কথোপকথন ইকরাম কবীর

নাবিক ও বাতাস

ক্যাপ্টেন ইলিয়াস তার জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে আছেন। তাকিয়ে আছেন বিশাল, কর্কশ সমুদ্রের দিকে। বন্দরে পৌঁছুতে এখনও প্রায় দশদিন বাকি। চারিপাশে দিগন্তজোড়া পানিরাশি। আকাশের সাথে মিশে অবিচ্ছেদ্য হয়ে গেছে। খেই পাওয়া যায় না। কখনোই পানি আর দিগন্তের সীমারেখা ছুঁতে পারেননি তিনি। ওটা না ছোঁয়া পর্যন্ত ইলিয়াসের একাকীত্ব ঘুচবে না। ঠিক সেই মুহূর্তে তিনি বুঝতে পারেন বাতাস তার সবসময়ের সঙ্গী। তার চারপাশে নাচে; কখনও ফিসফিসানির মতো, কখনও কড়াৎ-কড়াৎ শব্দে, কখনও গড়ড়-গড়ড় করে তার সাথে কথা বলে চলেছে। কতোবার মরতে মরতে বেঁচে গেছেন এই বাতাসের জন্যে। বাতাসের সাথে এক আত্মিক, সান্ত¡নাদায়ক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে তার।

ক্যাপ্টেন বাতাসের কাছে জানতে চান- ‘তুমি আমার সাথে কথা বলো কেন?’

‘আমি যে একা’, বাতাস উত্তর দেয়। বাতাসের কণ্ঠ ইলিয়াসের গালে একটা চুম্বনের ছোঁয়ার মতো মনে হয়। ‘আমি সংযোগ খুঁজি, ক্যাপ্টেন’, বাতাস বলে।

ইলিয়াস খুশি হন, তবে অবিশ্বাসের সাথে একটু দুঃখ-দুঃখ ভাব নিয়ে বলেন, ‘তাই তুমি আমাকে বেছে নিলে? অশান্ত এই সাগরের মাঝে ভেসে থাকা এক একা মানুষকে?’

বাতাস এক ধরনের স্বীকারোক্তি মেশানো কণ্ঠে বলে- ‘তোমার একাকীত্বে, আমি একজন আত্মা খুঁজে পেয়েছি; আর কোথাও পাচ্ছিলাম না; কেউ আমার সর্বব্যাপিতা বুঝতে পারে না; তুমি বুঝেছো; তাই তোমার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে।’

ইলিয়াস সব কাজের মাঝেও বাতাসের সাথে কথোপকথনের জন্য উৎসুকভাবে অপেক্ষা করে। তারা প্রাচীন সময়ের গল্প করে, আনন্দ ও দুঃখের কথা, এবং দুজনের অস্তিত্বেরই সাধারণ সৌন্দর্যের আলাপ করে।

ইলিয়াস ভাবেন- ‘কিন্তু কেন? আমায় বেছে নেয়ার কারণ কী? আমার মাঝে কেমন আত্মা আছে?’

বাতাস বলে- ‘তোমার কাছ থেকে আমি শিখি; তোমার ধৈর্য, তোমার ভয়, তোমার আশা- এসবই আমার অস্তিত্বকে পূর্ণ হতে শেখায়।’

ইলিয়াস কথাগুলো বোঝেন না তবে এই কথোপকথনে একাকিত্বে গ্রাস হয়ে যাওয়া তার অস্তিত্ব কিছুটা হলেও সান্ত্বনা পায়। সমুদ্রাকার এই কারাগারে বাতাসের সাথে এই সংলাপ ইলিয়াসের জন্য উজ্জ্বল ছবির ক্যানভাসে পরিণত হয়।

এক রাতে, অসংখ্য তারার চাদরের নিচে ডেকে দাঁড়িয়ে ইলিয়াস বাতাসকে প্রশ্ন করেন- ‘তুমি কি কখনো আমায় ছেড়ে যাবে?’

