হাশেম খান : ইতিহাস-ঐতিহ্য ও মুক্তির চিত্রকর

জাহিদ মুস্তাফা

মেঘ-বৃষ্টির ভালবাসার জমাট গল্পে বাংলার আষাঢ় আমাদের চারপাশকে ধুয়ে নির্মল করে। নিসর্গ সিক্ত হয়, সবুজে ভরে ওঠে গাছপালা, ফসলের মাঠ। নদীর বুক ভরে ওঠে থই থই জলে। চুরাশি বছর আগে এমনই এক বর্ষাসিক্ত দিনে মেঘনা-ডাকাতিয়া নদীর নিকটে যে শিশুর জন্ম হয়েছিল তিনি এই বাংলা ব-দ্বীপের এক গুণী চিত্রকর হাশেম খান। প্রথিতযশা এই চিত্রশিল্পী ও চিত্রশিল্পের বরেণ্য শিক্ষকের চুরাশিতম জন্মদিন ছিল গত সোমবার।

শিল্পী হাশেম খানের পুরো নাম মো. আবুল হাশেম খান।

১৯৭২ সালে প্রণীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংবিধান গ্রন্থ অলংকরণে তিনি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে কাজ করা টিমের অন্যতম শিল্পী। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পকলার দায়িত্ব নিয়ে কলকাতা, দিল্লি ও মুম্বাইয়ে প্রদর্শনী করেছেন।

১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমার জেলা টাঙ্গাইলে কচি-কাঁচার মেলার সম্মেলনে অতিথি হয়ে এসেছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কবি বেগম সুফিয়া কামাল, কচি-কাঁচার মেলার পরিচালক রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই, সুফিয়া কামাল তনয় সাজিদ কামাল, আমাদের শৈশবকালের বন্ধু ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন প্রমুখ। আর এসেছিলেন কচি-কাঁচার মেলার উপদেষ্টা শিল্পী হাশেম খান। আমি তখন বিন্দুবাসিনী স্কুলে নবম শ্রেণির ছাত্র। আমাদের পাঠ্যবইয়ে আঁকা ছবির সূত্রে হাশেম খান এই নামটি আমাদের খুব চেনা! তাঁর সঙ্গে সেই প্রথম পরিচয়। তাঁর সেই অবয়বটি আমার চোখে ভাসে। বাঙালির গড় উচ্চতার ফর্সা এই মানুষটির উন্নত নাকের নিচে কালচে গোঁফ। সাহস করে তাঁকে বলিÑ স্যার, ছোট থেকেই আমরা আপনার নামের সঙ্গে পরিচিত! জবাবে তিনি মিষ্টি করে হাসেন এবং হাত বাড়িয়ে করমর্দন করেন।

-তুমি ছবি আঁকা পছন্দ কর?

-জ্বি। একটু আধটু আঁকি। আবেদিন স্যারকে আমার একটা ছবি দিয়েছি।

-বাহ্ বেশতো! এই চর্চাটা ধরে রেখো।

১৯৭৯ সালে জাপানে টোকিওতে শিশু পুস্তক চিত্রণে স্বল্পকালীন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন হাশেম খান।

আন্তর্জাতিক শিশুবর্ষ ১৯৭৯ উপলক্ষে জাপানে শিশু পুস্তক শিল্পীদের সম্মেলনে টোকিও, চেকস্লোভাকিয়ায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন দেশ-বিদেশের অসংখ্য প্রশিক্ষণ কর্মশালায়।

১৯৮২ সালে ইউনেস্কো, টোকিওর অর্থায়নে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র আয়োজিত শিশুদের উপযোগী বই প্রকাশনার এক কর্মশালায় আমার অংশগ্রহণের সুযোগ হয়। ভারতের প্রখ্যাত শিল্পী কে এম জি রামকৃষ্ণান ও আমাদের শিক্ষক হাশেম খান এই কর্মশালাটি পরিচালনা করেন। শিশুদের বইসহ প্রকাশনার অনেক কিছু সম্পর্কে এই দুই গুণির কাছ থেকে আমরা প্রশিক্ষণার্থীরা অনেক কিছু শিখেছি।

হাশেম খান তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নির্মিত ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ’-এর জুরি বোর্ড

