দেশ ‘অনৈতিক’ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে ‘যাচ্ছে’

‘অনিয়ম, দুর্নীতির’ কারণে সরকারি ব্যয়ে ‘প্রচুর অপচয়’ হচ্ছে, দেশ থেকে ‘পুঁজি পাচার’ হচ্ছে, ব্যাংক খাত ‘বিশৃঙ্খল’ অবস্থায়, বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় বাড়ছে, অবাধে কালো টাকার সঞ্চালন হচ্ছে। দেশ একটি ‘নৈতিকতাহীন’ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে ঢুকে পড়েছে।

গতকাল এক অনুষ্ঠানে দেশের চারজন অর্থনীতিবিদ, একজন সাবেক গভর্নর, সাবেক অর্থ সচিব এবং একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এমন মন্তব্য করেছেন।

গতকাল সম্পাদক পরিষদ ও সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) যৌথভাবে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করে। রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ‘অর্থনীতির চালচিত্র ও প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৪-২৫’ শীর্ষক এ আলোচনায় অংশ নেন বিশিষ্টজনরা।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর, সাবেক অর্থ সচিব ও সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। স্বাগত বক্তব্য দেন নোয়াবের সভাপতি এ কে আজাদ এমপি। সমাপনী বক্তব্য দেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি মাহফুজ আনাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘বিভিন্ন অনুগত স্বার্থগোষ্ঠীকে ব্যাংক থেকে অন্যায় সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছে, যার সঙ্গে ক্ষমতার রাজনীতি সম্পৃক্ত। পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে হলে আর্থিক খাতসহ কিছু সংবেদনশীল খাতকে ক্ষমতার রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে হবে।’

সময়মতো পদক্ষেপ না নেয়ার কারণে মূল্যস্ফীতি গেঁড়ে বসেছে জানিয়ে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকে ভুল নীতির কারণে মৌলিক অনেকগুলো দুর্বলতা সামনে এসেছে। সঠিক নীতির অভাবে অর্থ পাচার, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, রিজার্ভের ধারাবাহিক পতন, রাজস্ব আয় হ্রাস, কালো টাকা তৈরি হচ্ছে। মৌলিক নীতিগত পরিবর্তন না আনলে এসব সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।’

তিনি বলেন, ‘দেশ একটি নৈতিকতাহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে ঢুকে পড়েছে এবারের বাজেটে স্মার্ট বাংলাদেশের কথা বলা হয়েছে। তবে স্মার্ট মানুষ যদি নীতিহীন হয় তা আরও ভয়ঙ্কর হতে পারে। ’

তিনি বলেন, ‘বাজেট ঘাটতি পূরণ করতে আমরা দেশ এবং বিদেশ থেকে উচ্চ সুদে একের পর এক ঋণ নিয়েই চলেছি। ঋণের ওপর নির্ভর করে এভাবে অর্থনীতি চলতে থাকলে একসময় দেউলিয়া না হলেও বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়বে। এই মুহূর্তে আমাদের অর্থনীতির সবগুলো সূচক খারাপ। যতদিন সূচকগুলো ভালো ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ছিল, রেমিট্যান্স ভালো ছিল, রিজার্ভের অবস্থাও ভালো ছিল, তখন অর্থনৈতিক ত্রুটি হজম করার শক্তিও ছিল।’

২০২৪-২৫ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়নি, যদিও দেশে অনেক দিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। এটা বিবেচনাপ্রসূত হয়নি বলে মনে করেন ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘কর নীতি দেখে মনে হয়, বাঘের হরিণ শিকার করার নীতিতে চলছে রাজস্ব ব্যবস্থা। অর্থাৎ ছোট ও ক্ষমতাহীনদের চাপে রাখা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতিতে নৈতিকতা নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার।’

আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘সুদহারের নয়-ছয়ের (ঋণের সুদ ৯ শতাংশ ও আমানতের সুদ ৬ শতাংশ) বেড়াজাল দিয়ে আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা আমরা নিজেরাই সৃষ্টি করেছি। সমস্যা এক দিনে তৈরি হয়নি, তাই সমাধানও একদিনে হবে না। গত বছরের তুলনায় এ বাজেট সংকোচনমুখী হয়েছে। এখন সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি মেনে চললে এবং সুদহার বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে মূল্যস্ফীতি কমবে।’