বাতাস নিশ্চিত করে- ‘আমি এক স্থির অস্তিত্ব, ইলিয়াস; তোমার যে কোনো নীরবতায়ও আমি তোমার সাথে আছি, থাকবো।’

এভাবেই বাতাস আর ইলিয়াসের মধ্যে একটা অদৃশ্য সুতোর বুনন দিয়ে অস্তিত্বের বন্ধন তৈরি হয়। গহীন সমুদ্র থেকে নাবিক ইলিয়াস পৃথিবীর কাছে ফিরে আসেন। বন্দরে ফিরে সে আবিষ্কার করেন যে বাতাসের সেই ফিসফিসানি তাকে অনুসরণ করছে। সে বাতাসের সাথে তার অদৃশ্য সংযোগটা তিনি বুঝতে পারেন।

চিঠি

নিলুফার কাগজ-কলম হাতে নিয়ে টেবিলে বসে আছে। কাগজের উপর তার হাত থির-থির করে কাঁপছে। কলমটা অনেক ভারি লাগছে, শব্দগুলো কোথায় যেন আটকে আছে। সাদা পাতাটার দিকে তাকিয়ে হৃদয়ের ভার সে অনুভব করে। কিন্তু তার না বলা কথাগুলোর ওজন আরও অনেক বেশি। কথাগুলো বলতেই হবে।

‘মা আয়েশা’, নিলুফার লিখতে শুরু করে। তবে থেমে যায়; চোখের কোণে পানি জমে ওঠে। সে গভীর কয়েকটা শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলায় এবং আবার লিখতে শুরু করে।

‘আমি তোমাকে প্রতিদিন মিস করি। তোমার হাসির চ্ছটা ছাড়া বাড়িটা এতো ঠা-া তা আমি আগে বুঝিনি। ইচ্ছে করে তোমাকে আরেকবার জড়িয়ে ধরতে, যদি বলতে পারতাম তোমায় কতটা ভালোবাসি। তুমি কেমন আছো, মা? শান্তিতে আছো তো? অনেক ভালোবাসা নিও। ইতি, তোমারই মা।’

নিলুফার চিঠিটা ভাঁজ করে, খামে ঢুকিয়ে, টেকনিশিয়ানের হাতে তুলে দেয়।

‘তুমি নিশ্চিত এটা কাজ করবে?’ সে জানতে চায়। চোখে-মুখে অনিশ্চয়তা।

টেকনিশিয়ান মাথা নেড়ে বলে- ‘হ্যাঁ, নিলুফার আপা; উত্তরটা এক সাত দিনের মধ্যেই পাবেন’।

সপ্তাহের প্রতিটা দিন একেকটা জীবনকালের মতো মনে হয় নিলুফারের কাছে। সে ঘরের মেঝেতে সারাদিন পায়চারি করে

আর মনের মধ্যে আয়েশার স্মৃতি জলপ্রপাতের মতো বেজেই চলে।

চিঠিটা আসে। নিলুফার কাঁপা হাতে খামটা খোলে। সেখানে লেখা আছে- ‘মা, আমিও তোমাকে মিস করি। আমি শান্তিতে আছি; খুব ভালো জায়গায় আছি; তুমি একেবারেই চিন্তা কোরো না। মনে রেখ, আমি সবসময় তোমাকে ভালবাসবো। নিজের খেয়াল রেখো। ভালোবাসা নিও। ইতি, তোমারই মেয়ে- আয়েশা।‘

নিলুফার কাঁদে; অনেক কাঁদে। কান্না শেষে ঠোঁটের কোণে একটা স্মিত মিষ্টি হাসিও ফুটে ওঠে। চিঠিটা তার আহত মানসে প্রচ- খরার পর মুষলধারে বৃষ্টির মতো মনে হয়। কিন্তু বিষয়টা অদ্ভুত লাগে। এতো নিখুঁত হয় কী করে- অতিপ্রাকৃতভাবে নিখুঁত।

সে তার বন্ধু মেহেরকে জিজ্ঞাসা করে- ‘তোমার কি মনে হয়? এ কি সত্যিই আমার আয়েশা?’

‘কেন নয়, বলতো? সন্দেহ হচ্ছে কেন?’ মেহের উত্তর দেয়। ‘তুমি তার কাছ থেকে ভালোবাসা মেশানো উত্তর পেয়েছ, তাই না? তাহলে আর চিন্তা কিসের?’

