হারিসুল হকের নির্বাচিত কবিতা

ওবায়েদ আকাশ

নিমগ্নতায় কী মেলে?

আত্মরতির পুড়ে যাওয়া ধূসর পোশাক

স্মৃতির বর্ণচোরা গিরগিটি ছানা

না নিরুদ্ধ প্রতীক্ষার বিবর্ণ কুসুম!

[বেড়ে ওঠো ইচ্ছের পুতুল]

কবি হারিসুল হকের নিমগ্নতা তাঁকে একজন সফল চিকিৎসকের পাশাপাশি কবি বানিয়েছেন। নিমগ্ন হলে যেমন স্মৃতি ফিরে আসে, মেলে প্রতীক্ষার বিবর্ণ কুসুম। আসলে কি তাই? কে নিমগ্ন হয়ে ফিরে পেতে চায় বিবর্ণ কুসুম। আমাদের আরাধ্য তো ভোরবেলার শিশিরসিক্ত সতেজ কুসুম। কিন্তু কবির চাওয়া আর সাধারণের চাওয়ায় তো স্বাতন্ত্র্য থাকবেই। কবি হয়তো সেই বিবর্ণ কুসুমেই রঙ ঢেলে তাকে সতেজ করে তুলতে পারবেন। শিল্পের কাজই তো অতীতকে সুন্দর করে জাগিয়ে ভবিষ্যৎকে ছুঁয়ে দেখা। যে কোনো বিবর্ণতাকে উজ্জ্বল করে প্রগাঢ় নন্দনবোধ জাগ্রত করা।

কবি হারিসুল হক আত্মনিমগ্ন হয়ে সেই কাজটি করেছেন এবং করে চলেছেন, যেখান থেকে আলো বিচ্ছুরিত হয়। আলো ঝলমলে রশ্মি ছড়িয়ে দিয়েছেন ২৪টি রেখায়। তাঁর এ যাবত প্রকাশিত চব্বিশটি কাব্যগ্রন্থ থেকে বাছাই করা কবিতা নিয়ে কবিতা সংক্রান্তি প্রকাশ করেছে হারিসুল হকের নির্বাচিত কবিতা।

৫২০ পৃষ্ঠার এ নির্বাচিত সংকলনটি দেখে বোঝার উপায় নেই এটি তাঁর নির্বাচিত কবিতার সংকলন, মনে হতে পারে কবিতাসংগ্রহ বা সমগ্র। কিন্তু এটি কবির স্বনির্বাচিত কবিতা সংকলন। হারিসুল হকের অধিকাংশ কবিতাই যে তাঁর নির্বাচিত সংকলনে ঠাঁই পাবার যোগ্য তার এই গ্রন্থটি থেকেও সেটা অনুমান করা যায়। তাছাড়া কবির নির্বাচন বলে বিষয়টা বিশেষভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।

হারিসুল হক গত শতকের আশির দশকের একজন শক্তিশালী কবি। তাঁর কবিতার শক্তিমত্তা তিনি নানাভাবে প্রমাণ করেছেন। তাঁর একটি স্বকীয় কণ্ঠস্বর তিনি খুঁজে পেয়েছেন। যাকে অন্য অনেকের সঙ্গে মেলানো যাবে না। তিনি আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতা ও মমনভুবনের নানা জটিল ও অনিবার্য অনুষঙ্গকে তাঁর কবিতায় তুলে ধরেন। তাঁর উপস্থাপনা রীতি ও শব্দ নির্বাচনে তিনি কোনো জটিলতার আশ্রয় না নিয়ে পাঠকের প্রতি নিজেকে দায়বদ্ধ রেখেছেন। তিনি শিল্পকে শুধুই নান্দনিকতার আশ্রয়ে বিকশিত দেখতে চেয়েছেন। অকারণ দুর্বোধ্যতা কিংবা পাঠকের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা তাঁর কবিতায় খুঁজে পাওয়া যাবে না।

