সাময়িকী কবিতা

বাঙালি মন

শামস আল মমীন

ছেলেমেয়ে বড় হয়েছে।

বাবা-মা’র চোখ বাঁচিয়ে ওরাও একটা

ছক কাটে জীবনের; যা আমরা

বুঝতে পারি না কিম্বা এও হতে পারে আমাদের চোখকে

তা এড়িয়ে যায়। ওদের কেউ কেউ মহল্লার মোড়ে প্রায়শ

জটলা পাকায়। আমাকে দেখে অন্য পথে হাঁটে...

এই ভালোবাসা হৃদয়ে থেকে যায়।

ওদের মুখগুলো কেমন মায়ামাখা, এবং বাগান থেকে

সদ্য ছেঁড়া আপেল আর আঙ্গুরের মতই সতেজ।

এ বয়সে ওদের কাছে অন্য কিছুর চেয়ে প্রেমই প্রিয়।

ওরাও স্বপ্ন দেখে, নিজেদের মতো করে জীবন আঁকে।

পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে যায়...

এক চিলতে হাসি দিয়ে ফের পথ চলি।

কারো কারো জীবন প্রেম-বিষে বিষময়,

দিনশেষে, আমরা কিন্তু সবকিছু দেখেও

না দেখার ভান করি।

ফিরে যাও বৈশাখ

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া

তোমার রূপের দেমাগে পুড়ে খাক যত পথ-প্রান্তর

সবুজে গরবিনী দেশ হয়ে গেছে ধুধু সাহারা

সূর্যের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে তোমার উদ্যত অহং

পুড়িয়ে মারছে মাটি ও মাটিমাখা মানুষের সংকল্পকে

যে রূপের মাঝে কল্যাণ নেই সে রূপের প্রদর্শনী

তোমার দেউলিয়াপনাকে প্রজ্ঞাপিত করে।

ফাগুনকে ঈর্ষা করে তুমি আনো দাহ

মলয়কে শুষে নিয়ে ছেড়ে দাও মরুর লু হাওয়া।

তোমার কৃষ্ণচূড়া নরকের অনলের চেয়েও দাহ্য

পাদপের মূলে তুমি পাবকের লাভা ঢালো

মৃত্তিকাকে অস্থিচর্মসার করে তোমার দাপট দেখাও

তোমাকে কাছে পেয়ে নরকও শ্রেয় ভেবে সান্ত্বনা খুঁজি।

যারা মরু বলে এতকাল মারুতের কাছে কৃপা চাইতো

তারা আজ বরুণকে বন্দী করে উৎসবে দিশেহারা

সমুদ্রের নিত্য প্রণয়ে যে বাষ্প উদগীরণ করে পবনে

সে আজ নুলো ভিখিরি হয়ে তোমার প্রহারে প্রতিবন্ধী

তোমার কারণে আদালতে ঠাঁই নিয়েছে শিক্ষা

অথচ তুমি অগ্নিস্নানে শুচি হয়ে লহনার রূপে বিভোর

কত প্রাণ নিষ্প্রাণ হলে তোমার নৈবেদ্য পূর্ণ হবে বলো?

তুমি কি জানো না, মানুষের পৃথিবীতে তুমি এক

ক্ষণায়ু নটী বিশেষ, যার কাজ অতীতকে বিদেয় করা!

