অব্যক্ত

সৈয়দ আইরিন জামান

স্কুল ছুটি হয়ে গেছে ১৫ মিনিট আগে। আমার ব্যক্তিগত বিশেষজ্ঞ শিক্ষক ডেভিড লুইস আমায় ইশারায় বুঝিয়ে দিয়েছে মায়ের আজ আসতে দেরি হবে। আমি বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা না হওয়া পর্যন্ত লুইস যেতে পারবে না-এটাই নিয়ম। মা এলেন একজন ভদ্রমহিলাকে সঙ্গে করে। আমি তাঁকে দেখে সামান্য পুলকিত হলাম। একটা আবছা স্মৃতি উঁকিঝুঁকি মেরে হারিয়ে গেল। চেষ্টা করেও আর খুঁজে পেলাম না। মা বললেন, ‘তোমার চাচি বেড়াতে এসেছেন। খুুশি হয়েছো?’ মায়ের অভিব্যক্তি দেখে আমি বুঝে যাই, মা কী বলছেন। ভাঙা ভাঙা কিছু শব্দ আমার কানে আসে। সেসব শব্দ যে বাক্য তৈরি করে তা বোঝার চেষ্টা করতে গেলেই আমার বোধের ভেতরে যে ব্যথা অনুভব করি তাতে কুঁকড়ে যাই। অজস্ত্র হিং¯্র জানোয়ার, বিষধর সাপ, চিতা বাঘ, ক্ষুধার্ত সিংহ, হায়েনা প্রবেশ করে আমার বোধের মধ্যে। তাই আগে বোঝার চেষ্টা করতাম। এখন আর করি না। এরা আমার সমস্ত অনুভূতিকে টেনেহিঁচড়ে আছড়ে ছিলে ফেলে দেয়। আমার শরীরটা ত্যানার মতো পড়ে থাকে।

স্কুলটি আমার ভীষণ পছন্দের একটি স্থানে অবস্থিত। বাংলাদেশের গ্রামের সঙ্গে কোথায় যেন মিল। আশেপাশে জনবসতি নেই বললেই চলে। স্কুলে ঢুকবার রাস্তাটিও খুব সাধারণ। খুব উন্নত দেশের রাস্তা-ঘাট সাধারণত এতো সাদামাটা হয় না। টুসির কেন যেন মনে হয়- মনোবিজ্ঞানীরা ইচ্ছে করেই স্কুলের পুরো আবহটি খুব সাধারণ রেখেছে। যাতে চাকচিক্য অসুস্থ শিশুদের ওপর অধিক মানসিক চাপ তৈরি করতে না পারে। এই পরিবেশটি কখনও কখনও তার মনে দোলনায় দোল খাওয়ার মতো হালকা একটা পরশ বুলিয়ে দেয়।

মায়ের সঙ্গে আসা ভদ্র মহিলা আমায় কাছে টেনে আদর করলেন। একটা চেনা স্পর্শ আমি উনার থেকে পেলাম কিন্তু এর চেয়ে বেশি কিছু চিন্তা করার ক্ষমতা আমার নেই। আমি নিজে ঠিকমত হাঁটতে পারি না। বাবা ড্রাইভিং সিটে বসলেন। মা আমায় টেনে জীপে তুললেন। এরপর প্রতিদিনের মতো পরম যতেœ আমার কেডস খুলে দিলেন। আমি মায়ের কাঁধে মাথা রাখলাম। আজ ৭ বছর ধরে আমি কথা বলতে পারি না। আমি মরেও বেঁচে আছি। দৈনন্দিন সব কাজের জন্য আমাকে অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। অন্য সব দিনের মতো সেই ভয়াল দিনটিও শুরু হয়েছিলো স্বাভাবিকভাবে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর বোঝা গেল সামান্য একটু জ্বর হয়েছে আমার। থার্মোমিটারের পরিমাপে সেটি আমলে নেবার যোগ্য নয়, তাই আমি স্কুলে গেলাম। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার জ্বর বাড়তে শুরু করলো। জ্বর বেশি হলে অন্য সময় আমি যেমন অস্বস্তিবোধ করতাম, তার চেয়ে আলাদা কিছু অনুভব করছিলাম। স্কুল থেকে ঐ দিন মাকে কল করা হল-আমাকে যেন দেরি না করে বাড়িতে নেয়া হয়। বাবা-মা সঙ্গে সঙ্গে আমাকে বাড়িতে নিয়ে এলেন। অন্য খাবার আমি খেতে চাইনি বলে মা মাথা ধুইয়ে, শরীর মুছিয়ে আমায় আপেল জুস পান করালেন।