তাঁর কিছু কাব্যগ্রন্থের নাম : ফিরে চাও পবিত্র পাখি, জলের পুতুল, হে প্রিয় বিনষ্টি আমার, দুরন্ত ঘুণ জীবনের মাঝে, মতিচ্ছন্ন চাবির ঠিকুজি, ছায়ামাছ, মেতেছি বধির রাতে, সময়ের বিশিষ্ট পেরেক প্রভৃতি। গ্রন্থগুলোর নামকরণের ক্ষেত্রেও তিনি স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলোও পাঠককে ভাবিত করে। পাঠক নতুন কিছুর সন্ধান পেয়ে যান।

হারিসুল হক পাঠকপ্রিয় কবি। কিন্তু স্বভাবে তিনি অন্তর্মুখী। শিল্পের নিজস্ব এলাকায় নিমগ্ন সময় কাটাতে পছন্দ করেন। আবার প্রায়শ তাঁকে দেখা যায় হৈহল্লা করে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠতে। তাঁর কবিতা তাই নির্জনতাপ্রিয় পাঠকের বিশুদ্ধ কবিতা।

তুমি বুঝি স্মৃতিচ্ছন্ন মৌনপ্রজাপতি ভদ্রসভাতে

মেলেছি অন্ধ পাখা বোধশূন্য অবাক আকাশে

[ভুলেছি অনতীত গান, পৃ: ৫৯]

এখানে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত উপস্থিতি তুলে ধরেছেন। তিনি মৌন প্রজাপতির মতো ভদ্রসভাতে নিজেকে খুঁজে পান। উড়ে যান বোধশূন্য অবাক আকাশে। কিন্তু আকাশ তাতে আলোড়িত হয়। সঙ্গীত রচনা করে বাতাসের পাখায়।

একটি প্রসন্ন জবার সঙ্গেই আমার যত বিরোধ

আর কোনো প্রতিপক্ষ নেই আপাতত

...

নিয়ত যুদ্ধরত যে তার কোনো আশ্রয় থাকে না

বিরুদ্ধ বাতাসে ঢেউ ক্রমশই কাবু হতে থাকে

[বিরোধ প্রসন্ন জবার সাথে, পৃ: ১১৬]

কবির কোনো প্রতিপক্ষ নেই। আবার সততা ও কমিটমেন্ট ছাড়া কবির কোনো বন্ধুও থাকে না। কবি অসততা ও অপশাসনের শত্রু। তিনি নিয়ত যুদ্ধ করে চলেন। সেই যুদ্ধ একসময় বিরুদ্ধ বাতাসের মুখোমুখি হয়।

কিন্তু কবির যুদ্ধ কখনো থামে না। তিনি আমৃত্যু সংগ্রামী- মানুষ ও সুন্দরের পাশে।

ফাটুক দাড়িম্ব পাকা সুবিনীত লালাভ লাভায়

নামুক নামুক বৃষ্টি গ্রীবা ছেপে চঞ্চল বেলায়

আমার স্পর্ধায় ঠোঁট জেগে থাক অন্তহীন তোমার সীমায়

[শেষ হবে না, পৃ: ৪৩১]

এখানে হারিসুল হকের কবিতার উপস্থাপনের ভিন্নতা ও চিত্রকল্পের স্বাতন্ত্র্য চোখে পড়ে। তাঁর উচ্চারণ ও বিন্যাস, মেটাফর ও দৃশ্যকল্পকে তিনি তাঁর নিজের মতো করে উপস্থাপন করেন। যে কারণে তাঁর কবিতা পাঠের জন্য আমাদের হৃদয় ব্যাকুল হয়। পাঠক অপেক্ষা করেন এরপর হারিসুল হকের কোন কাব্যগ্রন্থটি আসছে।

কবি হারিসুল হক এসময়ের উল্লেখযোগ্য কবি। তিনি যতটা সম্ভব শিল্পকে, কবিতাকে তাঁর হৃদয়ে গেঁথে নিয়েছেন। তাই তাঁর পেশাগত জীবনে তিনি যতই ব্যস্ত থাকুন না কেন, বারবার তাঁর সাক্ষাৎ মেলে কবিতার উদ্যানেই। তাঁর নির্বাচিত কবিতা পাঠকপ্রিয়তা পাবে- এ আশা অমূলক নয়।

বৃহস্পতিবার, ০৬ জুন ২০২৪ , ২৬ জৈষ্ঠ্য ১৪৩১ ২৭ জিলক্বদ ১৪৪৫

হারিসুল হকের নির্বাচিত কবিতা

ওবায়েদ আকাশ

image

নিমগ্নতায় কী মেলে?