আহসান মনসুর বলেন, ‘তারপরও জিনিসপত্রের দাম কমবে না, তবে মূল্যবৃদ্ধির হার কমবে।’

বাজেটে কিছু অসঙ্গতি আছে জানিয়ে আহসান মনসুর বলেন, ‘বলা হচ্ছে, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। ব্যাংক খাত এত দুর্বল যে আমানতের প্রবৃদ্ধি ভালো নয়। আমানতের প্রবৃদ্ধির মোট পরিমাণ ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি হবে না। সেখান থেকে সরকারই যদি ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেয়, তাহলে আর কী থাকবে। অর্থনীতিতে ব্যক্তি খাতের আকার ৮৬ শতাংশ; ১৪ শতাংশ সরকারি। আমাদের হিসাবে ৭৬ শতাংশ ঋণ নিচ্ছে সরকার, তাহলে ব্যক্তি খাত ঋণ পাচ্ছে ২৪ শতাংশ । বড় অসঙ্গতি এখানেই, এটা হতে পারে না।’

বিদ্যুৎ খাতকে সরকার যথেষ্ট সুযোগ দিয়েছে বলে মনে করেন আহসান মনসুর। আর বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বা দামও অনেক বেশি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিদ্যমান ক্যাপাসিটি চার্জ ও ভর্তুকি বজায় রেখে বেশি দূর এগোনো যাবে না। ভারতের আদানি গ্রুপ হোক বা দেশের সামিট গ্রুপ বা ওরিয়ন গ্রুপই হোক, আমি মনে করি, এদের সঙ্গে পুনরায় দর-কষাকষি (রিনেগোশিয়েট) করতে হবে। এভাবে ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব।’

বাংলাদেশে এত মন্ত্রণালয় থাকা উচিত নয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দরকার আছে কি? আমার তা মনে হয় না। সরকার যদি একটু নির্মোহভাবে চিন্তা করে, দেশে এত মন্ত্রণালয় থাকার দরকার নেই। যুক্তরাষ্ট্রে ১১টি মন্ত্রণালয়, অথচ আমাদের এখানে ৫০ থেকে ৬০টি।’

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী বাজেট প্রণয়নে আমলা, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) আর প্রভাবশালী অলিগার্কদের কথা শুনেছেন। আমলারা তাদের সুযোগ-সুবিধা ঠিক রেখেই বাজেট প্রণয়নের কাজ করেছেন। বাজেট প্রণয়নে পরিশ্রমী উদ্যোক্তা এবং অর্থনীতির পরিশ্রমী কর্মীদের কথা শোনেননি অর্থমন্ত্রী।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আইএমএফ এর কাজ হলো এক সাইজের জুতা নিয়ে সবাইকে পরিয়ে দেয়া। তাদের প্রেসক্রিপশনের বাইরে গিয়ে কৃষি খাত এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দেয়ার সিদ্ধান্ত বাজেটের ভালো দিক।’

বাজেটে এডিপিতে (উন্নয়ন ব্যয়) নতুন করে যে ১ হাজার ২৮৫টি প্রকল্প নেয়া হয়েছে তার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘বাজেটে এডিপির পুরোটাই ধারের টাকা দিয়ে করা হচ্ছে। এটা কমানো উচিত। কারণ অনেক প্রকল্প নেয়া হয়েছে সেগুলো থেকে তেমন রিটার্ন আসছে না।’

তিনি বলেন, ‘সব সমস্যা আমরা একটা বাজেটের মাধ্যমে সমাধান করতে পারবো না সেটা সত্য। কিন্তু সরকারে যদি একটা দর্শন, চিন্তা থাকে তাহলে সেটা একটা বাজেটের মাধ্যমে শুরু করে পারে। এবারের বাজেটে তেমন কোনো দর্শন বা চিন্তা থেকে করা হয়নি।’