বৈশাখ, পায়ে পড়ে বলি, ফিরে যাও তুমি আপন অন্দরে

ফিরিয়ে দিয়ে যাও এ মাটির, এ বায়ুর, এ জলের

পত্র ও পল্লবের আজন্ম প্রশান্তি, আবহমান স্বস্তির স্বাদ।

প্রহসন

মুশাররাত

একদিন যারা ছিলো মানুষের সন্তান

আজ তারা মিশে গেছে প্রকৃতির সাথে

প্রেমিকের সাথে ভাগ করে নিয়েছে

গোলাপি চাঁদের আলো

জঠরের স্বচ্ছ পানিতে সাঁতার কাটার মুহূর্তগুলো

মুছে ফেলা হয়েছে প্রগাঢ় অনুভূতি থেকে

যে হাত একদিন শক্ত করে ধরা হয়েছিলো

হারিয়ে যাবার ভয়ে

আজ স্বেচ্ছায় হারাবার লোভে

ছাড়িয়ে নিয়েছে সে হাত

স্বচ্ছন্দে কাটা হয়েছে সব বাঁধন

আলাদা জগতে পৃথক সংসার

রোমান্টিক সাহচর্যে

তারা ধারণ করবে আরেকটি প্রাণ,

আষ্টেপৃষ্ঠে তারা উপলব্ধি করবে

মায়াময় পৃথিবীতে কাউকে ভালোবাসা

কতটা প্রহসন

অতঃপর, খবরের শিরোনাম

বন্ধ ফ্ল্যাট থেকে নিঃসঙ্গ বৃদ্ধের গলিত লাশ উদ্ধার।

বিভ্রম

তরুন ইউসুফ

জয়পুরহাটের কথা উঠলেই

চলে আসে আক্কেলপুর

তার নিভৃতে বালিকা উচ্চবিদ্যালয়,

আমি কখনো সেখানে যাইনি

আক্কেলপুরও আমার কাছে আসেনি

তুমিও পড়োনি সেখানে

তবুও জয়পুরহাটের কথা আসলেই

চলে আসে আক্কেলপুর

তার নিভৃতে বালিকা উচ্চবিদ্যালয়

সেখানে এক পুকুর ঘাটে

এক কিশোরী

পা ডুবিয়ে কাঁদছে!

খাণ্ডবদাহনের পরও

মণিপদ্ম দত্ত

খাণ্ডবদাহনের পর

কিছু কিছু বৃক্ষ-আত্মা

ঢুকে গেছে

একদম বুকের ভিতর

কিছু মানুষের।

বটের ঝুরির মতো

সেই বৃক্ষ ধারা

শিকড় চারিয়ে দিয়েছে

নিঃশব্দ প্রহরা।

এবম্বিধ বৃক্ষ-মানবেরা

আজও রাত্রি জাগে

আমাদের মাথার উপরে

অবশ্যই।

নাহলে এই ধ্বস্ত ধরিত্রী

কোন মন্ত্রে বাঁচে এতকাল

নিদাঘ ও নিস্ব সন্তাপে!

চরাচর ঘিরে

মৃতের শহরে

এই সব ছদ্মবেশী গাছ

প্রাণবায়ু দিয়ে চলে

তুমি শুধু রোদ হও

তানজিনা ফেরদৌস

তুমি শুধু রোদ হও

আমি নীল অপরাজিতা হয়ে

সৌন্দর্যের আধিক্যে উত্তীর্ণ

হবো বারবার।

তুমি যদি নদী হও

প্রণয়ের ঢেউ হয়ে

ও হৃদয় করবো উজার।

দূর আকাশের নীল হও যদি

আমি হলাম না হয় গুমোট মেঘ

তোমায় ছুঁতে না পেয়ে

রংধনু রঙে লিখবো আবেগ।

তুমি একদিন ঝরঝর বাদল হবে?

আমি সেদিন কদমফুল হয়ে ফুটবো,

বাদল হয়ে ঝরলেই ছুঁয়ে যেও আমায়।

দুর্ভিক্ষ-পীড়িত মন

সুমন বনিক

ডানা থাকলে আর উড়তে পারলেই

তাকে পাখি বলা সমীচীন নয়,

পাখির কণ্ঠে সুর আছে

সে-ই সুরেতে যাদু আছে

সে-যাদুতে মন মজে।

তাই, বাদুড়কে পাখি বলতে চাইনে;

তবুও তুমি বাদুড়কে

পাখির তকমা মেখে

তর্ক জুড়ে দিচ্ছো বারবার।

দেখো, পার্কের কোনায়

নারকেলগাছের মাথা ছুঁয়ে

কালের সূর্য তলিয়ে যাচ্ছে,

ধুলোওড়া আরও একটি বিবর্ণদিন

হারিয়ে গেল রিলেরেসের ট্যাক-থেকে।

আমাদের ভালোবাসামাখা দিনগুলো কী

ডাবের-খোসার মতো পড়ে থাকবে যত্রতত্র!