ও বাস্তবায়নে বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য (১৯৯৭-২০০০) হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন জাতীয় চিত্রশালা, জাতীয় নাট্যশালা এবং জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্রের বাস্তবায়নের ৩ সদস্যের স্টিয়ারিং কমিটির বিশেষজ্ঞ সদস্য। ঢাকা নগর জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় তাঁর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বর্তমানে তিনি বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের সভাপতি।

প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যবইয়ের অলংকরণ ছাড়াও তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে চারুকলা ও ললিতকলা বিষয়ক পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করেছেন। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিষয়ভিত্তিক ৫টি গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি। তাঁর প্রণীত শিল্পশিক্ষাবিষয়ক বই ‘চারুকলা শিক্ষা’ চিত্রবিদ্যা অনুশীলনে কার্যকর একটা বই।

আমি ১৯৭৮ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করি। ১৯৭৯ সালে টাঙ্গাইলের কচি-কাঁচার মেলার সংগঠক খান মোহাম্মদ খালেদের চিঠি নিয়ে ঢাকার চারুকলায় তাঁর প্রাচ্যকলা বিভাগে যেয়ে দেখা করি, বলি- স্যার, আমার কথা কি আপনার মনে আছে? আমি এসেছি চারুবিদ্যা শিখতে।

তিনি আমাকে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে বলেন এবং নিয়মিত ড্রয়িং ও স্কেচ করার পরামর্শ দেন।

চারুকলার ছাত্রাবাস শাহনেওয়াজ ভবনে শিল্পী শিশির ভট্টাচার্যের তত্ত্বাবধানে আমি নিয়মিত অংকন অনুশীলন করতে থাকি। আগস্টে আমাদের ভর্তি পরীক্ষা হয় এবং উত্তীর্ণ হয়ে চারুকলায় পড়তে থাকি। এবার নিয়মিত স্যারের সঙ্গে দেখা হতে থাকে।

একে একে আমাদের গুণী শিক্ষক ও শিল্পীদের সঙ্গে পরিচয় ঘটার সৌভাগ্য হয়। আনোয়ারুল হক, কামরুল হাসান, সফিউদ্দীন আহমেদ, মোহাম্মদ কিবরিয়া, আমিনুল ইসলাম, কাইয়ুম চৌধুরী, আবদুর রাজ্জাক, আবদুল বাসেত, মীর মোস্তফা আলী, সমরজিৎ রায়, রফিকুন নবী, মাহমুদুল হক, হামিদুজ্জামান খান, শহিদ কবীর, মাহবুবুল আমিন কত উজ্জ্বল সব নামের ব্যক্তিত্ব আমাদের শিক্ষক! কত স্মৃতি তাঁদের নিয়ে আমার, আমাদের। এতো বছরে অনেককে হারিয়েও ফেলেছি। এখন আমাদের মাথার ওপর বটগাছের ছায়া হয়ে আছেন- বর্ষিয়ান দুই শিল্পী আমাদের শিক্ষাগুরু হাশেম খান ও রফিকুন নবী। দু’জনেই এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ইমেরিটাস প্রফেসর।

আমাদের শিক্ষক হাশেম খানের নেতৃত্বে আমি শিল্পীপেশাজীবীদের সংগঠন বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদে একজন সংগঠক হিসেবে কাজ করেছি। সেবার চারুশিল্পী সংসদ পদক প্রদানের সিদ্ধান্ত হলে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী আবদুর রউফ (হাতে লেখা বাংলাদেশের সংবিধানের লিপিকার ও ফিল্ম আর্কাইভের প্রথম কিউরেটর) এর সম্পর্কে লেখা ও তা পাঠের দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়। আমি রউফ ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর কাকরাইলের অফিসে দেখা করে নানা তথ্য নিয়ে লিখে হাশেম খানকে দেখাই। তিনি ছোটখাটো কিছু তথ্য সংশোধন করে দেন। তাঁর জ্ঞানের গভীরতা আরও নতুন করে অনুভব করি। তিনি যেমন আঁকেন, তেমন লেখনি ক্ষমতা তাঁর, চমৎকার বলেনও তিনি। ইতিহাস আশ্রিত তাঁর বলায় আমরা অতীতের সঙ্গে বর্তমানকে তুলনা করতে পারি।

ছবি আঁকায় তিনি উজ্জ্বল রঙ ব্যবহার করেন, এই বর্ণিলতা তাঁর চিত্রের প্রাণ! লোকায়ত বাংলার ঘর-সংসার, জীবনযুদ্ধ, উৎসব, মৃৎপাত্র, নানারকম পাখি-ময়ূর ও দৃশ্যনির্ভর পাখা তাঁর চিত্রকলার অন্যতম চরিত্র হয়ে উঠেছে।