তবে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আপনি ব্যাংক থেকে ঋণ নেবেন, আর ফেরত দেবেন না। দেশে এখন এ মডেল চলছে। খেলাপি ঋণের এ মডেলই এখন দেশের বিজনেস মডেল।’

কালো টাকা সাদা করার বিষয়ে ফরিদপুর-৩ (সদর) আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এ কে আজাদ বলেছেন, ‘পাচারকারীদের উৎসাহ দেয়ার জন্য ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে। বৈধ আয় করে ৩০ শতাংশ কর দেবে আর পাচারকারী কর দেবে ১৫ শতাংশ। এটা হতে পারে না। জাতীয় সংসদে এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানাব।’

প্রশাসনের সব স্তরে সংস্কার প্রয়োজন জানিয়ে সাবেক অর্থ সচিব ও সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, ‘বাজেট ছোট নাকি বড় তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো এটি বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, কারা করবে। প্রশাসনের সব স্তরে দুর্নীতি। তাই এই দুর্নীতি রোধ করতে হবে। এর জন্য একটা সংস্কার কমিশন বা কমিটি গঠন করা জরুরি।’

ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা ভঙ্গুর হয়ে গেছে। রিজার্ভ কমছে, মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, রাজস্ব আয় তেমন বাড়ছে না। এমন একটা পরিস্থিতিতে আমরা কোন ধরনের অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করলাম?’

দৈনিক যুগান্তরের প্রকাশক সালমা ইসলাম সংবাদপত্র শিল্পে বিভিন্ন সংকট নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘সংবাদপত্র শিল্পকে সব ধরনের শুল্ক থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। এই সংকটের সময়েও সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে মোটা অঙ্কের বিজ্ঞাপন বিল বকেয়া পড়ে আছে। আমরা এদিকে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’

তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন মুক্ত গণমাধ্যম। আমাদের দেশে গণমাধ্যমের জন্য সরকারকে আরও উদার হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। এতে দেশ, মানুষ সবার কল্যাণ হবে।’

মঙ্গলবার, ১১ জুন ২০২৪ , ২৮ জৈষ্ঠ্য ১৪৩১ ৪ জিলহজ্ব ১৪৪৫

দেশ ‘অনৈতিক’ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে ‘যাচ্ছে’

অর্থনৈতিক বার্তা পরিবেশক

‘অনিয়ম, দুর্নীতির’ কারণে সরকারি ব্যয়ে ‘প্রচুর অপচয়’ হচ্ছে, দেশ থেকে ‘পুঁজি পাচার’ হচ্ছে, ব্যাংক খাত ‘বিশৃঙ্খল’ অবস্থায়, বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় বাড়ছে, অবাধে কালো টাকার সঞ্চালন হচ্ছে। দেশ একটি ‘নৈতিকতাহীন’ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে ঢুকে পড়েছে।

গতকাল এক অনুষ্ঠানে দেশের চারজন অর্থনীতিবিদ, একজন সাবেক গভর্নর, সাবেক অর্থ সচিব এবং একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এমন মন্তব্য করেছেন।

গতকাল সম্পাদক পরিষদ ও সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) যৌথভাবে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করে। রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে ‘অর্থনীতির চালচিত্র ও প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৪-২৫’ শীর্ষক এ আলোচনায় অংশ নেন বিশিষ্টজনরা।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর, সাবেক অর্থ সচিব ও সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। স্বাগত বক্তব্য দেন নোয়াবের সভাপতি এ কে আজাদ এমপি। সমাপনী বক্তব্য দেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি মাহফুজ আনাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘বিভিন্ন অনুগত স্বার্থগোষ্ঠীকে ব্যাংক থেকে অন্যায় সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছে, যার সঙ্গে ক্ষমতার রাজনীতি সম্পৃক্ত। পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে হলে আর্থিক খাতসহ কিছু সংবেদনশীল খাতকে ক্ষমতার রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে হবে।’

সময়মতো পদক্ষেপ না নেয়ার কারণে মূল্যস্ফীতি গেঁড়ে বসেছে জানিয়ে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকে ভুল নীতির কারণে মৌলিক অনেকগুলো দুর্বলতা সামনে এসেছে। সঠিক নীতির অভাবে অর্থ পাচার, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, রিজার্ভের ধারাবাহিক পতন, রাজস্ব আয় হ্রাস, কালো টাকা তৈরি হচ্ছে। মৌলিক নীতিগত পরিবর্তন না আনলে এসব সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।’