‘তবে এটা যদি সত্যি না হয়? যদি এটা কেবল... একটা প্রযুক্তির তৈরি উত্তর হয়?’ নিলুফারের কণ্ঠে অনিশ্চয়তা।

মেহের তার কাঁধে হাত রাখে- ‘এ তুমি কী বলছো? চিঠির কথাগুলো তো তোমায় শান্তি দিয়েছে; দেয়নি?’

নিলুফার মাথা নেড়ে সায় দেয়, তবে তার মনে সন্দেহ রয়েই যায়।

সে চিঠিটার দিকে তাকিয়ে থাকে। সত্য ও অস্পষ্ট সত্যের এক দোলা তার মনে ঘুরপাক খায়। তবে একটা বিষয় তার হৃদয় ছুঁয়ে যায় এবং এক বাস্তবতা ও মরীচিকা তাকে অন্য রকম শান্তি দেয়।

রাতে, নিজের ঘরের নিস্তব্ধতায়, নিলুফার মৃত মেয়ের উদ্দেশ্যে বলে- ‘মা, আয়েশা- এই চিঠি যদি সত্যিই তোমার হয়, আমি আশা করি তুমি জানো যে এটা আমার জন্য কতটা প্রয়োজন ছিল; আর যদি নাও হয়... তবুও আমি বিশ্বাস করি এটা তোমারই।‘

নিলুফার চিঠিটা ড্রয়ারে রেখে দিয়ে ধীরে ধীরে তা বন্ধ করে; আর কখনও ড্রয়ারটা খুলবে না, যেন তার আত্মার একটি অংশ সিল-গালা করে রাখছে। এই প্রযুক্তিটা তাকে এক নিমেষের জন্যে একটা বন্ধন যুগিয়েছে, তবে একটি অনন্ত অনিশ্চয়তার সাথে লড়তে পথে নামিয়ে দিচ্ছে।

লাইব্রেরি

আবদুল হাসেম চোখ খুলে দেখল যে সে একটা ধু-ধু লাইব্রেরিতে বসে আছে। যেদিকে চোখ যায় শুধু শেলফ আর শেলফ; দশদিকে এতো বই যে তার কিনারা নেই। নানা আকারের আর রঙের বইয়ে পূর্ণ। একটি নরম, সোনালি আলো পুরো স্থানটাকে আলোকিত করে রেখেছে। এই আলোটায় তার মনে শান্তি এলো।

‘এ আমি কোথায় এসেছি!’ হতবাক হয়ে সে ভাবে।

‘তোমাকে আত্মাদের লাইব্রেরিতে আনা হয়েছে,’ একটা কোমল কণ্ঠস্বরের কাছ থেকে উত্তর এলো।

হাসেম ঘুরে দেখল একজন বৃদ্ধ লাইব্রেরিয়ান, দয়া ভরা চোখ আর শান্ত হাসি নিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসছেন। ‘আপনিই কী সেই?’ হাসেম চোখে-মুখে অবিশ্বাস নিয়ে জানতে চায়।

‘হ্যাঁ, হাসেম; আমিই সেই’। লাইব্রেরিয়ান মৃদু হাসলেন। ‘ভাবলাম আমার এই রূপটা তোমার জন্য শান্তিপূর্ণ হবে, তাই এই বেশে এলাম।’

হাসেম আবার চারপাশে তাকায়; এখনও ধাতস্থ হতে পারেনি। ‘আমি এখন কী করবো? আমার কতোটা শাস্তি হবে?’

লাইব্রেরিয়ান চারপাশের সব শেলফগুলোর দিকে ইঙ্গিত করলেন। ‘এই যে বইগুলো দেখছো; প্রতিটা বই এক-একটা মানুষের জীবনের কাহিনী। তুমি কি তোমারটা দেখতে চাও? পড়তে চাও?’