দেশের নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস-ঐতিহ্য জানা, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর চেতনায় আলোকিত করার জন্য ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের সঙ্গে মিলে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফের সহযোগিতায় ঢাকা নগর জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রামী স্মৃতি সংরক্ষণ এবং তাঁর ব্যক্তিত্বের অমল আলোক ছটায় সমকাল ও ভবিষ্যতকে রাঙিয়ে দেওয়ার নিরবচ্ছিন্ন সৃজনশীল প্রয়াসে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন হাশেম খান।

হাশেম খান ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ট ইনস্টিটিউটের প্রাচ্যকলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৬ সালে বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ছয় দফা ঘোষণার মঞ্চসজ্জা করেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগ কর্তৃক প্রকাশিত তৎকালীন পাকিস্তানের দুই অংশের দ্রব্যমূল্য ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বৈষম্যের তুলনামূলক পরিসংখ্যান নিয়ে তিনি জননন্দিত এক পোস্টারের নকশা প্রণয়ন করেন, যেটি সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরংকুশ বিজয়ে সহায়ক হয়।

হাশেম খান ১৯৯২ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ পুরস্কার একুশে পদক, ২০১১ সালে সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার স্বাধীনতা পদক লাভ করেন। এ ছাড়াও বইয়ের প্রচ্ছদের জন্য তিনি ষোলবার জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র কর্তৃক পুরস্কৃত হন। তিনবার অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।

এই গুণি মানুষটির আবির্ভাব দিবসটি আমাদের শিল্প ও শিল্পীদের জন্য শুধু নয়, সমগ্র বাঙালি জাতির জন্য অত্যন্ত আনন্দের!

হাশেম খানের সুস্থতাসহ তাঁর দীর্ঘজীবন কামনা করি। ভালো থাকুন তিনি ও আমাদের সমকালীন চারুশিল্প।

বৃহস্পতিবার, ০৪ জুলাই ২০২৪ , ২০ আষাড় ১৪৩১ ২৬ জ্বিলহজ্ব ১৪৪৫

হাশেম খান : ইতিহাস-ঐতিহ্য ও মুক্তির চিত্রকর

জাহিদ মুস্তাফা

image

মেঘ-বৃষ্টির ভালবাসার জমাট গল্পে বাংলার আষাঢ় আমাদের চারপাশকে ধুয়ে নির্মল করে। নিসর্গ সিক্ত হয়, সবুজে ভরে ওঠে গাছপালা, ফসলের মাঠ। নদীর বুক ভরে ওঠে থই থই জলে। চুরাশি বছর আগে এমনই এক বর্ষাসিক্ত দিনে মেঘনা-ডাকাতিয়া নদীর নিকটে যে শিশুর জন্ম হয়েছিল তিনি এই বাংলা ব-দ্বীপের এক গুণী চিত্রকর হাশেম খান। প্রথিতযশা এই চিত্রশিল্পী ও চিত্রশিল্পের বরেণ্য শিক্ষকের চুরাশিতম জন্মদিন ছিল গত সোমবার।

শিল্পী হাশেম খানের পুরো নাম মো. আবুল হাশেম খান।

১৯৭২ সালে প্রণীত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংবিধান গ্রন্থ অলংকরণে তিনি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে কাজ করা টিমের অন্যতম শিল্পী। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পকলার দায়িত্ব নিয়ে কলকাতা, দিল্লি ও মুম্বাইয়ে প্রদর্শনী করেছেন।

১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমার জেলা টাঙ্গাইলে কচি-কাঁচার মেলার সম্মেলনে অতিথি হয়ে এসেছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কবি বেগম সুফিয়া কামাল, কচি-কাঁচার মেলার পরিচালক রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই, সুফিয়া কামাল তনয় সাজিদ কামাল, আমাদের শৈশবকালের বন্ধু ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন প্রমুখ। আর এসেছিলেন কচি-কাঁচার মেলার উপদেষ্টা শিল্পী হাশেম খান। আমি তখন বিন্দুবাসিনী স্কুলে নবম শ্রেণির ছাত্র। আমাদের পাঠ্যবইয়ে আঁকা ছবির সূত্রে হাশেম খান এই নামটি আমাদের খুব চেনা! তাঁর সঙ্গে সেই প্রথম পরিচয়। তাঁর সেই অবয়বটি আমার চোখে ভাসে। বাঙালির গড় উচ্চতার ফর্সা এই মানুষটির উন্নত নাকের নিচে কালচে গোঁফ। সাহস করে তাঁকে বলিÑ স্যার, ছোট থেকেই আমরা আপনার নামের সঙ্গে পরিচিত! জবাবে তিনি মিষ্টি করে হাসেন এবং হাত বাড়িয়ে করমর্দন করেন।

-তুমি ছবি আঁকা পছন্দ কর?

