায় হিসেবে ৮টি পরামর্শ দেয়া হয়। হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী ভগবদ্ গীতার পাঠের উপর ভিত্তি করে, দ্বৈত বেদান্ত আনন্দকে ব্যাখ্যা করে ভালো চিন্তা এবং ভালো কাজের মাধ্যমে প্রাপ্ত সুখ হিসেবে। পারলৌকিক চিন্তায় ধর্মীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেকে সৎ কর্মে নিজেকে নিয়োজিত করে। এক্ষেত্রে ত্যাগের মহিমা প্রাধান্য পায়। ইহজাগতিক প্রাপ্তি হলো শুধুই বিশ্বাস। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ ধন-সম্পদ, শৌর্য-বীর্য, ক্ষমতা ইত্যাদিতে সুখ খোঁজে। এতে মর্ত্যলোকে নিজস্ব প্রাপ্তির বিষয়টি প্রাধান্য পেয়ে থাকে।

সুখ খুব বেশি সময় স্থায়ী হয় না। সময়ের সাথে সাথে সুখানুভূতি ধীরে ধীরে কমতে থাকে।

তখন জোরালো সুখ লাভের জন্য অথবা ভিন্নরূপ কোনো সুখ লাভের জন্য ভিতরে ভিতরে নতুন নতুন আশা-আকাক্সক্ষা চাহিদার সৃষ্টি হতে থাকে আবার। এটি অর্থনীতির ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধির কারণে নয়। বরং অর্থনীতিবিদ ডুসেনবেরির “প্রদর্শন প্রভাব” এক্ষেত্রে প্রবল ভূমিকা পালন করে। রিচার্ড স্টিলির মতে, “আমাদের জীবনের সুখ হচ্ছে বেলাভূমিতে গড়া বালুর ঘরের মতো যে-কোনো মুহূর্তে জোয়ারের পানিতে তা ভেসে যেতে পারে।” আর সেকারণেই হয়তো বিশ্ববিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল বলেন, “জ্ঞানী লোক কখনও সুখের সন্ধান করেন না, তাঁরা কামনা করেন দুঃখকষ্ট থেকে অব্যাহতি।” জগতে জ্ঞানীর সংখ্যা হয়তো কম। নয়তো সুখের সন্ধানের দীর্ঘশ্বাস এত ভারি কেন।

আমাদের মন অশান্ত, চঞ্চল। কোন কিছুতে স্থিরতা নেই। যে কোনোপ্রাপ্তিতে সুখানুভূতি নেই। তৃপ্তিবোধ নেই। প্রশান্তির আবেশ নেই। আনন্দের জোয়ার নেই। এর কারণ হলো আমরা যখন কোনো অবস্থানে থাকি তখন পরের অবস্থানটা আমাদের ঈর্ষাপরায়ণ করে তোলে। নতুন কিছু প্রাপ্তির তাড়নায় নতুন লক্ষ্য আকাক্সিক্ষত হয়ে ওঠে। আরাধ্য হয়ে ওঠে। বর্তমান অবস্থানটা তুচ্ছ জ্ঞান হয়। তাকে উপভোগ করার সুযোগ মুহূর্তে তিরোহিত হয়ে যায়। সকল চেষ্টা-শ্রম-একাগ্রতা তখন পরের অবস্থানকে ঘিরেই। অথচ আমরা জানিই না ঐখানে প্রকৃত কোনো সুখ আছে কিনা। বাহ্যিক চাকচিক্যে মনে হয় ঐখানেই সকল সুখ নিহিত। ওটা অর্জিত হলেই সর্বসাধন সার্থক হয়ে উঠবে। সকল সুখ অনায়াসে পায়ে গড়িয়ে পড়বে। আর এজন্যেই কবিগুরু বলেছেন, “নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস, ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস।”

বাস্তবতা হলো এই, অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে কোনোভাবে কাক্সিক্ষত অবস্থার নাগাল পেলে সুখের অনুভূতি জাগ্রত হওয়ায় আগেই পরের অবস্থানে চোখ টাটায়। শুরু হয় নতুন অসুখ, নতুন কিছু পাওয়ার উদগ্র বাসনা। হাতছানি দেয় মায়াবী সুখের দুরন্ত অসুর। এভাবেই জীবনব্যাপী নিরন্তর চলতে থাকে সুখের নামে অসুখের সন্ধান। আমাদের শুধু চাই আর চাই। কিন্তু কী চাই, কতটুকু চাই, এ চাওয়ার শেষ কোথায়, আমরা প্রকৃতপক্ষে তা জানি না। তাই যখন যতটুকু পাই সে পাওয়া কখনই সুখের পরশ দিতে পারে না। তাইতো কবিগুরু বলেছেন- “এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মেলে না।/ শুধু সুখ চলে যায়, এমনি মায়ার ছলনা।/ এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মেলে না।/ এরা ভুলে যায়, কারে ছেড়ে কারে চায়।”