তখন আমার বয়স ৮ বছর। কার্টুন দেখার প্রবল নেশা ছিলো-বাচ্চাদের যেমন থাকে। আমরা যে বাড়িটিতে থাকি সেটি বেশ বড় দোতলা বাড়ি। বাড়ির সামনে-পেছনে প্রচুর জায়গা, সবুজ ঘাস, ফুল এবং ফলের বাগান, সুইমিং পুল-সবই রয়েছে। আমার বাবা বাড়িটি কিনেছিলেন- আমি যেন নির্বিঘেœ মনের আনন্দে খেলতে পারি এই জন্য। ঢাকায় আমাদের নিজেদের বাড়ি ছিলো না; তবে বিশাল একটি ফ্ল্যাট আছে। আমরা এখনও বছরে দুবার ঢাকায় যাই। রোজার সময়টা আমার বাবা বাংলাদেশে থাকতেই পছন্দ করেন। আমাদের বাড়িতে ইফতার পার্টি থাকে। বেশ আনন্দ হয়, আমার ভালো লাগে। আর যাওয়া হয় ডিসেম্বর মাসে তীব্র শীত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য। আমরা কানাডার মন্ট্রিঅলে বসবাসের জন্য আসি। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরে দেখলাম ঢাকার স্কুলের মতো এখানে স্কুল ড্রেস পরতে হয় না। ক্লাসে ইংরেজিতে লেখাপড়া চলতো কিন্তু ক্লাসের বাইরে শিক্ষকেরা ফ্রেঞ্চ ভাষায় কথা বলতেন। এমনকী আমার সহপাঠিরাও ফ্রেঞ্চ-এ কথা বলতো। সকলের থেকে শুনে আমি ফ্রেঞ্চ কিছু ছোট ছোট বাক্য এবং শব্দ শিখেছি। স্কুল লাইব্রেরিতে ইংরেজি বই-এর থেকে ফ্রেঞ্চ ল্যাংগুয়েজের বই-ই বেশি। মজা পেয়েছিলাম ফ্রেঞ্চ শব্দের জেন্ডার সম্পর্কে জেনে, যেখানে জেন্ডার কোনো যুক্তি অনুসরণ করে না। বাংলার মতো চারটি জেন্ডার ফ্রেঞ্চ ভাষায় নেই। দুটি জেন্ডার পুঃলিঙ্গ এবং স্ত্রী লিঙ্গ। যেমন: খধ চড়ৎঃব (লা পোর্ট) অর্থ-দরজা, স্ত্রী লিঙ্গ; খব ঈধহধঢ়ব (লু ক্যানাপে), অর্থ-সোফা, পুঃ লিঙ্গ।

আমার একজন বন্ধু ছিলো ভারতীয় আদিবাসি। বংশ পরম্পরায় কানাডায় তাদের বসবাস। হঠাৎ করেই সপ্তাহ খানেক সে স্কুলে আসেনি। যখন এল নিদারুণ বিষণœতা তাকে ঘিরে ছিলো- কেমন একটা অনিশ্চয়তা তার ছোট শরীরকে পেঁচিয়ে ধরেছিলো। বার বার প্রশ্ন করার পর জানতে পারলাম: তার ১৭ বছর বয়সের বড় ভাই হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা করেছে। এর মূল কারণ ক্যানেডিয়ানরা আদিবাসিদের সম্পত্তি আত্মসাৎ করে তাদেরকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে আদিবাসিরা ক্যানাডিয়ানদের মূল ¯্রােতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না, ফলে আদিবাসিদের টিনএজ ছেলেরা হতাশায় ভুগছে এবং আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হচ্ছে।

