‘বিভ্রমের মগ্নতা’ গ্রন্থের জীবন ঘনিষ্ঠতা

ওবায়েদ আকাশ

বাংলা কথাসাহিত্যে দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচিত হচ্ছে এবং তা অমীমাংসিতই থেকে গেছে যে, ছোটগল্পে কাহিনী বা গল্প থাকাটা কতটা জরুরি। এ নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে অনেকদূর জল ঘোলাও হয়েছে। যেমন শিল্পের বেলায় কলাকৈবল্যবাদী ও জীবনবাদী শিল্প নিয়ে এ ধরনের আলোচনা হয়। কেউ প্রথম পক্ষে আবার কেউ দ্বিতীয় পক্ষে। কিন্তু শিল্প তার নিজস্ব গতিতে ছুটছে। ঠিক একইভাবে ছোটগল্প তার সময় ও ¯্রষ্টাকে সাথে নিয়ে ছুটছে তার গন্তব্যে। কবি ও কথাসাহিত্যিক হাইকেল হাশমীর সম্প্রতি প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘বিভ্রমের মগ্নতা’ পাঠ করে অন্তত একটি বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এই গল্পকার গল্পহীন বা কাহিনীহীন গল্পকে গল্প মনে করেন না। কারণ তার প্রতিটি গল্পই নাটকীয় সব কাহিনী ও গল্পের ঠাসবুনট।

‘বিভ্রমের মগ্নতা’ লেখকের প্রথম মৌলিক গল্পগ্রন্থ। গ্রন্থে ১২টি ছোটগল্প, ১০টি অনুগল্প এবং আটটি ফ্ল্যাশ ফিকশন রয়েছে।

‘বিভ্রমের মগ্নতা’ পাঠে মনে হবে লেখকের ভাষা সাবলীল ও গল্পের ঘটনাগুলো পাঠককে এর পরের অধ্যায় সম্পর্কে আগ্রহী করে তুলবে। প্রতিটি গল্পই আমাদের সমাজে ঘটে যাওয়া সব বিস্ময়কর ঘটনার সমন্বয়।

একইভাবে লেখকের অনুগল্প ও ফ্ল্যাশ ফিকশনগুলোও দারুণ আগ্রহোদ্দীপক। প্রতিটি অধ্যায় পাঠকের পাঠতৃষ্ণা বাড়াবে সন্দেহ নেই।

গ্রন্থের ‘বিভ্রমের মগ্নতা’ বা নামগল্পটি লেখা হয়েছে নাম পুরুষে। গল্পের মুখ্য চরিত্র একজন বয়স্ক ব্যক্তি। সে একদিন বাসা থেকে বেরিয়ে তার অফিসে যাবার কথা ভুলে যায়। সে এখানে কী করছে সেটাও ভুলে যায়। সে ভুলে গেছে যে সে কোথায় যাবার জন্য বাসা থেকে বেরিয়েছে। এই বিভ্রমের মধ্যে তার ছেলে এসে বাবার এ অবস্থা দেখে ফেলে ও তাকে অফিসে যাবার জন্য একটি রিকশা ঠিক করে দেয়। সে অফিসে পৌঁছে তার পাশে বসা সহকর্মীকে ভুল নামে সম্বোধন করে তারিখ জিগ্যেস করে। তার সহকর্মী অবাক বিস্ময়ে বলে, “স্যার আমার নাম আলিম নয়, আমি কুদ্দুস”।

তখন বিভ্রান্ত এই কর্মকর্তা মনে করে তার আসলে একটা দীর্ঘ ছুটির দরকার। তিনি ছুটি নেন। রাতের বেলা স্বপ্ন দেখেন তিনি অদ্ভুত একটা জায়গায় পৌঁছেছেন। তিনি বরফের মতো একটা সাদা মেঘের উপর দিয়ে দৌড়াচ্ছেন। কিন্তু বুঝতে পারছেন না কোথায় এসেছেন। শুভ্রবসনা এক ব্যক্তিকে জিগ্যেস করলেন তিনি কোথায় এসছেন। তিনি বললেন-