ভার্জিল এর ভাষায়, “তিনিই সত্যিকারের সুখী যিনি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি আশা করেন না।” মজার বিষয় হলো, আমরা আমাদের প্রয়োজনের সীমারেখাটা কখনই টানতে পারি না। আর সে সুযোগে যতিহীন প্রয়োজন আমাদের টেনেহিঁচড়ে নিয়ে চলে অসীমের ঠিকানায়। আমরা তখন ক্রীড়নক হয়ে পড়ি। আবার হার্ভার্ডের সর্বকনিষ্ঠ এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রেসিডেন্ট চার্লস উইলিয়াম ইলিয়টের মতে, “ভবিষ্যৎ সুখ সুনিশ্চিত করার সর্বোৎকৃষ্ট উপায় হচ্ছে আজ ন্যায়সঙ্গতভাবে যতটা সম্ভব ততটা সুখী হওয়া।” আব্রাহাম লিংকন বলেছেন, “মানুষ যতটা সুখী হতে চায়, সে ততটাই হতে পারে। সুখের কোনো পরিসীমা নেই। ইচ্ছা করলেই সুখকে আমরা আকাশ অভিসারী করে তুলতে পারি।”

সত্যিই আমরা জীবনকে বদলে দিতে পারি। জীবনকে জীবনের মতো খুঁজে পেতে পারি। উপলব্ধি করতে পারি। দরকার শুধু আমাদের সদিচ্ছা। মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন। নিজের যতটুকু আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা।। উপরের দিকে ঈর্ষার চোখে না তাকিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে সুখ অনুভব করা। আনন্দ খুঁজে পাওয়া। নিজের উপর গভীর আস্থা ও বিশ্বাস রাখা। কখনো নিজেকে হতাশার গভীরে নিমজ্জিত না করে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রয়োজনের নিরিখে সমৃদ্ধির সোপানে নিজেকে নিবেদন করা। তবেই ঈপ্সিত সুখ সুবাসিত সৌন্দর্যে সকাল-সন্ধ্যা-সাঁঝে চারিদিকমোহিত করে তুলবে। জীবনকে পুরোপুরি এবং গভীরভাবে পরিতৃপ্তির সাথে উপভোগ করার সুযোগ সৃষ্টি করবে। এটিই হলো প্রকৃত সুখ। এতে মানসিক প্রশান্তিপ্রগাঢ় হবে। জীবনটা আনন্দে আতিশয্যে সার্থকতায় ভরে উঠবে।

বৃহস্পতিবার, ০৬ জুন ২০২৪ , ২৬ জৈষ্ঠ্য ১৪৩১ ২৭ জিলক্বদ ১৪৪৫

অসুখের সন্ধানে

শেখ মোহাম্মদ সলীম উল্লাহ

image

সবাই তো সুখী হতে চায়, তবু কেউ সুখী হয়, কেউ হয় না। এ নিগূঢ় বাস্তবতা সত্ত্বেও জাগতিক ব্যবস্থা আমাদেরকে এই সুখের প্রলোভন দিয়েই কর্মে প্রবৃত্ত করে, অথবা কর্ম করতে বাধ্য করে। কর্মেই যদি সুখ হবে, বোধ করিপৃথিবীর কেউ অসুখী হওয়ার সুযোগ ?ছিল না। সুখের নামে চিরকাল মানুষ অজান্তেই অসুখের সন্ধানে ব্যাপৃত হয়।

মিথ্যে মরীচিকায় সুখ নামক অস্পৃশ্য দানবের পিছনে জীবনের উৎকৃষ্ট সময় ব্যয় করে অসুখের অনলে পুড়ে ধুঁকে ধুঁকে জীবন প্রদীপ নির্বাপিত করে। পড়ে থাকে আস্তাকুঁড়ে কাক্সিক্ষত সুখের ছাইভস্ম। নিজের ভেতরেই যত সুখ। অথচ তার টিকিটি পায় না সে। আজীবন তার কাছে সুখ অধরা, সোনার পাথরবাটি।