‘টুসি মামণি বসে টিভি না দেখে সোফায় শুয়ে দেখ।’ মা বললেন। আমার শুতে ভালো লাগছিলো না। মা তাঁর কাজে নিচ তলায় চলে গেলেন। কিচেন, ডাইনিং, ড্রয়িং সবই নিচে। ব্যাক ইয়ার্ডে আমাদের সবজি বাগানে শিম, বরবরটি, লালশাক, বেগুন ইত্যাদির পরিচর্যা করেন মা। মায়ের নেমে যাবার গতি দেখে আমার মনে হলো- মা সবজিক্ষেতের দিকেই যাচ্ছেন। হঠাৎ করেই আমি আমার বোধের ভেতরে উথাল-পাথাল অস্থিরতা অনুভব করলাম। ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই কয়েক লক্ষ বিষধর সাপ, হায়েনা, চিতাবাঘ আমার সমস্ত শরীর বেয়ে মাথার দিকে অগ্রসর হলো। বীভৎস উৎসবে মেতে উঠে তারা আমার রূপকথাময় শৈশব ল-ভ- করে দিলো। আমি চিৎকার করতে গিয়েও পারলাম না। ততক্ষণে ওরা আমার টুঁটি চেপে ধরেছে।

হাসপাতাল থেকে ফিরে আসার পরে শুনেছি- মা এসে দেখলেন: টিভি চলছে অথচ আমি অন্য দিকে তাকিয়ে আছি। কথা বলতে পারছি না। মুখ দিয়ে লালা ঝরছে এবং জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে। হাসপাতালে নেয়া হলো আমাকে। আমি বাঁচবো- এমন আশা চিকিৎসকদের ছিলো না। অন্তত সাত দিন মৃত্যুর সঙ্গে বোঝাপড়া করে আমার জ্ঞান ফিরে এলো। নিঃসীম শূন্যতা এবং নীরবতা ভেঙে হঠাৎ আমি পৃথিবীর কোলাহল শুনতে পেলাম। জ্ঞান ফিরেছে আমার! ডক্টরের অনুমতি নিয়ে মা-বাবা ছুটে এলেন। আমি আকুল হয়ে মাকে ডাকতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, আমার মুখ দিয়ে স্বর বের হচ্ছে না। যেন ভূমিকম্প, সুনামি, বজ্রপাত এবং জলশ্বাস আমাকে এক সঙ্গে গ্রাস করেছে। আমি হাজার বার চেষ্টা করেও কথা বলতে পারলাম না। অসীম বেদনায় কুঁকড়ে গেলাম। মা ডুকরে কেঁদে উঠলেন। বাবা পাথর চাপা কষ্ট নিজের মধ্যেই লুকিয়ে রাখলেন।

আমার মস্তিস্কে জীবাণু সংক্রমণ ঘটেছিলো। জীবাণুদল দ্বারা মাথার বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভীষণভাবে। কথা বলতে পারি না। মুখ দিয়ে খেতে পারি না। ঠিকমত হাঁটতে পারি না। কেবল ভাঙা ভাঙা কথা শুনতে পাই- মনে হয় যেন কথার প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। সেই কথার অর্থ কখনও বুঝি-কখনও বুঝি না। প্রায় দুমাস আমাকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং পরিচর্যাকারীদের সঙ্গে থাকতে হলো। মা-বাবা প্রতিদিন দুবেলা এসে আমাকে দেখে যান। হাসপাতাল থেকে মা-বাবাকে জানানো হলো, উনারা ইচ্ছে করলে আমায় সরকার পরিচালিত হোমে দিয়ে দিতে পারেন। এখানকার প্যারেন্টস্ সাধারণত হোমে দিয়ে দেন। মা আমাকে বাড়িতে নিয়ে এলেন।

এই জীবন্মৃত অবস্থা আমার মা-বাবাকে ভীষণ বিপর্যস্ত করে তুলেছিলো। এক কথায়

তাঁদের সুখের সংসার তছনছ হয়ে গেলো। মায়ের যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখের দিকে তাকিয়ে আমার চোখে ঝরনা নামে- তা দেখে মা ভাবেন-আমার শরীরে কোথাও কষ্ট হচ্ছে। তিনি আমার কষ্ট লাঘব করার জন্য ছটফট করেন। তাই দেখে আমি আর কাঁদি না।