একটু দ্বিধা আর কৌতূহল নিয়ে, হাসেম মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে। লাইব্রেরিয়ান একটা মোটা আকাশী নীল রঙের বই বের তাকে দিলেন। ‘এইযে তোমার গল্প, হাসেম- পড়’।

হাসেম বইটা হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করে। পড়ে আর পৃষ্ঠা উল্টায়। পড়তে বেশি সময় লাগছে না। তার জীবনের আনন্দ, সাফল্য, দুঃখ-কষ্ট আর আফসোসের মুহূর্তগুলো নিয়ে কতো যে কথা লেখা রয়েছে বইতে তা সে বিশ্বাস করতে পারে না। চোখে পানি চলে আসে। সে দেখে যে জীবনে কতো অসংখ্য সুযোগ সে হেলায় হারিয়েছে, কতো স্বপ্ন তার অপূর্ণ রয়ে গেছে।‘

‘আমি এতো সময় নষ্ট করেছি!’ হাসেমের কণ্ঠ ফোঁপানোর মতো কাঁপে। ‘আমি এত ভীতু ছিলাম!’

লাইব্রেরিয়ান আদরের সাথে মাথা নাড়েন। ‘ভয় একটি শক্তিশালী ধ্বংসকারী। তবে এটাই তোমার গল্পের শেষ নয়।‘

হাসেম বিভ্রান্ত চোখে তাকায়। ‘কিন্তু পুরো বইতো পড়া শেষ।‘ হাসেম সাহস করে বলে।

লাইব্রেরিয়ান আবার হাসলেন এবং তাকে আরেকটা বই দিলেন। এই বইয়ে কিছু লেখা নেই। ‘এই নাও; এটা এক নতুন বই লেখার সুযোগ, নতুন করে শুরু করার প্রতীক; এই বইতে যা লিখবে এখানে তোমার জীবন তেমন করেই চলবে। তোমার পার্থিব জীবন হয়তো শেষ হয়েছে, তবে তোমার অবিরাম যাত্রা চলতেই থাকবে।’

বইটা হাতে ধরে হাসেমের হাত কাঁপে।

লাইব্রেরিয়ান তার কাঁধে হাত রেখে বলেন- ‘হ্যাঁ, ভয় ত্যাগ করে লেখা শুরু করো- মুক্ত মনে তোমার গল্প নতুন করে লেখ।’

বৃহস্পতিবার, ০৪ জুলাই ২০২৪ , ২০ আষাড় ১৪৩১ ২৬ জ্বিলহজ্ব ১৪৪৫

কথোপকথন ইকরাম কবীর

নাবিক ও বাতাস

image

ক্যাপ্টেন ইলিয়াস তার জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে আছেন। তাকিয়ে আছেন বিশাল, কর্কশ সমুদ্রের দিকে। বন্দরে পৌঁছুতে এখনও প্রায় দশদিন বাকি। চারিপাশে দিগন্তজোড়া পানিরাশি। আকাশের সাথে মিশে অবিচ্ছেদ্য হয়ে গেছে। খেই পাওয়া যায় না। কখনোই পানি আর দিগন্তের সীমারেখা ছুঁতে পারেননি তিনি। ওটা না ছোঁয়া পর্যন্ত ইলিয়াসের একাকীত্ব ঘুচবে না। ঠিক সেই মুহূর্তে তিনি বুঝতে পারেন বাতাস তার সবসময়ের সঙ্গী। তার চারপাশে নাচে; কখনও ফিসফিসানির মতো, কখনও কড়াৎ-কড়াৎ শব্দে, কখনও গড়ড়-গড়ড় করে তার সাথে কথা বলে চলেছে। কতোবার মরতে মরতে বেঁচে গেছেন এই বাতাসের জন্যে। বাতাসের সাথে এক আত্মিক, সান্ত¡নাদায়ক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে তার।

ক্যাপ্টেন বাতাসের কাছে জানতে চান- ‘তুমি আমার সাথে কথা বলো কেন?’

‘আমি যে একা’, বাতাস উত্তর দেয়। বাতাসের কণ্ঠ ইলিয়াসের গালে একটা চুম্বনের ছোঁয়ার মতো মনে হয়। ‘আমি সংযোগ খুঁজি, ক্যাপ্টেন’, বাতাস বলে।

ইলিয়াস খুশি হন, তবে অবিশ্বাসের সাথে একটু দুঃখ-দুঃখ ভাব নিয়ে বলেন, ‘তাই তুমি আমাকে বেছে নিলে? অশান্ত এই সাগরের মাঝে ভেসে থাকা এক একা মানুষকে?’