সুখের ধারণার প্রশ্নটি একটি প্রহেলিকা মাত্র। একে একটি ফ্রেমবন্দি করা সত্যি দুরূহ। আর সেকারণেই হয়তো জন উইলসন বলেছেন, “একেকটি মানুষের কাছে সুখের সংজ্ঞা একেক রকম।” সুখের উৎস অগণ্য। একেকজন মানুষ একেক বিষয়ে সুখ পায়। একজনের কাছে যেটি সুখ আরেক জনের কাছে সেটি নাও হতে পারে। তাই সুখ একটা আপেক্ষিক ব্যাপার। জৈবিক, মানসিক, মনস্তাত্ত্বিক, দর্শনভিত্তিক এবং ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সুখের সংজ্ঞা নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়। এটি ঠিক যে, সুখ একটি মানবিক অনুভূতি- যার সঠিক পরিমাপ অত্যন্ত কঠিন এবং এটি নিয়ন্ত্রিত হয় মানুষের নিজস্ব তৃপ্তি, আনন্দ-উচ্ছ্বাস, ভালোবাসা ইত্যাদি দ্বারা। দর্শনশাস্ত্র এবং ধর্মীয় চিন্তাবিদরা প্রায়ই আবেগের পরিবর্তে একটি ভালো জীবন বা সমৃদ্ধশালী জীবনধারণের ক্ষেত্রকে সুখ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন। ইসলাম ধর্মে সুখকে ‘রিদাহ বাই আল-কাদাহ’ বলা হয়। অর্থাৎ ভাগ্যে যা আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকার নামই সুখ।

মানুষ সুখী হওয়ার জন্য ধন, সম্মান এবং স্বাস্থ্যের সন্ধান করে। জীবনের মান উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধি কামনা করে। ১৭৭৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থমাস জেফারসন কর্তৃক লিখিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে ‘সুখের অনুধাবন করা একটি সর্বজনীন অধিকার’ এরূপ উল্লেখ করা হয়েছিল। মানুষ প্রকৃতিগতভাবে সুখান্বেষী। সুখের লক্ষ্যেই তার পথচলা, সকল কর্মযজ্ঞ। ইসলাম ধর্মে মহান আল্লাহকে স্মরণ করা এবং সকল পুণ্যকর্মের মাধ্যমে প্রশান্তি লাভ বা সুখানুভূতির কথা বলা হয়েছে।বৌদ্ধ ধর্মে সুখী হওয়ার উপায় হিসেবে ৮টি পরামর্শ দেয়া হয়। হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী ভগবদ্ গীতার পাঠের উপর ভিত্তি করে, দ্বৈত বেদান্ত আনন্দকে ব্যাখ্যা করে ভালো চিন্তা এবং ভালো কাজের মাধ্যমে প্রাপ্ত সুখ হিসেবে। পারলৌকিক চিন্তায় ধর্মীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেকে সৎ কর্মে নিজেকে নিয়োজিত করে। এক্ষেত্রে ত্যাগের মহিমা প্রাধান্য পায়। ইহজাগতিক প্রাপ্তি হলো শুধুই বিশ্বাস। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ ধন-সম্পদ, শৌর্য-বীর্য, ক্ষমতা ইত্যাদিতে সুখ খোঁজে। এতে মর্ত্যলোকে নিজস্ব প্রাপ্তির বিষয়টি প্রাধান্য পেয়ে থাকে।

সুখ খুব বেশি সময় স্থায়ী হয় না। সময়ের সাথে সাথে সুখানুভূতি ধীরে ধীরে কমতে থাকে।

তখন জোরালো সুখ লাভের জন্য অথবা ভিন্নরূপ কোনো সুখ লাভের জন্য ভিতরে ভিতরে নতুন নতুন আশা-আকাক্সক্ষা চাহিদার সৃষ্টি হতে থাকে আবার। এটি অর্থনীতির ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধির কারণে নয়। বরং অর্থনীতিবিদ ডুসেনবেরির “প্রদর্শন প্রভাব” এক্ষেত্রে প্রবল ভূমিকা পালন করে। রিচার্ড স্টিলির মতে, “আমাদের জীবনের সুখ হচ্ছে বেলাভূমিতে গড়া বালুর ঘরের মতো যে-কোনো মুহূর্তে জোয়ারের পানিতে তা ভেসে যেতে পারে।” আর সেকারণেই হয়তো বিশ্ববিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল বলেন, “জ্ঞানী লোক কখনও সুখের সন্ধান করেন না, তাঁরা কামনা করেন দুঃখকষ্ট থেকে অব্যাহতি।” জগতে জ্ঞানীর সংখ্যা হয়তো কম। নয়তো সুখের সন্ধানের দীর্ঘশ্বাস এত ভারি কেন।