-জ্বি। একটু আধটু আঁকি। আবেদিন স্যারকে আমার একটা ছবি দিয়েছি।

-বাহ্ বেশতো! এই চর্চাটা ধরে রেখো।

১৯৭৯ সালে জাপানে টোকিওতে শিশু পুস্তক চিত্রণে স্বল্পকালীন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন হাশেম খান।

আন্তর্জাতিক শিশুবর্ষ ১৯৭৯ উপলক্ষে জাপানে শিশু পুস্তক শিল্পীদের সম্মেলনে টোকিও, চেকস্লোভাকিয়ায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। নেতৃত্ব দিয়েছেন দেশ-বিদেশের অসংখ্য প্রশিক্ষণ কর্মশালায়।

১৯৮২ সালে ইউনেস্কো, টোকিওর অর্থায়নে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র আয়োজিত শিশুদের উপযোগী বই প্রকাশনার এক কর্মশালায় আমার অংশগ্রহণের সুযোগ হয়। ভারতের প্রখ্যাত শিল্পী কে এম জি রামকৃষ্ণান ও আমাদের শিক্ষক হাশেম খান এই কর্মশালাটি পরিচালনা করেন। শিশুদের বইসহ প্রকাশনার অনেক কিছু সম্পর্কে এই দুই গুণির কাছ থেকে আমরা প্রশিক্ষণার্থীরা অনেক কিছু শিখেছি।

হাশেম খান তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নির্মিত ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ’-এর জুরি বোর্ড

ও বাস্তবায়নে বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য (১৯৯৭-২০০০) হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন জাতীয় চিত্রশালা, জাতীয় নাট্যশালা এবং জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্রের বাস্তবায়নের ৩ সদস্যের স্টিয়ারিং কমিটির বিশেষজ্ঞ সদস্য। ঢাকা নগর জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় তাঁর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বর্তমানে তিনি বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের সভাপতি।

প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যবইয়ের অলংকরণ ছাড়াও তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে চারুকলা ও ললিতকলা বিষয়ক পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করেছেন। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিষয়ভিত্তিক ৫টি গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি। তাঁর প্রণীত শিল্পশিক্ষাবিষয়ক বই ‘চারুকলা শিক্ষা’ চিত্রবিদ্যা অনুশীলনে কার্যকর একটা বই।

আমি ১৯৭৮ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করি। ১৯৭৯ সালে টাঙ্গাইলের কচি-কাঁচার মেলার সংগঠক খান মোহাম্মদ খালেদের চিঠি নিয়ে ঢাকার চারুকলায় তাঁর প্রাচ্যকলা বিভাগে যেয়ে দেখা করি, বলি- স্যার, আমার কথা কি আপনার মনে আছে? আমি এসেছি চারুবিদ্যা শিখতে।

তিনি আমাকে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে বলেন এবং নিয়মিত ড্রয়িং ও স্কেচ করার পরামর্শ দেন।

চারুকলার ছাত্রাবাস শাহনেওয়াজ ভবনে শিল্পী শিশির ভট্টাচার্যের তত্ত্বাবধানে আমি নিয়মিত অংকন অনুশীলন করতে থাকি। আগস্টে আমাদের ভর্তি পরীক্ষা হয় এবং উত্তীর্ণ হয়ে চারুকলায় পড়তে থাকি। এবার নিয়মিত স্যারের সঙ্গে দেখা হতে থাকে।