একজন মেট দিনের বেলা আমার দেখাশোনা করেন। তিনি ফিলিপাইনের নাগরিক। তিনি তিন বছরের ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে কানাডায় এসেছেন। মূলত স্কুল থেকে ফেরার পরে মাথুয়া আমার দেখাশোনা করেন। আজকের দিনটি ভালো লাগছে। মা-বাবা ফ্যামিলি লাউঞ্জে বসে গল্প করছেন। চাচি আমার জন্য ফোর কালারের শিশুতোষ বই এনেছেন। আমাকে ছবিগুলো দেখালেন-কিছু অংশ পড়ে শোনালেন। আমার চোখে-মুখে খুশির আভা। একটা খুশি খুশি আমেজের চারিপাশ আমার ভালো লাগে। আমার ঘুমানোর সময় হয়েছে। মাথুয়া আমায় ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে। এ সময় আমি সামান্য কিছু স্মৃতি ফিরে পাই। চাচিকে মনে পড়েছে। আমার বয়স তখন পাঁচ বছর হবে। আমার বয়সী চাচির একটি ছেলে আছে। ওকে নিয়ে চাচা-চাচি আমাদের বাড়ি এসেছিলেন। আমাদের বাড়িতে রাতে একটি ডিনার পার্টি ছিলো। আমার খেলার ঘরে টেন্টের ভেতরে আমরা খেলেছিলাম।

মা আর চাচির আলাপ আমি শুনতে পাচ্ছি যার নব্বই ভাগ আমাকে কেন্দ্র করে। মা বলছেন, ‘ভাবি, এমন কোনো দৈব ঘটনা কি ঘটতে পারে না, যেন টুসি আবার স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেতে পারে!’

বৃহস্পতিবার, ০৬ জুন ২০২৪ , ২৬ জৈষ্ঠ্য ১৪৩১ ২৭ জিলক্বদ ১৪৪৫

অব্যক্ত

সৈয়দ আইরিন জামান

image

স্কুল ছুটি হয়ে গেছে ১৫ মিনিট আগে। আমার ব্যক্তিগত বিশেষজ্ঞ শিক্ষক ডেভিড লুইস আমায় ইশারায় বুঝিয়ে দিয়েছে মায়ের আজ আসতে দেরি হবে। আমি বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা না হওয়া পর্যন্ত লুইস যেতে পারবে না-এটাই নিয়ম। মা এলেন একজন ভদ্রমহিলাকে সঙ্গে করে। আমি তাঁকে দেখে সামান্য পুলকিত হলাম। একটা আবছা স্মৃতি উঁকিঝুঁকি মেরে হারিয়ে গেল। চেষ্টা করেও আর খুঁজে পেলাম না। মা বললেন, ‘তোমার চাচি বেড়াতে এসেছেন। খুুশি হয়েছো?’ মায়ের অভিব্যক্তি দেখে আমি বুঝে যাই, মা কী বলছেন। ভাঙা ভাঙা কিছু শব্দ আমার কানে আসে। সেসব শব্দ যে বাক্য তৈরি করে তা বোঝার চেষ্টা করতে গেলেই আমার বোধের ভেতরে যে ব্যথা অনুভব করি তাতে কুঁকড়ে যাই। অজস্ত্র হিং¯্র জানোয়ার, বিষধর সাপ, চিতা বাঘ, ক্ষুধার্ত সিংহ, হায়েনা প্রবেশ করে আমার বোধের মধ্যে। তাই আগে বোঝার চেষ্টা করতাম। এখন আর করি না। এরা আমার সমস্ত অনুভূতিকে টেনেহিঁচড়ে আছড়ে ছিলে ফেলে দেয়। আমার শরীরটা ত্যানার মতো পড়ে থাকে।