বাতাস এক ধরনের স্বীকারোক্তি মেশানো কণ্ঠে বলে- ‘তোমার একাকীত্বে, আমি একজন আত্মা খুঁজে পেয়েছি; আর কোথাও পাচ্ছিলাম না; কেউ আমার সর্বব্যাপিতা বুঝতে পারে না; তুমি বুঝেছো; তাই তোমার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে।’

ইলিয়াস সব কাজের মাঝেও বাতাসের সাথে কথোপকথনের জন্য উৎসুকভাবে অপেক্ষা করে। তারা প্রাচীন সময়ের গল্প করে, আনন্দ ও দুঃখের কথা, এবং দুজনের অস্তিত্বেরই সাধারণ সৌন্দর্যের আলাপ করে।

ইলিয়াস ভাবেন- ‘কিন্তু কেন? আমায় বেছে নেয়ার কারণ কী? আমার মাঝে কেমন আত্মা আছে?’

বাতাস বলে- ‘তোমার কাছ থেকে আমি শিখি; তোমার ধৈর্য, তোমার ভয়, তোমার আশা- এসবই আমার অস্তিত্বকে পূর্ণ হতে শেখায়।’

ইলিয়াস কথাগুলো বোঝেন না তবে এই কথোপকথনে একাকিত্বে গ্রাস হয়ে যাওয়া তার অস্তিত্ব কিছুটা হলেও সান্ত্বনা পায়। সমুদ্রাকার এই কারাগারে বাতাসের সাথে এই সংলাপ ইলিয়াসের জন্য উজ্জ্বল ছবির ক্যানভাসে পরিণত হয়।

এক রাতে, অসংখ্য তারার চাদরের নিচে ডেকে দাঁড়িয়ে ইলিয়াস বাতাসকে প্রশ্ন করেন- ‘তুমি কি কখনো আমায় ছেড়ে যাবে?’

বাতাস নিশ্চিত করে- ‘আমি এক স্থির অস্তিত্ব, ইলিয়াস; তোমার যে কোনো নীরবতায়ও আমি তোমার সাথে আছি, থাকবো।’

এভাবেই বাতাস আর ইলিয়াসের মধ্যে একটা অদৃশ্য সুতোর বুনন দিয়ে অস্তিত্বের বন্ধন তৈরি হয়। গহীন সমুদ্র থেকে নাবিক ইলিয়াস পৃথিবীর কাছে ফিরে আসেন। বন্দরে ফিরে সে আবিষ্কার করেন যে বাতাসের সেই ফিসফিসানি তাকে অনুসরণ করছে। সে বাতাসের সাথে তার অদৃশ্য সংযোগটা তিনি বুঝতে পারেন।

চিঠি

নিলুফার কাগজ-কলম হাতে নিয়ে টেবিলে বসে আছে। কাগজের উপর তার হাত থির-থির করে কাঁপছে। কলমটা অনেক ভারি লাগছে, শব্দগুলো কোথায় যেন আটকে আছে। সাদা পাতাটার দিকে তাকিয়ে হৃদয়ের ভার সে অনুভব করে। কিন্তু তার না বলা কথাগুলোর ওজন আরও অনেক বেশি। কথাগুলো বলতেই হবে।

‘মা আয়েশা’, নিলুফার লিখতে শুরু করে। তবে থেমে যায়; চোখের কোণে পানি জমে ওঠে। সে গভীর কয়েকটা শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলায় এবং আবার লিখতে শুরু করে।

‘আমি তোমাকে প্রতিদিন মিস করি। তোমার হাসির চ্ছটা ছাড়া বাড়িটা এতো ঠা-া তা আমি আগে বুঝিনি। ইচ্ছে করে তোমাকে আরেকবার জড়িয়ে ধরতে, যদি বলতে পারতাম তোমায় কতটা ভালোবাসি। তুমি কেমন আছো, মা? শান্তিতে আছো তো? অনেক ভালোবাসা নিও। ইতি, তোমারই মা।’