একে একে আমাদের গুণী শিক্ষক ও শিল্পীদের সঙ্গে পরিচয় ঘটার সৌভাগ্য হয়। আনোয়ারুল হক, কামরুল হাসান, সফিউদ্দীন আহমেদ, মোহাম্মদ কিবরিয়া, আমিনুল ইসলাম, কাইয়ুম চৌধুরী, আবদুর রাজ্জাক, আবদুল বাসেত, মীর মোস্তফা আলী, সমরজিৎ রায়, রফিকুন নবী, মাহমুদুল হক, হামিদুজ্জামান খান, শহিদ কবীর, মাহবুবুল আমিন কত উজ্জ্বল সব নামের ব্যক্তিত্ব আমাদের শিক্ষক! কত স্মৃতি তাঁদের নিয়ে আমার, আমাদের। এতো বছরে অনেককে হারিয়েও ফেলেছি। এখন আমাদের মাথার ওপর বটগাছের ছায়া হয়ে আছেন- বর্ষিয়ান দুই শিল্পী আমাদের শিক্ষাগুরু হাশেম খান ও রফিকুন নবী। দু’জনেই এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ইমেরিটাস প্রফেসর।

আমাদের শিক্ষক হাশেম খানের নেতৃত্বে আমি শিল্পীপেশাজীবীদের সংগঠন বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদে একজন সংগঠক হিসেবে কাজ করেছি। সেবার চারুশিল্পী সংসদ পদক প্রদানের সিদ্ধান্ত হলে পদকপ্রাপ্ত শিল্পী আবদুর রউফ (হাতে লেখা বাংলাদেশের সংবিধানের লিপিকার ও ফিল্ম আর্কাইভের প্রথম কিউরেটর) এর সম্পর্কে লেখা ও তা পাঠের দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়। আমি রউফ ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর কাকরাইলের অফিসে দেখা করে নানা তথ্য নিয়ে লিখে হাশেম খানকে দেখাই। তিনি ছোটখাটো কিছু তথ্য সংশোধন করে দেন। তাঁর জ্ঞানের গভীরতা আরও নতুন করে অনুভব করি। তিনি যেমন আঁকেন, তেমন লেখনি ক্ষমতা তাঁর, চমৎকার বলেনও তিনি। ইতিহাস আশ্রিত তাঁর বলায় আমরা অতীতের সঙ্গে বর্তমানকে তুলনা করতে পারি।

ছবি আঁকায় তিনি উজ্জ্বল রঙ ব্যবহার করেন, এই বর্ণিলতা তাঁর চিত্রের প্রাণ! লোকায়ত বাংলার ঘর-সংসার, জীবনযুদ্ধ, উৎসব, মৃৎপাত্র, নানারকম পাখি-ময়ূর ও দৃশ্যনির্ভর পাখা তাঁর চিত্রকলার অন্যতম চরিত্র হয়ে উঠেছে।

দেশের নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস-ঐতিহ্য জানা, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর চেতনায় আলোকিত করার জন্য ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের সঙ্গে মিলে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফের সহযোগিতায় ঢাকা নগর জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রামী স্মৃতি সংরক্ষণ এবং তাঁর ব্যক্তিত্বের অমল আলোক ছটায় সমকাল ও ভবিষ্যতকে রাঙিয়ে দেওয়ার নিরবচ্ছিন্ন সৃজনশীল প্রয়াসে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন হাশেম খান।

হাশেম খান ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ট ইনস্টিটিউটের প্রাচ্যকলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৬ সালে বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ছয় দফা ঘোষণার মঞ্চসজ্জা করেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগ কর্তৃক প্রকাশিত তৎকালীন পাকিস্তানের দুই অংশের দ্রব্যমূল্য ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বৈষম্যের তুলনামূলক পরিসংখ্যান নিয়ে তিনি জননন্দিত এক পোস্টারের নকশা প্রণয়ন করেন, যেটি সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরংকুশ বিজয়ে সহায়ক হয়।

হাশেম খান ১৯৯২ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ পুরস্কার একুশে পদক, ২০১১ সালে সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার স্বাধীনতা পদক লাভ করেন। এ ছাড়াও বইয়ের প্রচ্ছদের জন্য তিনি ষোলবার জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র কর্তৃক পুরস্কৃত হন। তিনবার অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।

এই গুণি মানুষটির আবির্ভাব দিবসটি আমাদের শিল্প ও শিল্পীদের জন্য শুধু নয়, সমগ্র বাঙালি জাতির জন্য অত্যন্ত আনন্দের!

হাশেম খানের সুস্থতাসহ তাঁর দীর্ঘজীবন কামনা করি। ভালো থাকুন তিনি ও আমাদের সমকালীন চারুশিল্প।