তারচে’ বরং মনের-খরা কাটিয়ে-

আমাদের মগজের জমিনে

শাদাকালো ফসলের চাষ করি,

শুভ্রতার আল-পথ ধরে হাঁটি।

বৃহস্পতিবার, ০৪ জুলাই ২০২৪ , ২০ আষাড় ১৪৩১ ২৬ জ্বিলহজ্ব ১৪৪৫

সাময়িকী কবিতা

বাঙালি মন

শামস আল মমীন

ছেলেমেয়ে বড় হয়েছে।

বাবা-মা’র চোখ বাঁচিয়ে ওরাও একটা

ছক কাটে জীবনের; যা আমরা

বুঝতে পারি না কিম্বা এও হতে পারে আমাদের চোখকে

তা এড়িয়ে যায়। ওদের কেউ কেউ মহল্লার মোড়ে প্রায়শ

জটলা পাকায়। আমাকে দেখে অন্য পথে হাঁটে...

এই ভালোবাসা হৃদয়ে থেকে যায়।

ওদের মুখগুলো কেমন মায়ামাখা, এবং বাগান থেকে

সদ্য ছেঁড়া আপেল আর আঙ্গুরের মতই সতেজ।

এ বয়সে ওদের কাছে অন্য কিছুর চেয়ে প্রেমই প্রিয়।

ওরাও স্বপ্ন দেখে, নিজেদের মতো করে জীবন আঁকে।

পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে যায়...

এক চিলতে হাসি দিয়ে ফের পথ চলি।

কারো কারো জীবন প্রেম-বিষে বিষময়,

দিনশেষে, আমরা কিন্তু সবকিছু দেখেও

না দেখার ভান করি।

ফিরে যাও বৈশাখ

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া

তোমার রূপের দেমাগে পুড়ে খাক যত পথ-প্রান্তর

সবুজে গরবিনী দেশ হয়ে গেছে ধুধু সাহারা

সূর্যের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে তোমার উদ্যত অহং

পুড়িয়ে মারছে মাটি ও মাটিমাখা মানুষের সংকল্পকে

যে রূপের মাঝে কল্যাণ নেই সে রূপের প্রদর্শনী

তোমার দেউলিয়াপনাকে প্রজ্ঞাপিত করে।

ফাগুনকে ঈর্ষা করে তুমি আনো দাহ

মলয়কে শুষে নিয়ে ছেড়ে দাও মরুর লু হাওয়া।

তোমার কৃষ্ণচূড়া নরকের অনলের চেয়েও দাহ্য

পাদপের মূলে তুমি পাবকের লাভা ঢালো

মৃত্তিকাকে অস্থিচর্মসার করে তোমার দাপট দেখাও

তোমাকে কাছে পেয়ে নরকও শ্রেয় ভেবে সান্ত্বনা খুঁজি।

যারা মরু বলে এতকাল মারুতের কাছে কৃপা চাইতো

তারা আজ বরুণকে বন্দী করে উৎসবে দিশেহারা

সমুদ্রের নিত্য প্রণয়ে যে বাষ্প উদগীরণ করে পবনে

সে আজ নুলো ভিখিরি হয়ে তোমার প্রহারে প্রতিবন্ধী

তোমার কারণে আদালতে ঠাঁই নিয়েছে শিক্ষা

অথচ তুমি অগ্নিস্নানে শুচি হয়ে লহনার রূপে বিভোর

কত প্রাণ নিষ্প্রাণ হলে তোমার নৈবেদ্য পূর্ণ হবে বলো?

তুমি কি জানো না, মানুষের পৃথিবীতে তুমি এক

ক্ষণায়ু নটী বিশেষ, যার কাজ অতীতকে বিদেয় করা!