“এখন তুমি এমন এক জায়গায় এসে গেছো, যেখানে কিছু নেই, যেখানে কোনো স্মৃতি নেই, যেখানে তুমি নেই, যেখানে আমি নেই” [পৃ: ৩১]

এরপর লোকটিকে ডাক্তারের কাছে নেয়া হলে ডাক্তার তাকে অন্যান্য ওষুধের পাশাপাশি ঘুমের ওষুধও দেন- যা খেয়ে তিনি রাতে ঘুমিয়ে পড়েন। এবং ঘুমের মধ্যে ম্যাসিভ হার্ট এটাকে তিনি মারা যান। গল্পকার এখানে ঘটনা পরম্পরায় বলেন লোকটি বেঁচে থাকলে হয়তো বলতে পারত অন্যান্য সব কিছু ভুলে যাবার মতো নিশ^াস নিতেও সে ভুলে গিয়েছিল।

গল্পের কাহিনীর অভিনবত্ব ও বাস্তবতা পাঠককে অভিভূত করবে। আমাদের ভিতরে এমন ডিমেনশিয়া আক্রান্ত বৃদ্ধদের সংখ্যা প্রচুর। যারা শেষ বয়সে এসে সব কিছু ভুলে যেতে থাকে ও তাদের করুণ পরিণতি হয়।

গ্রন্থের প্রথম গল্প ‘ব্যর্থ চেষ্টা’। এ গল্পটিও নামপুরুষে লিখেছেন গল্পকার। এ গল্পে অফিসের এক বিবাহিত সিনিয়র কর্মী তার এক জুনিয়র মেয়ে সহকর্মীর প্রেমে পড়ে। দুজনের পরকীয়া সম্পর্ক অনেক দূর গড়িয়ে যায়। মেয়েটি তার সহকর্মীকে বিয়ের জন্য তাগাদা দিতে থাকে। এবং তার বউকে তালাক দিয়ে তাকে বিয়ে করতে বলে। কিন্তু তার সহকর্মী বলে তাদের সম্পর্ক দীর্ঘ বিশ বছরের, এবং তারা ভালবেসে বিয়ে করেছে। তাকে তালাক দেয়া সম্ভব নয়। তবে সে অন্য ব্যবস্থা করবে বলে জানায়। অন্য ব্যবস্থা বলতে অনেক ভেবে লোকটি তার স্ত্রীকে হত্যার পরিকল্পনা করে। প্রথমে সে গু-া ভাড়া করে স্ত্রীকে হত্যা করতে গিয়ে নিজেই কিলারের গুলিতে আহত হয়। দ্বিতীয়বার বাসের নিচে স্ত্রীকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে গিয়ে নিজেই বাসের ধাক্কায় আহত হয়। আর শেষবার লঞ্চ থেকে ফেলে দিয়ে স্ত্রীকে হত্যা করতে গিয়ে নিজেই পানিতে ডুবে মারা যায়।

আমাদের সমাজের বাস্তব চিত্র এটি। এমন কত না ঘটনা আমরা দেখতে পাই! শিক্ষণীয় বিষয় হলো- মানুষ আসলে নিজের পাতা ফাঁদে একদিন নিজেই পা দিয়ে আটকে যায়। আবার পরকীয়া যে আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে কীভাবে অস্থির করে তুলছে, তারও একটি দিব্য উদাহরণ এটি। গল্পটি এতটা অসাধারণ ঘটনা সমন্বয়ে সৃষ্ট যে, হাইকেল হাশমীর ছোটগল্প যারা ইতোপূর্বে পাঠ করেননি, তারাও এ গল্পের ভিতর দিয়ে তার গল্পের চিরদিনের পাঠক হয়ে যেতে পারেন। এছাড়া গল্পকারের গ্রন্থভুক্ত আরো গল্প যেমন ভালো মানুষ, বৃদ্ধ প্রেম, অফিসে একদিন, মর্গের প্রেম, ত্রিভুজ, অপরিপূর্ণ প্রেম, প্রতারক, শূন্য থেকে শূন্য, সফল মানুষ- এগুলো পাঠককে গভীরভাবে ভাবাবে ও পাঠমগ্নতা দিবে।