আমাদের মন অশান্ত, চঞ্চল। কোন কিছুতে স্থিরতা নেই। যে কোনোপ্রাপ্তিতে সুখানুভূতি নেই। তৃপ্তিবোধ নেই। প্রশান্তির আবেশ নেই। আনন্দের জোয়ার নেই। এর কারণ হলো আমরা যখন কোনো অবস্থানে থাকি তখন পরের অবস্থানটা আমাদের ঈর্ষাপরায়ণ করে তোলে। নতুন কিছু প্রাপ্তির তাড়নায় নতুন লক্ষ্য আকাক্সিক্ষত হয়ে ওঠে। আরাধ্য হয়ে ওঠে। বর্তমান অবস্থানটা তুচ্ছ জ্ঞান হয়। তাকে উপভোগ করার সুযোগ মুহূর্তে তিরোহিত হয়ে যায়। সকল চেষ্টা-শ্রম-একাগ্রতা তখন পরের অবস্থানকে ঘিরেই। অথচ আমরা জানিই না ঐখানে প্রকৃত কোনো সুখ আছে কিনা। বাহ্যিক চাকচিক্যে মনে হয় ঐখানেই সকল সুখ নিহিত। ওটা অর্জিত হলেই সর্বসাধন সার্থক হয়ে উঠবে। সকল সুখ অনায়াসে পায়ে গড়িয়ে পড়বে। আর এজন্যেই কবিগুরু বলেছেন, “নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিশ্বাস, ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস।”

বাস্তবতা হলো এই, অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে কোনোভাবে কাক্সিক্ষত অবস্থার নাগাল পেলে সুখের অনুভূতি জাগ্রত হওয়ায় আগেই পরের অবস্থানে চোখ টাটায়। শুরু হয় নতুন অসুখ, নতুন কিছু পাওয়ার উদগ্র বাসনা। হাতছানি দেয় মায়াবী সুখের দুরন্ত অসুর। এভাবেই জীবনব্যাপী নিরন্তর চলতে থাকে সুখের নামে অসুখের সন্ধান। আমাদের শুধু চাই আর চাই। কিন্তু কী চাই, কতটুকু চাই, এ চাওয়ার শেষ কোথায়, আমরা প্রকৃতপক্ষে তা জানি না। তাই যখন যতটুকু পাই সে পাওয়া কখনই সুখের পরশ দিতে পারে না। তাইতো কবিগুরু বলেছেন- “এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মেলে না।/ শুধু সুখ চলে যায়, এমনি মায়ার ছলনা।/ এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মেলে না।/ এরা ভুলে যায়, কারে ছেড়ে কারে চায়।”

ভার্জিল এর ভাষায়, “তিনিই সত্যিকারের সুখী যিনি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি আশা করেন না।” মজার বিষয় হলো, আমরা আমাদের প্রয়োজনের সীমারেখাটা কখনই টানতে পারি না। আর সে সুযোগে যতিহীন প্রয়োজন আমাদের টেনেহিঁচড়ে নিয়ে চলে অসীমের ঠিকানায়। আমরা তখন ক্রীড়নক হয়ে পড়ি। আবার হার্ভার্ডের সর্বকনিষ্ঠ এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রেসিডেন্ট চার্লস উইলিয়াম ইলিয়টের মতে, “ভবিষ্যৎ সুখ সুনিশ্চিত করার সর্বোৎকৃষ্ট উপায় হচ্ছে আজ ন্যায়সঙ্গতভাবে যতটা সম্ভব ততটা সুখী হওয়া।” আব্রাহাম লিংকন বলেছেন, “মানুষ যতটা সুখী হতে চায়, সে ততটাই হতে পারে। সুখের কোনো পরিসীমা নেই। ইচ্ছা করলেই সুখকে আমরা আকাশ অভিসারী করে তুলতে পারি।”

সত্যিই আমরা জীবনকে বদলে দিতে পারি। জীবনকে জীবনের মতো খুঁজে পেতে পারি। উপলব্ধি করতে পারি। দরকার শুধু আমাদের সদিচ্ছা। মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন। নিজের যতটুকু আছে তাই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা।। উপরের দিকে ঈর্ষার চোখে না তাকিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে সুখ অনুভব করা। আনন্দ খুঁজে পাওয়া। নিজের উপর গভীর আস্থা ও বিশ্বাস রাখা। কখনো নিজেকে হতাশার গভীরে নিমজ্জিত না করে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রয়োজনের নিরিখে সমৃদ্ধির সোপানে নিজেকে নিবেদন করা। তবেই ঈপ্সিত সুখ সুবাসিত সৌন্দর্যে সকাল-সন্ধ্যা-সাঁঝে চারিদিকমোহিত করে তুলবে। জীবনকে পুরোপুরি এবং গভীরভাবে পরিতৃপ্তির সাথে উপভোগ করার সুযোগ সৃষ্টি করবে। এটিই হলো প্রকৃত সুখ। এতে মানসিক প্রশান্তিপ্রগাঢ় হবে। জীবনটা আনন্দে আতিশয্যে সার্থকতায় ভরে উঠবে।