বৈশাখ, পায়ে পড়ে বলি, ফিরে যাও তুমি আপন অন্দরে

ফিরিয়ে দিয়ে যাও এ মাটির, এ বায়ুর, এ জলের

পত্র ও পল্লবের আজন্ম প্রশান্তি, আবহমান স্বস্তির স্বাদ।

প্রহসন

মুশাররাত

একদিন যারা ছিলো মানুষের সন্তান

আজ তারা মিশে গেছে প্রকৃতির সাথে

প্রেমিকের সাথে ভাগ করে নিয়েছে

গোলাপি চাঁদের আলো

জঠরের স্বচ্ছ পানিতে সাঁতার কাটার মুহূর্তগুলো

মুছে ফেলা হয়েছে প্রগাঢ় অনুভূতি থেকে

যে হাত একদিন শক্ত করে ধরা হয়েছিলো

হারিয়ে যাবার ভয়ে

আজ স্বেচ্ছায় হারাবার লোভে

ছাড়িয়ে নিয়েছে সে হাত

স্বচ্ছন্দে কাটা হয়েছে সব বাঁধন

আলাদা জগতে পৃথক সংসার

রোমান্টিক সাহচর্যে

তারা ধারণ করবে আরেকটি প্রাণ,

আষ্টেপৃষ্ঠে তারা উপলব্ধি করবে

মায়াময় পৃথিবীতে কাউকে ভালোবাসা

কতটা প্রহসন

অতঃপর, খবরের শিরোনাম

বন্ধ ফ্ল্যাট থেকে নিঃসঙ্গ বৃদ্ধের গলিত লাশ উদ্ধার।

বিভ্রম

তরুন ইউসুফ

জয়পুরহাটের কথা উঠলেই

চলে আসে আক্কেলপুর

তার নিভৃতে বালিকা উচ্চবিদ্যালয়,

আমি কখনো সেখানে যাইনি

আক্কেলপুরও আমার কাছে আসেনি

তুমিও পড়োনি সেখানে

তবুও জয়পুরহাটের কথা আসলেই

চলে আসে আক্কেলপুর

তার নিভৃতে বালিকা উচ্চবিদ্যালয়

সেখানে এক পুকুর ঘাটে

এক কিশোরী

পা ডুবিয়ে কাঁদছে!

খাণ্ডবদাহনের পরও

মণিপদ্ম দত্ত

খাণ্ডবদাহনের পর

কিছু কিছু বৃক্ষ-আত্মা

ঢুকে গেছে

একদম বুকের ভিতর

কিছু মানুষের।

বটের ঝুরির মতো

সেই বৃক্ষ ধারা

শিকড় চারিয়ে দিয়েছে

নিঃশব্দ প্রহরা।

এবম্বিধ বৃক্ষ-মানবেরা

আজও রাত্রি জাগে

আমাদের মাথার উপরে

অবশ্যই।

নাহলে এই ধ্বস্ত ধরিত্রী

কোন মন্ত্রে বাঁচে এতকাল

নিদাঘ ও নিস্ব সন্তাপে!

চরাচর ঘিরে

মৃতের শহরে

এই সব ছদ্মবেশী গাছ

প্রাণবায়ু দিয়ে চলে

তুমি শুধু রোদ হও

তানজিনা ফেরদৌস

তুমি শুধু রোদ হও

আমি নীল অপরাজিতা হয়ে

সৌন্দর্যের আধিক্যে উত্তীর্ণ

হবো বারবার।

তুমি যদি নদী হও

প্রণয়ের ঢেউ হয়ে

ও হৃদয় করবো উজার।

দূর আকাশের নীল হও যদি

আমি হলাম না হয় গুমোট মেঘ

তোমায় ছুঁতে না পেয়ে

রংধনু রঙে লিখবো আবেগ।

তুমি একদিন ঝরঝর বাদল হবে?

আমি সেদিন কদমফুল হয়ে ফুটবো,

বাদল হয়ে ঝরলেই ছুঁয়ে যেও আমায়।

দুর্ভিক্ষ-পীড়িত মন

সুমন বনিক

ডানা থাকলে আর উড়তে পারলেই

তাকে পাখি বলা সমীচীন নয়,

পাখির কণ্ঠে সুর আছে

সে-ই সুরেতে যাদু আছে

সে-যাদুতে মন মজে।

তাই, বাদুড়কে পাখি বলতে চাইনে;

তবুও তুমি বাদুড়কে

পাখির তকমা মেখে

তর্ক জুড়ে দিচ্ছো বারবার।

দেখো, পার্কের কোনায়

নারকেলগাছের মাথা ছুঁয়ে

কালের সূর্য তলিয়ে যাচ্ছে,

ধুলোওড়া আরও একটি বিবর্ণদিন

হারিয়ে গেল রিলেরেসের ট্যাক-থেকে।

আমাদের ভালোবাসামাখা দিনগুলো কী

ডাবের-খোসার মতো পড়ে থাকবে যত্রতত্র!

তারচে’ বরং মনের-খরা কাটিয়ে-

আমাদের মগজের জমিনে

শাদাকালো ফসলের চাষ করি,

শুভ্রতার আল-পথ ধরে হাঁটি।