নিলুফার চিঠিটা ভাঁজ করে, খামে ঢুকিয়ে, টেকনিশিয়ানের হাতে তুলে দেয়।

‘তুমি নিশ্চিত এটা কাজ করবে?’ সে জানতে চায়। চোখে-মুখে অনিশ্চয়তা।

টেকনিশিয়ান মাথা নেড়ে বলে- ‘হ্যাঁ, নিলুফার আপা; উত্তরটা এক সাত দিনের মধ্যেই পাবেন’।

সপ্তাহের প্রতিটা দিন একেকটা জীবনকালের মতো মনে হয় নিলুফারের কাছে। সে ঘরের মেঝেতে সারাদিন পায়চারি করে

আর মনের মধ্যে আয়েশার স্মৃতি জলপ্রপাতের মতো বেজেই চলে।

চিঠিটা আসে। নিলুফার কাঁপা হাতে খামটা খোলে। সেখানে লেখা আছে- ‘মা, আমিও তোমাকে মিস করি। আমি শান্তিতে আছি; খুব ভালো জায়গায় আছি; তুমি একেবারেই চিন্তা কোরো না। মনে রেখ, আমি সবসময় তোমাকে ভালবাসবো। নিজের খেয়াল রেখো। ভালোবাসা নিও। ইতি, তোমারই মেয়ে- আয়েশা।‘

নিলুফার কাঁদে; অনেক কাঁদে। কান্না শেষে ঠোঁটের কোণে একটা স্মিত মিষ্টি হাসিও ফুটে ওঠে। চিঠিটা তার আহত মানসে প্রচ- খরার পর মুষলধারে বৃষ্টির মতো মনে হয়। কিন্তু বিষয়টা অদ্ভুত লাগে। এতো নিখুঁত হয় কী করে- অতিপ্রাকৃতভাবে নিখুঁত।

সে তার বন্ধু মেহেরকে জিজ্ঞাসা করে- ‘তোমার কি মনে হয়? এ কি সত্যিই আমার আয়েশা?’

‘কেন নয়, বলতো? সন্দেহ হচ্ছে কেন?’ মেহের উত্তর দেয়। ‘তুমি তার কাছ থেকে ভালোবাসা মেশানো উত্তর পেয়েছ, তাই না? তাহলে আর চিন্তা কিসের?’

‘তবে এটা যদি সত্যি না হয়? যদি এটা কেবল... একটা প্রযুক্তির তৈরি উত্তর হয়?’ নিলুফারের কণ্ঠে অনিশ্চয়তা।

মেহের তার কাঁধে হাত রাখে- ‘এ তুমি কী বলছো? চিঠির কথাগুলো তো তোমায় শান্তি দিয়েছে; দেয়নি?’

নিলুফার মাথা নেড়ে সায় দেয়, তবে তার মনে সন্দেহ রয়েই যায়।

সে চিঠিটার দিকে তাকিয়ে থাকে। সত্য ও অস্পষ্ট সত্যের এক দোলা তার মনে ঘুরপাক খায়। তবে একটা বিষয় তার হৃদয় ছুঁয়ে যায় এবং এক বাস্তবতা ও মরীচিকা তাকে অন্য রকম শান্তি দেয়।

রাতে, নিজের ঘরের নিস্তব্ধতায়, নিলুফার মৃত মেয়ের উদ্দেশ্যে বলে- ‘মা, আয়েশা- এই চিঠি যদি সত্যিই তোমার হয়, আমি আশা করি তুমি জানো যে এটা আমার জন্য কতটা প্রয়োজন ছিল; আর যদি নাও হয়... তবুও আমি বিশ্বাস করি এটা তোমারই।‘

নিলুফার চিঠিটা ড্রয়ারে রেখে দিয়ে ধীরে ধীরে তা বন্ধ করে; আর কখনও ড্রয়ারটা খুলবে না, যেন তার আত্মার একটি অংশ সিল-গালা করে রাখছে। এই প্রযুক্তিটা তাকে এক নিমেষের জন্যে একটা বন্ধন যুগিয়েছে, তবে একটি অনন্ত অনিশ্চয়তার সাথে লড়তে পথে নামিয়ে দিচ্ছে।