হাইকেল হাশমীর অনুগল্পগুলোও সমাজের দর্পণ। প্রতিটি ছোটগল্পেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সব মেসেজ। গ্রন্থের ‘পিতা মাতা আর টমি’ গল্পে দেখিয়েছেন- ছেলেকে উন্নত পড়ালেখা শিখিয়ে আমেরিকা পাঠিয়েছেন পিতা-মাতা। সেখানে সুন্দর বাসা নিয়ে চাকচিক্যময় জীবনযাপন করছেন। তাদের পোষা কুকুর টমি তাদের অন্যতম ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু। একদিন পিতা-মাতা তার ছেলের বাসায় যায় লস এঞ্জেলেসে। তাদের ছেলে তাদের দেখে আনন্দিত হলেও, টমি তাদেরকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে না। এটা ছেলে উপলব্ধি করে তার বাবা-মাকে জানায় তারা যেন বেসমেন্টেই থাকেন, এবং উপরে না ওঠেন। কারণ টমি তাদেরকে পছন্দ করে না। মনোজগতের অবক্ষয় কতটা গভীরে পৌঁছালে নিজের পিতা-মাতার চেয়ে একটি কুকুরের গুরুত্ব বেশি হতে পারে- হাইকেল হাশমী তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেন।

ফ্ল্যাশ ফিকশন পর্বের লেখাগুলো একইভাবে আমাদের মানসিক স্তরে ধাক্কা দিয়ে যায়। সমাজের এক টোকাই চরিত্র, যে কিনা কারো চোখে চোর, কারো কাছে লুচ্চা, কারো কাছে হারামি বলে পরিচিত। কনডেন্স মিল্ক তার অনেক প্রিয়। সে টিএসসির চায়ের দোকান থেকে কনডেন্স মিল্কের কৌটা সংগ্রহ করে তা চেটেপুটে খায়। আর ভাবে, দোকাদারগুলো এতটাই কৃপণ যে, কৌটার দুধগুলো একেবারে নিংড়ে নিয়ে গেছে। খাবার মতো কিছু থাকে না। “সে ভাবে যখন তার অনেক টাকা হবে তখন সে রোজ এক কৌটা কনডেন্সড দুধ খাবে কিন্তু বেশ খানিকটা ছেড়ে দেবে যেন তার চাকররা তা খেতে পারে।” [আকাক্সক্ষা, ১১৫]

তিনটি পর্বে বিন্যস্ত হাইকেল হাশমীর গল্প, অনুগল্প ও ফ্ল্যাশ ফিকশনগুলো একই সঙ্গে যেমন জীবনঘনিষ্ঠ আবার অন্যদিকে এর শিল্পমানও প্রশ্নাতীত। বহুমুখী এই লেখকের প্রথম গল্পগ্রন্থ হিসেবে ‘বিভ্রমের মগ্নতা’কে উপেক্ষা করার উপায় নেই। বরং গ্রন্থপাঠে গল্পকারের পাঠকসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে ও তার কাছে পাঠকের আরও গল্পগ্রন্থের প্রত্যাশা থাকবে।

বিভ্রমের মগ্নতা : হাইকেল হাশমী। প্রকাশক: সৃজন, ঢাকা। প্রকাশকাল: অমর একুশে বইমেলা ২০২৪। প্রচ্ছদ: দেওয়ান আতিকুর রহমান। মূল্য ৩০০ টাকা।