স্কুলটি আমার ভীষণ পছন্দের একটি স্থানে অবস্থিত। বাংলাদেশের গ্রামের সঙ্গে কোথায় যেন মিল। আশেপাশে জনবসতি নেই বললেই চলে। স্কুলে ঢুকবার রাস্তাটিও খুব সাধারণ। খুব উন্নত দেশের রাস্তা-ঘাট সাধারণত এতো সাদামাটা হয় না। টুসির কেন যেন মনে হয়- মনোবিজ্ঞানীরা ইচ্ছে করেই স্কুলের পুরো আবহটি খুব সাধারণ রেখেছে। যাতে চাকচিক্য অসুস্থ শিশুদের ওপর অধিক মানসিক চাপ তৈরি করতে না পারে। এই পরিবেশটি কখনও কখনও তার মনে দোলনায় দোল খাওয়ার মতো হালকা একটা পরশ বুলিয়ে দেয়।

মায়ের সঙ্গে আসা ভদ্র মহিলা আমায় কাছে টেনে আদর করলেন। একটা চেনা স্পর্শ আমি উনার থেকে পেলাম কিন্তু এর চেয়ে বেশি কিছু চিন্তা করার ক্ষমতা আমার নেই। আমি নিজে ঠিকমত হাঁটতে পারি না। বাবা ড্রাইভিং সিটে বসলেন। মা আমায় টেনে জীপে তুললেন। এরপর প্রতিদিনের মতো পরম যতেœ আমার কেডস খুলে দিলেন। আমি মায়ের কাঁধে মাথা রাখলাম। আজ ৭ বছর ধরে আমি কথা বলতে পারি না। আমি মরেও বেঁচে আছি। দৈনন্দিন সব কাজের জন্য আমাকে অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। অন্য সব দিনের মতো সেই ভয়াল দিনটিও শুরু হয়েছিলো স্বাভাবিকভাবে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর বোঝা গেল সামান্য একটু জ্বর হয়েছে আমার। থার্মোমিটারের পরিমাপে সেটি আমলে নেবার যোগ্য নয়, তাই আমি স্কুলে গেলাম। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার জ্বর বাড়তে শুরু করলো। জ্বর বেশি হলে অন্য সময় আমি যেমন অস্বস্তিবোধ করতাম, তার চেয়ে আলাদা কিছু অনুভব করছিলাম। স্কুল থেকে ঐ দিন মাকে কল করা হল-আমাকে যেন দেরি না করে বাড়িতে নেয়া হয়। বাবা-মা সঙ্গে সঙ্গে আমাকে বাড়িতে নিয়ে এলেন। অন্য খাবার আমি খেতে চাইনি বলে মা মাথা ধুইয়ে, শরীর মুছিয়ে আমায় আপেল জুস পান করালেন।

তখন আমার বয়স ৮ বছর। কার্টুন দেখার প্রবল নেশা ছিলো-বাচ্চাদের যেমন থাকে। আমরা যে বাড়িটিতে থাকি সেটি বেশ বড় দোতলা বাড়ি। বাড়ির সামনে-পেছনে প্রচুর জায়গা, সবুজ ঘাস, ফুল এবং ফলের বাগান, সুইমিং পুল-সবই রয়েছে। আমার বাবা বাড়িটি কিনেছিলেন- আমি যেন নির্বিঘেœ মনের আনন্দে খেলতে পারি এই জন্য। ঢাকায় আমাদের নিজেদের বাড়ি ছিলো না; তবে বিশাল একটি ফ্ল্যাট আছে। আমরা এখনও বছরে দুবার ঢাকায় যাই। রোজার সময়টা আমার বাবা বাংলাদেশে থাকতেই পছন্দ করেন। আমাদের বাড়িতে ইফতার পার্টি থাকে। বেশ আনন্দ হয়, আমার ভালো লাগে। আর যাওয়া হয় ডিসেম্বর মাসে তীব্র শীত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য। আমরা কানাডার মন্ট্রিঅলে বসবাসের জন্য আসি। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরে দেখলাম ঢাকার স্কুলের মতো এখানে স্কুল ড্রেস পরতে হয় না। ক্লাসে ইংরেজিতে লেখাপড়া চলতো কিন্তু ক্লাসের বাইরে শিক্ষকেরা ফ্রেঞ্চ ভাষায় কথা বলতেন। এমনকী আমার সহপাঠিরাও ফ্রেঞ্চ-এ কথা বলতো। সকলের থেকে শুনে আমি ফ্রেঞ্চ কিছু ছোট ছোট বাক্য এবং শব্দ শিখেছি। স্কুল লাইব্রেরিতে ইংরেজি বই-এর থেকে ফ্রেঞ্চ ল্যাংগুয়েজের বই-ই বেশি। মজা পেয়েছিলাম ফ্রেঞ্চ শব্দের জেন্ডার সম্পর্কে জেনে, যেখানে জেন্ডার কোনো যুক্তি অনুসরণ করে না। বাংলার মতো চারটি জেন্ডার ফ্রেঞ্চ ভাষায় নেই। দুটি জেন্ডার পুঃলিঙ্গ এবং স্ত্রী লিঙ্গ। যেমন: খধ চড়ৎঃব (লা পোর্ট) অর্থ-দরজা, স্ত্রী লিঙ্গ; খব ঈধহধঢ়ব (লু ক্যানাপে), অর্থ-সোফা, পুঃ লিঙ্গ।