লাইব্রেরি

আবদুল হাসেম চোখ খুলে দেখল যে সে একটা ধু-ধু লাইব্রেরিতে বসে আছে। যেদিকে চোখ যায় শুধু শেলফ আর শেলফ; দশদিকে এতো বই যে তার কিনারা নেই। নানা আকারের আর রঙের বইয়ে পূর্ণ। একটি নরম, সোনালি আলো পুরো স্থানটাকে আলোকিত করে রেখেছে। এই আলোটায় তার মনে শান্তি এলো।

‘এ আমি কোথায় এসেছি!’ হতবাক হয়ে সে ভাবে।

‘তোমাকে আত্মাদের লাইব্রেরিতে আনা হয়েছে,’ একটা কোমল কণ্ঠস্বরের কাছ থেকে উত্তর এলো।

হাসেম ঘুরে দেখল একজন বৃদ্ধ লাইব্রেরিয়ান, দয়া ভরা চোখ আর শান্ত হাসি নিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসছেন। ‘আপনিই কী সেই?’ হাসেম চোখে-মুখে অবিশ্বাস নিয়ে জানতে চায়।

‘হ্যাঁ, হাসেম; আমিই সেই’। লাইব্রেরিয়ান মৃদু হাসলেন। ‘ভাবলাম আমার এই রূপটা তোমার জন্য শান্তিপূর্ণ হবে, তাই এই বেশে এলাম।’

হাসেম আবার চারপাশে তাকায়; এখনও ধাতস্থ হতে পারেনি। ‘আমি এখন কী করবো? আমার কতোটা শাস্তি হবে?’

লাইব্রেরিয়ান চারপাশের সব শেলফগুলোর দিকে ইঙ্গিত করলেন। ‘এই যে বইগুলো দেখছো; প্রতিটা বই এক-একটা মানুষের জীবনের কাহিনী। তুমি কি তোমারটা দেখতে চাও? পড়তে চাও?’

একটু দ্বিধা আর কৌতূহল নিয়ে, হাসেম মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে। লাইব্রেরিয়ান একটা মোটা আকাশী নীল রঙের বই বের তাকে দিলেন। ‘এইযে তোমার গল্প, হাসেম- পড়’।

হাসেম বইটা হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করে। পড়ে আর পৃষ্ঠা উল্টায়। পড়তে বেশি সময় লাগছে না। তার জীবনের আনন্দ, সাফল্য, দুঃখ-কষ্ট আর আফসোসের মুহূর্তগুলো নিয়ে কতো যে কথা লেখা রয়েছে বইতে তা সে বিশ্বাস করতে পারে না। চোখে পানি চলে আসে। সে দেখে যে জীবনে কতো অসংখ্য সুযোগ সে হেলায় হারিয়েছে, কতো স্বপ্ন তার অপূর্ণ রয়ে গেছে।‘

‘আমি এতো সময় নষ্ট করেছি!’ হাসেমের কণ্ঠ ফোঁপানোর মতো কাঁপে। ‘আমি এত ভীতু ছিলাম!’

লাইব্রেরিয়ান আদরের সাথে মাথা নাড়েন। ‘ভয় একটি শক্তিশালী ধ্বংসকারী। তবে এটাই তোমার গল্পের শেষ নয়।‘

হাসেম বিভ্রান্ত চোখে তাকায়। ‘কিন্তু পুরো বইতো পড়া শেষ।‘ হাসেম সাহস করে বলে।

লাইব্রেরিয়ান আবার হাসলেন এবং তাকে আরেকটা বই দিলেন। এই বইয়ে কিছু লেখা নেই। ‘এই নাও; এটা এক নতুন বই লেখার সুযোগ, নতুন করে শুরু করার প্রতীক; এই বইতে যা লিখবে এখানে তোমার জীবন তেমন করেই চলবে। তোমার পার্থিব জীবন হয়তো শেষ হয়েছে, তবে তোমার অবিরাম যাত্রা চলতেই থাকবে।’

বইটা হাতে ধরে হাসেমের হাত কাঁপে।

লাইব্রেরিয়ান তার কাঁধে হাত রেখে বলেন- ‘হ্যাঁ, ভয় ত্যাগ করে লেখা শুরু করো- মুক্ত মনে তোমার গল্প নতুন করে লেখ।’