বৃহস্পতিবার, ০৪ জুলাই ২০২৪ , ২০ আষাড় ১৪৩১ ২৬ জ্বিলহজ্ব ১৪৪৫

‘বিভ্রমের মগ্নতা’ গ্রন্থের জীবন ঘনিষ্ঠতা

ওবায়েদ আকাশ

image

বাংলা কথাসাহিত্যে দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচিত হচ্ছে এবং তা অমীমাংসিতই থেকে গেছে যে, ছোটগল্পে কাহিনী বা গল্প থাকাটা কতটা জরুরি। এ নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে অনেকদূর জল ঘোলাও হয়েছে। যেমন শিল্পের বেলায় কলাকৈবল্যবাদী ও জীবনবাদী শিল্প নিয়ে এ ধরনের আলোচনা হয়। কেউ প্রথম পক্ষে আবার কেউ দ্বিতীয় পক্ষে। কিন্তু শিল্প তার নিজস্ব গতিতে ছুটছে। ঠিক একইভাবে ছোটগল্প তার সময় ও ¯্রষ্টাকে সাথে নিয়ে ছুটছে তার গন্তব্যে। কবি ও কথাসাহিত্যিক হাইকেল হাশমীর সম্প্রতি প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘বিভ্রমের মগ্নতা’ পাঠ করে অন্তত একটি বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এই গল্পকার গল্পহীন বা কাহিনীহীন গল্পকে গল্প মনে করেন না। কারণ তার প্রতিটি গল্পই নাটকীয় সব কাহিনী ও গল্পের ঠাসবুনট।

‘বিভ্রমের মগ্নতা’ লেখকের প্রথম মৌলিক গল্পগ্রন্থ। গ্রন্থে ১২টি ছোটগল্প, ১০টি অনুগল্প এবং আটটি ফ্ল্যাশ ফিকশন রয়েছে।

‘বিভ্রমের মগ্নতা’ পাঠে মনে হবে লেখকের ভাষা সাবলীল ও গল্পের ঘটনাগুলো পাঠককে এর পরের অধ্যায় সম্পর্কে আগ্রহী করে তুলবে। প্রতিটি গল্পই আমাদের সমাজে ঘটে যাওয়া সব বিস্ময়কর ঘটনার সমন্বয়।

একইভাবে লেখকের অনুগল্প ও ফ্ল্যাশ ফিকশনগুলোও দারুণ আগ্রহোদ্দীপক। প্রতিটি অধ্যায় পাঠকের পাঠতৃষ্ণা বাড়াবে সন্দেহ নেই।

গ্রন্থের ‘বিভ্রমের মগ্নতা’ বা নামগল্পটি লেখা হয়েছে নাম পুরুষে। গল্পের মুখ্য চরিত্র একজন বয়স্ক ব্যক্তি। সে একদিন বাসা থেকে বেরিয়ে তার অফিসে যাবার কথা ভুলে যায়। সে এখানে কী করছে সেটাও ভুলে যায়। সে ভুলে গেছে যে সে কোথায় যাবার জন্য বাসা থেকে বেরিয়েছে। এই বিভ্রমের মধ্যে তার ছেলে এসে বাবার এ অবস্থা দেখে ফেলে ও তাকে অফিসে যাবার জন্য একটি রিকশা ঠিক করে দেয়। সে অফিসে পৌঁছে তার পাশে বসা সহকর্মীকে ভুল নামে সম্বোধন করে তারিখ জিগ্যেস করে। তার সহকর্মী অবাক বিস্ময়ে বলে, “স্যার আমার নাম আলিম নয়, আমি কুদ্দুস”।

তখন বিভ্রান্ত এই কর্মকর্তা মনে করে তার আসলে একটা দীর্ঘ ছুটির দরকার। তিনি ছুটি নেন। রাতের বেলা স্বপ্ন দেখেন তিনি অদ্ভুত একটা জায়গায় পৌঁছেছেন। তিনি বরফের মতো একটা সাদা মেঘের উপর দিয়ে দৌড়াচ্ছেন। কিন্তু বুঝতে পারছেন না কোথায় এসেছেন। শুভ্রবসনা এক ব্যক্তিকে জিগ্যেস করলেন তিনি কোথায় এসছেন। তিনি বললেন-