আমার একজন বন্ধু ছিলো ভারতীয় আদিবাসি। বংশ পরম্পরায় কানাডায় তাদের বসবাস। হঠাৎ করেই সপ্তাহ খানেক সে স্কুলে আসেনি। যখন এল নিদারুণ বিষণœতা তাকে ঘিরে ছিলো- কেমন একটা অনিশ্চয়তা তার ছোট শরীরকে পেঁচিয়ে ধরেছিলো। বার বার প্রশ্ন করার পর জানতে পারলাম: তার ১৭ বছর বয়সের বড় ভাই হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা করেছে। এর মূল কারণ ক্যানেডিয়ানরা আদিবাসিদের সম্পত্তি আত্মসাৎ করে তাদেরকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে আদিবাসিরা ক্যানাডিয়ানদের মূল ¯্রােতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না, ফলে আদিবাসিদের টিনএজ ছেলেরা হতাশায় ভুগছে এবং আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হচ্ছে।

‘টুসি মামণি বসে টিভি না দেখে সোফায় শুয়ে দেখ।’ মা বললেন। আমার শুতে ভালো লাগছিলো না। মা তাঁর কাজে নিচ তলায় চলে গেলেন। কিচেন, ডাইনিং, ড্রয়িং সবই নিচে। ব্যাক ইয়ার্ডে আমাদের সবজি বাগানে শিম, বরবরটি, লালশাক, বেগুন ইত্যাদির পরিচর্যা করেন মা। মায়ের নেমে যাবার গতি দেখে আমার মনে হলো- মা সবজিক্ষেতের দিকেই যাচ্ছেন। হঠাৎ করেই আমি আমার বোধের ভেতরে উথাল-পাথাল অস্থিরতা অনুভব করলাম। ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই কয়েক লক্ষ বিষধর সাপ, হায়েনা, চিতাবাঘ আমার সমস্ত শরীর বেয়ে মাথার দিকে অগ্রসর হলো। বীভৎস উৎসবে মেতে উঠে তারা আমার রূপকথাময় শৈশব ল-ভ- করে দিলো। আমি চিৎকার করতে গিয়েও পারলাম না। ততক্ষণে ওরা আমার টুঁটি চেপে ধরেছে।