তিনি বলেন, ‘দেশ একটি নৈতিকতাহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে ঢুকে পড়েছে এবারের বাজেটে স্মার্ট বাংলাদেশের কথা বলা হয়েছে। তবে স্মার্ট মানুষ যদি নীতিহীন হয় তা আরও ভয়ঙ্কর হতে পারে। ’

তিনি বলেন, ‘বাজেট ঘাটতি পূরণ করতে আমরা দেশ এবং বিদেশ থেকে উচ্চ সুদে একের পর এক ঋণ নিয়েই চলেছি। ঋণের ওপর নির্ভর করে এভাবে অর্থনীতি চলতে থাকলে একসময় দেউলিয়া না হলেও বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়বে। এই মুহূর্তে আমাদের অর্থনীতির সবগুলো সূচক খারাপ। যতদিন সূচকগুলো ভালো ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ছিল, রেমিট্যান্স ভালো ছিল, রিজার্ভের অবস্থাও ভালো ছিল, তখন অর্থনৈতিক ত্রুটি হজম করার শক্তিও ছিল।’

২০২৪-২৫ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়নি, যদিও দেশে অনেক দিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। এটা বিবেচনাপ্রসূত হয়নি বলে মনে করেন ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘কর নীতি দেখে মনে হয়, বাঘের হরিণ শিকার করার নীতিতে চলছে রাজস্ব ব্যবস্থা। অর্থাৎ ছোট ও ক্ষমতাহীনদের চাপে রাখা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতিতে নৈতিকতা নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার।’

আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘সুদহারের নয়-ছয়ের (ঋণের সুদ ৯ শতাংশ ও আমানতের সুদ ৬ শতাংশ) বেড়াজাল দিয়ে আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বিশেষ করে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা আমরা নিজেরাই সৃষ্টি করেছি। সমস্যা এক দিনে তৈরি হয়নি, তাই সমাধানও একদিনে হবে না। গত বছরের তুলনায় এ বাজেট সংকোচনমুখী হয়েছে। এখন সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি মেনে চললে এবং সুদহার বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে মূল্যস্ফীতি কমবে।’

আহসান মনসুর বলেন, ‘তারপরও জিনিসপত্রের দাম কমবে না, তবে মূল্যবৃদ্ধির হার কমবে।’

বাজেটে কিছু অসঙ্গতি আছে জানিয়ে আহসান মনসুর বলেন, ‘বলা হচ্ছে, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। ব্যাংক খাত এত দুর্বল যে আমানতের প্রবৃদ্ধি ভালো নয়। আমানতের প্রবৃদ্ধির মোট পরিমাণ ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি হবে না। সেখান থেকে সরকারই যদি ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেয়, তাহলে আর কী থাকবে। অর্থনীতিতে ব্যক্তি খাতের আকার ৮৬ শতাংশ; ১৪ শতাংশ সরকারি। আমাদের হিসাবে ৭৬ শতাংশ ঋণ নিচ্ছে সরকার, তাহলে ব্যক্তি খাত ঋণ পাচ্ছে ২৪ শতাংশ । বড় অসঙ্গতি এখানেই, এটা হতে পারে না।’

বিদ্যুৎ খাতকে সরকার যথেষ্ট সুযোগ দিয়েছে বলে মনে করেন আহসান মনসুর। আর বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বা দামও অনেক বেশি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিদ্যমান ক্যাপাসিটি চার্জ ও ভর্তুকি বজায় রেখে বেশি দূর এগোনো যাবে না। ভারতের আদানি গ্রুপ হোক বা দেশের সামিট গ্রুপ বা ওরিয়ন গ্রুপই হোক, আমি মনে করি, এদের সঙ্গে পুনরায় দর-কষাকষি (রিনেগোশিয়েট) করতে হবে। এভাবে ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব।’