“এখন তুমি এমন এক জায়গায় এসে গেছো, যেখানে কিছু নেই, যেখানে কোনো স্মৃতি নেই, যেখানে তুমি নেই, যেখানে আমি নেই” [পৃ: ৩১]

এরপর লোকটিকে ডাক্তারের কাছে নেয়া হলে ডাক্তার তাকে অন্যান্য ওষুধের পাশাপাশি ঘুমের ওষুধও দেন- যা খেয়ে তিনি রাতে ঘুমিয়ে পড়েন। এবং ঘুমের মধ্যে ম্যাসিভ হার্ট এটাকে তিনি মারা যান। গল্পকার এখানে ঘটনা পরম্পরায় বলেন লোকটি বেঁচে থাকলে হয়তো বলতে পারত অন্যান্য সব কিছু ভুলে যাবার মতো নিশ^াস নিতেও সে ভুলে গিয়েছিল।

গল্পের কাহিনীর অভিনবত্ব ও বাস্তবতা পাঠককে অভিভূত করবে। আমাদের ভিতরে এমন ডিমেনশিয়া আক্রান্ত বৃদ্ধদের সংখ্যা প্রচুর। যারা শেষ বয়সে এসে সব কিছু ভুলে যেতে থাকে ও তাদের করুণ পরিণতি হয়।

গ্রন্থের প্রথম গল্প ‘ব্যর্থ চেষ্টা’। এ গল্পটিও নামপুরুষে লিখেছেন গল্পকার। এ গল্পে অফিসের এক বিবাহিত সিনিয়র কর্মী তার এক জুনিয়র মেয়ে সহকর্মীর প্রেমে পড়ে। দুজনের পরকীয়া সম্পর্ক অনেক দূর গড়িয়ে যায়। মেয়েটি তার সহকর্মীকে বিয়ের জন্য তাগাদা দিতে থাকে। এবং তার বউকে তালাক দিয়ে তাকে বিয়ে করতে বলে। কিন্তু তার সহকর্মী বলে তাদের সম্পর্ক দীর্ঘ বিশ বছরের, এবং তারা ভালবেসে বিয়ে করেছে। তাকে তালাক দেয়া সম্ভব নয়। তবে সে অন্য ব্যবস্থা করবে বলে জানায়। অন্য ব্যবস্থা বলতে অনেক ভেবে লোকটি তার স্ত্রীকে হত্যার পরিকল্পনা করে। প্রথমে সে গু-া ভাড়া করে স্ত্রীকে হত্যা করতে গিয়ে নিজেই কিলারের গুলিতে আহত হয়। দ্বিতীয়বার বাসের নিচে স্ত্রীকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে গিয়ে নিজেই বাসের ধাক্কায় আহত হয়। আর শেষবার লঞ্চ থেকে ফেলে দিয়ে স্ত্রীকে হত্যা করতে গিয়ে নিজেই পানিতে ডুবে মারা যায়।

আমাদের সমাজের বাস্তব চিত্র এটি। এমন কত না ঘটনা আমরা দেখতে পাই! শিক্ষণীয় বিষয় হলো- মানুষ আসলে নিজের পাতা ফাঁদে একদিন নিজেই পা দিয়ে আটকে যায়। আবার পরকীয়া যে আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে কীভাবে অস্থির করে তুলছে, তারও একটি দিব্য উদাহরণ এটি। গল্পটি এতটা অসাধারণ ঘটনা সমন্বয়ে সৃষ্ট যে, হাইকেল হাশমীর ছোটগল্প যারা ইতোপূর্বে পাঠ করেননি, তারাও এ গল্পের ভিতর দিয়ে তার গল্পের চিরদিনের পাঠক হয়ে যেতে পারেন। এছাড়া গল্পকারের গ্রন্থভুক্ত আরো গল্প যেমন ভালো মানুষ, বৃদ্ধ প্রেম, অফিসে একদিন, মর্গের প্রেম, ত্রিভুজ, অপরিপূর্ণ প্রেম, প্রতারক, শূন্য থেকে শূন্য, সফল মানুষ- এগুলো পাঠককে গভীরভাবে ভাবাবে ও পাঠমগ্নতা দিবে।