হাসপাতাল থেকে ফিরে আসার পরে শুনেছি- মা এসে দেখলেন: টিভি চলছে অথচ আমি অন্য দিকে তাকিয়ে আছি। কথা বলতে পারছি না। মুখ দিয়ে লালা ঝরছে এবং জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে। হাসপাতালে নেয়া হলো আমাকে। আমি বাঁচবো- এমন আশা চিকিৎসকদের ছিলো না। অন্তত সাত দিন মৃত্যুর সঙ্গে বোঝাপড়া করে আমার জ্ঞান ফিরে এলো। নিঃসীম শূন্যতা এবং নীরবতা ভেঙে হঠাৎ আমি পৃথিবীর কোলাহল শুনতে পেলাম। জ্ঞান ফিরেছে আমার! ডক্টরের অনুমতি নিয়ে মা-বাবা ছুটে এলেন। আমি আকুল হয়ে মাকে ডাকতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, আমার মুখ দিয়ে স্বর বের হচ্ছে না। যেন ভূমিকম্প, সুনামি, বজ্রপাত এবং জলশ্বাস আমাকে এক সঙ্গে গ্রাস করেছে। আমি হাজার বার চেষ্টা করেও কথা বলতে পারলাম না। অসীম বেদনায় কুঁকড়ে গেলাম। মা ডুকরে কেঁদে উঠলেন। বাবা পাথর চাপা কষ্ট নিজের মধ্যেই লুকিয়ে রাখলেন।

আমার মস্তিস্কে জীবাণু সংক্রমণ ঘটেছিলো। জীবাণুদল দ্বারা মাথার বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভীষণভাবে। কথা বলতে পারি না। মুখ দিয়ে খেতে পারি না। ঠিকমত হাঁটতে পারি না। কেবল ভাঙা ভাঙা কথা শুনতে পাই- মনে হয় যেন কথার প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। সেই কথার অর্থ কখনও বুঝি-কখনও বুঝি না। প্রায় দুমাস আমাকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং পরিচর্যাকারীদের সঙ্গে থাকতে হলো। মা-বাবা প্রতিদিন দুবেলা এসে আমাকে দেখে যান। হাসপাতাল থেকে মা-বাবাকে জানানো হলো, উনারা ইচ্ছে করলে আমায় সরকার পরিচালিত হোমে দিয়ে দিতে পারেন। এখানকার প্যারেন্টস্ সাধারণত হোমে দিয়ে দেন। মা আমাকে বাড়িতে নিয়ে এলেন।

এই জীবন্মৃত অবস্থা আমার মা-বাবাকে ভীষণ বিপর্যস্ত করে তুলেছিলো। এক কথায়

তাঁদের সুখের সংসার তছনছ হয়ে গেলো। মায়ের যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখের দিকে তাকিয়ে আমার চোখে ঝরনা নামে- তা দেখে মা ভাবেন-আমার শরীরে কোথাও কষ্ট হচ্ছে। তিনি আমার কষ্ট লাঘব করার জন্য ছটফট করেন। তাই দেখে আমি আর কাঁদি না।

একজন মেট দিনের বেলা আমার দেখাশোনা করেন। তিনি ফিলিপাইনের নাগরিক। তিনি তিন বছরের ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে কানাডায় এসেছেন। মূলত স্কুল থেকে ফেরার পরে মাথুয়া আমার দেখাশোনা করেন। আজকের দিনটি ভালো লাগছে। মা-বাবা ফ্যামিলি লাউঞ্জে বসে গল্প করছেন। চাচি আমার জন্য ফোর কালারের শিশুতোষ বই এনেছেন। আমাকে ছবিগুলো দেখালেন-কিছু অংশ পড়ে শোনালেন। আমার চোখে-মুখে খুশির আভা। একটা খুশি খুশি আমেজের চারিপাশ আমার ভালো লাগে। আমার ঘুমানোর সময় হয়েছে। মাথুয়া আমায় ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে। এ সময় আমি সামান্য কিছু স্মৃতি ফিরে পাই। চাচিকে মনে পড়েছে। আমার বয়স তখন পাঁচ বছর হবে। আমার বয়সী চাচির একটি ছেলে আছে। ওকে নিয়ে চাচা-চাচি আমাদের বাড়ি এসেছিলেন। আমাদের বাড়িতে রাতে একটি ডিনার পার্টি ছিলো। আমার খেলার ঘরে টেন্টের ভেতরে আমরা খেলেছিলাম।

মা আর চাচির আলাপ আমি শুনতে পাচ্ছি যার নব্বই ভাগ আমাকে কেন্দ্র করে। মা বলছেন, ‘ভাবি, এমন কোনো দৈব ঘটনা কি ঘটতে পারে না, যেন টুসি আবার স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেতে পারে!’