বাংলাদেশে এত মন্ত্রণালয় থাকা উচিত নয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দরকার আছে কি? আমার তা মনে হয় না। সরকার যদি একটু নির্মোহভাবে চিন্তা করে, দেশে এত মন্ত্রণালয় থাকার দরকার নেই। যুক্তরাষ্ট্রে ১১টি মন্ত্রণালয়, অথচ আমাদের এখানে ৫০ থেকে ৬০টি।’

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী বাজেট প্রণয়নে আমলা, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) আর প্রভাবশালী অলিগার্কদের কথা শুনেছেন। আমলারা তাদের সুযোগ-সুবিধা ঠিক রেখেই বাজেট প্রণয়নের কাজ করেছেন। বাজেট প্রণয়নে পরিশ্রমী উদ্যোক্তা এবং অর্থনীতির পরিশ্রমী কর্মীদের কথা শোনেননি অর্থমন্ত্রী।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আইএমএফ এর কাজ হলো এক সাইজের জুতা নিয়ে সবাইকে পরিয়ে দেয়া। তাদের প্রেসক্রিপশনের বাইরে গিয়ে কৃষি খাত এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দেয়ার সিদ্ধান্ত বাজেটের ভালো দিক।’

বাজেটে এডিপিতে (উন্নয়ন ব্যয়) নতুন করে যে ১ হাজার ২৮৫টি প্রকল্প নেয়া হয়েছে তার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘বাজেটে এডিপির পুরোটাই ধারের টাকা দিয়ে করা হচ্ছে। এটা কমানো উচিত। কারণ অনেক প্রকল্প নেয়া হয়েছে সেগুলো থেকে তেমন রিটার্ন আসছে না।’

তিনি বলেন, ‘সব সমস্যা আমরা একটা বাজেটের মাধ্যমে সমাধান করতে পারবো না সেটা সত্য। কিন্তু সরকারে যদি একটা দর্শন, চিন্তা থাকে তাহলে সেটা একটা বাজেটের মাধ্যমে শুরু করে পারে। এবারের বাজেটে তেমন কোনো দর্শন বা চিন্তা থেকে করা হয়নি।’

তবে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আপনি ব্যাংক থেকে ঋণ নেবেন, আর ফেরত দেবেন না। দেশে এখন এ মডেল চলছে। খেলাপি ঋণের এ মডেলই এখন দেশের বিজনেস মডেল।’

কালো টাকা সাদা করার বিষয়ে ফরিদপুর-৩ (সদর) আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এ কে আজাদ বলেছেন, ‘পাচারকারীদের উৎসাহ দেয়ার জন্য ১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে। বৈধ আয় করে ৩০ শতাংশ কর দেবে আর পাচারকারী কর দেবে ১৫ শতাংশ। এটা হতে পারে না। জাতীয় সংসদে এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানাব।’

প্রশাসনের সব স্তরে সংস্কার প্রয়োজন জানিয়ে সাবেক অর্থ সচিব ও সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, ‘বাজেট ছোট নাকি বড় তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো এটি বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, কারা করবে। প্রশাসনের সব স্তরে দুর্নীতি। তাই এই দুর্নীতি রোধ করতে হবে। এর জন্য একটা সংস্কার কমিশন বা কমিটি গঠন করা জরুরি।’

ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা ভঙ্গুর হয়ে গেছে। রিজার্ভ কমছে, মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, রাজস্ব আয় তেমন বাড়ছে না। এমন একটা পরিস্থিতিতে আমরা কোন ধরনের অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করলাম?’

দৈনিক যুগান্তরের প্রকাশক সালমা ইসলাম সংবাদপত্র শিল্পে বিভিন্ন সংকট নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘সংবাদপত্র শিল্পকে সব ধরনের শুল্ক থেকে অব্যাহতি দিতে হবে। এই সংকটের সময়েও সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে মোটা অঙ্কের বিজ্ঞাপন বিল বকেয়া পড়ে আছে। আমরা এদিকে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’

তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন মুক্ত গণমাধ্যম। আমাদের দেশে গণমাধ্যমের জন্য সরকারকে আরও উদার হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। এতে দেশ, মানুষ সবার কল্যাণ হবে।’