হাইকেল হাশমীর অনুগল্পগুলোও সমাজের দর্পণ। প্রতিটি ছোটগল্পেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সব মেসেজ। গ্রন্থের ‘পিতা মাতা আর টমি’ গল্পে দেখিয়েছেন- ছেলেকে উন্নত পড়ালেখা শিখিয়ে আমেরিকা পাঠিয়েছেন পিতা-মাতা। সেখানে সুন্দর বাসা নিয়ে চাকচিক্যময় জীবনযাপন করছেন। তাদের পোষা কুকুর টমি তাদের অন্যতম ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু। একদিন পিতা-মাতা তার ছেলের বাসায় যায় লস এঞ্জেলেসে। তাদের ছেলে তাদের দেখে আনন্দিত হলেও, টমি তাদেরকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে না। এটা ছেলে উপলব্ধি করে তার বাবা-মাকে জানায় তারা যেন বেসমেন্টেই থাকেন, এবং উপরে না ওঠেন। কারণ টমি তাদেরকে পছন্দ করে না। মনোজগতের অবক্ষয় কতটা গভীরে পৌঁছালে নিজের পিতা-মাতার চেয়ে একটি কুকুরের গুরুত্ব বেশি হতে পারে- হাইকেল হাশমী তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেন।

ফ্ল্যাশ ফিকশন পর্বের লেখাগুলো একইভাবে আমাদের মানসিক স্তরে ধাক্কা দিয়ে যায়। সমাজের এক টোকাই চরিত্র, যে কিনা কারো চোখে চোর, কারো কাছে লুচ্চা, কারো কাছে হারামি বলে পরিচিত। কনডেন্স মিল্ক তার অনেক প্রিয়। সে টিএসসির চায়ের দোকান থেকে কনডেন্স মিল্কের কৌটা সংগ্রহ করে তা চেটেপুটে খায়। আর ভাবে, দোকাদারগুলো এতটাই কৃপণ যে, কৌটার দুধগুলো একেবারে নিংড়ে নিয়ে গেছে। খাবার মতো কিছু থাকে না। “সে ভাবে যখন তার অনেক টাকা হবে তখন সে রোজ এক কৌটা কনডেন্সড দুধ খাবে কিন্তু বেশ খানিকটা ছেড়ে দেবে যেন তার চাকররা তা খেতে পারে।” [আকাক্সক্ষা, ১১৫]

তিনটি পর্বে বিন্যস্ত হাইকেল হাশমীর গল্প, অনুগল্প ও ফ্ল্যাশ ফিকশনগুলো একই সঙ্গে যেমন জীবনঘনিষ্ঠ আবার অন্যদিকে এর শিল্পমানও প্রশ্নাতীত। বহুমুখী এই লেখকের প্রথম গল্পগ্রন্থ হিসেবে ‘বিভ্রমের মগ্নতা’কে উপেক্ষা করার উপায় নেই। বরং গ্রন্থপাঠে গল্পকারের পাঠকসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে ও তার কাছে পাঠকের আরও গল্পগ্রন্থের প্রত্যাশা থাকবে।

বিভ্রমের মগ্নতা : হাইকেল হাশমী। প্রকাশক: সৃজন, ঢাকা। প্রকাশকাল: অমর একুশে বইমেলা ২০২৪। প্রচ্ছদ: দেওয়ান আতিকুর রহমান। মূল্য ৩০০ টাকা।