আত্মরতির পুড়ে যাওয়া ধূসর পোশাক

স্মৃতির বর্ণচোরা গিরগিটি ছানা

না নিরুদ্ধ প্রতীক্ষার বিবর্ণ কুসুম!

[বেড়ে ওঠো ইচ্ছের পুতুল]

কবি হারিসুল হকের নিমগ্নতা তাঁকে একজন সফল চিকিৎসকের পাশাপাশি কবি বানিয়েছেন। নিমগ্ন হলে যেমন স্মৃতি ফিরে আসে, মেলে প্রতীক্ষার বিবর্ণ কুসুম। আসলে কি তাই? কে নিমগ্ন হয়ে ফিরে পেতে চায় বিবর্ণ কুসুম। আমাদের আরাধ্য তো ভোরবেলার শিশিরসিক্ত সতেজ কুসুম। কিন্তু কবির চাওয়া আর সাধারণের চাওয়ায় তো স্বাতন্ত্র্য থাকবেই। কবি হয়তো সেই বিবর্ণ কুসুমেই রঙ ঢেলে তাকে সতেজ করে তুলতে পারবেন। শিল্পের কাজই তো অতীতকে সুন্দর করে জাগিয়ে ভবিষ্যৎকে ছুঁয়ে দেখা। যে কোনো বিবর্ণতাকে উজ্জ্বল করে প্রগাঢ় নন্দনবোধ জাগ্রত করা।

কবি হারিসুল হক আত্মনিমগ্ন হয়ে সেই কাজটি করেছেন এবং করে চলেছেন, যেখান থেকে আলো বিচ্ছুরিত হয়। আলো ঝলমলে রশ্মি ছড়িয়ে দিয়েছেন ২৪টি রেখায়। তাঁর এ যাবত প্রকাশিত চব্বিশটি কাব্যগ্রন্থ থেকে বাছাই করা কবিতা নিয়ে কবিতা সংক্রান্তি প্রকাশ করেছে হারিসুল হকের নির্বাচিত কবিতা।

৫২০ পৃষ্ঠার এ নির্বাচিত সংকলনটি দেখে বোঝার উপায় নেই এটি তাঁর নির্বাচিত কবিতার সংকলন, মনে হতে পারে কবিতাসংগ্রহ বা সমগ্র। কিন্তু এটি কবির স্বনির্বাচিত কবিতা সংকলন। হারিসুল হকের অধিকাংশ কবিতাই যে তাঁর নির্বাচিত সংকলনে ঠাঁই পাবার যোগ্য তার এই গ্রন্থটি থেকেও সেটা অনুমান করা যায়। তাছাড়া কবির নির্বাচন বলে বিষয়টা বিশেষভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।

হারিসুল হক গত শতকের আশির দশকের একজন শক্তিশালী কবি। তাঁর কবিতার শক্তিমত্তা তিনি নানাভাবে প্রমাণ করেছেন। তাঁর একটি স্বকীয় কণ্ঠস্বর তিনি খুঁজে পেয়েছেন। যাকে অন্য অনেকের সঙ্গে মেলানো যাবে না। তিনি আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতা ও মমনভুবনের নানা জটিল ও অনিবার্য অনুষঙ্গকে তাঁর কবিতায় তুলে ধরেন। তাঁর উপস্থাপনা রীতি ও শব্দ নির্বাচনে তিনি কোনো জটিলতার আশ্রয় না নিয়ে পাঠকের প্রতি নিজেকে দায়বদ্ধ রেখেছেন। তিনি শিল্পকে শুধুই নান্দনিকতার আশ্রয়ে বিকশিত দেখতে চেয়েছেন। অকারণ দুর্বোধ্যতা কিংবা পাঠকের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা তাঁর কবিতায় খুঁজে পাওয়া যাবে না।

তাঁর কিছু কাব্যগ্রন্থের নাম : ফিরে চাও পবিত্র পাখি, জলের পুতুল, হে প্রিয় বিনষ্টি আমার, দুরন্ত ঘুণ জীবনের মাঝে, মতিচ্ছন্ন চাবির ঠিকুজি, ছায়ামাছ, মেতেছি বধির রাতে, সময়ের বিশিষ্ট পেরেক প্রভৃতি। গ্রন্থগুলোর নামকরণের ক্ষেত্রেও তিনি স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলোও পাঠককে ভাবিত করে। পাঠক নতুন কিছুর সন্ধান পেয়ে যান।

হারিসুল হক পাঠকপ্রিয় কবি। কিন্তু স্বভাবে তিনি অন্তর্মুখী। শিল্পের নিজস্ব এলাকায় নিমগ্ন সময় কাটাতে পছন্দ করেন। আবার প্রায়শ তাঁকে দেখা যায় হৈহল্লা করে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠতে। তাঁর কবিতা তাই নির্জনতাপ্রিয় পাঠকের বিশুদ্ধ কবিতা।

তুমি বুঝি স্মৃতিচ্ছন্ন মৌনপ্রজাপতি ভদ্রসভাতে

মেলেছি অন্ধ পাখা বোধশূন্য অবাক আকাশে

[ভুলেছি অনতীত গান, পৃ: ৫৯]

এখানে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত উপস্থিতি তুলে ধরেছেন। তিনি মৌন প্রজাপতির মতো ভদ্রসভাতে নিজেকে খুঁজে পান। উড়ে যান বোধশূন্য অবাক আকাশে। কিন্তু আকাশ তাতে আলোড়িত হয়। সঙ্গীত রচনা করে বাতাসের পাখায়।

একটি প্রসন্ন জবার সঙ্গেই আমার যত বিরোধ

আর কোনো প্রতিপক্ষ নেই আপাতত

...

নিয়ত যুদ্ধরত যে তার কোনো আশ্রয় থাকে না

বিরুদ্ধ বাতাসে ঢেউ ক্রমশই কাবু হতে থাকে

[বিরোধ প্রসন্ন জবার সাথে, পৃ: ১১৬]

কবির কোনো প্রতিপক্ষ নেই। আবার সততা ও কমিটমেন্ট ছাড়া কবির কোনো বন্ধুও থাকে না। কবি অসততা ও অপশাসনের শত্রু। তিনি নিয়ত যুদ্ধ করে চলেন। সেই যুদ্ধ একসময় বিরুদ্ধ বাতাসের মুখোমুখি হয়।

কিন্তু কবির যুদ্ধ কখনো থামে না। তিনি আমৃত্যু সংগ্রামী- মানুষ ও সুন্দরের পাশে।

ফাটুক দাড়িম্ব পাকা সুবিনীত লালাভ লাভায়

নামুক নামুক বৃষ্টি গ্রীবা ছেপে চঞ্চল বেলায়

আমার স্পর্ধায় ঠোঁট জেগে থাক অন্তহীন তোমার সীমায়

[শেষ হবে না, পৃ: ৪৩১]

এখানে হারিসুল হকের কবিতার উপস্থাপনের ভিন্নতা ও চিত্রকল্পের স্বাতন্ত্র্য চোখে পড়ে। তাঁর উচ্চারণ ও বিন্যাস, মেটাফর ও দৃশ্যকল্পকে তিনি তাঁর নিজের মতো করে উপস্থাপন করেন। যে কারণে তাঁর কবিতা পাঠের জন্য আমাদের হৃদয় ব্যাকুল হয়। পাঠক অপেক্ষা করেন এরপর হারিসুল হকের কোন কাব্যগ্রন্থটি আসছে।

কবি হারিসুল হক এসময়ের উল্লেখযোগ্য কবি। তিনি যতটা সম্ভব শিল্পকে, কবিতাকে তাঁর হৃদয়ে গেঁথে নিয়েছেন। তাই তাঁর পেশাগত জীবনে তিনি যতই ব্যস্ত থাকুন না কেন, বারবার তাঁর সাক্ষাৎ মেলে কবিতার উদ্যানেই। তাঁর নির্বাচিত কবিতা পাঠকপ্রিয়তা পাবে- এ আশা অমূলক নয়।