অলীক সুখ

পলি শাহীনা

তাঁর সুনসান ঘরটিতে ঢুকতেই নীরবতার দেয়াল ঘেঁষে একটা শুভ্র মেঘদল কাশফুলের মতো ছুঁয়ে যায় আমাকে। সামনে-পেছনে, ডানে-বামে, নরম আদরে ঝুঁকে থেকেই টের পাই একটা মিষ্টি ঘ্রাণ বাতাসে ভেসে ভেসে ছড়িয়ে পড়ছে ঘরময়। ঘ্রাণটা ঠিকঠাক চেনা হলেও ভেবে পাই না, যেই ঘ্রাণ চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলেছি সেই ঘ্রাণ এত বছর পর কোথা হতে ভেসে আসছে? ভাবি, জীবন তার পরতে পরতে কার জন্য কী জমিয়ে রেখেছে, তা কারো পক্ষে জানা সম্ভব না। আরো অনেক ভাবনা প্রাণিত করার আগেই মোলায়েম রোদের কাজল পরে তিনি সামনে এসেই জড়িয়ে ধরেন বুকে। তাঁর বুক যেন সবুজ ঘাসের উদ্যান, আমি নিঃশব্দে শিশিরের মতো মিশে থাকি। কিছুক্ষণ যেতেই আবিষ্কার করি, একটা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া অনুভূতি প্রবল আত্মবিশ্বাসী স্বরে ডাকনাম ধরে আমাকে ডাকছে। ক্রমশ, আমি মোমের মতো গলে গলে পড়ছি শুধু। তিনি শিশুর মতো খিলখিল হাসেন, তাঁর হাসিতে যেনো ফুল ফোটে, ঘরে বেড়াতে আসে অলীক সব রঙিন প্রজাপতি। তাঁর চোখজোড়া যেন সূর্যমুখী ক্ষেত, পাশ ঘেঁষে আনন্দ চিত্তে খেলছে ঘাসফড়িংয়ের দল। পানের বাটার মতো তাঁর গোল মুখম-ল ঠিকরে আলোর বিকিরণ সর্বত্র। তাঁর প্রতি আমার বিস্ময় বর্ষার জলধারার মতো বাড়তেই থাকে, মায়াবী ভ্রম হয় স্বপ্ন ভেবে। অন্য রকম এক ঘোরে আমি তাঁর দ্যুতিতে ডুবে যেতে থাকি।

আমাদের মাঝখানে ১৭/১৮ বছরের নতুন একটি মেয়ে এলো তাঁর ঘরটিতে। মেয়েটির নাম রাজিয়া। এবার তাঁর সবটুকু আলো গিয়ে পড়লো রাজিয়ার উপরে। মেয়েটির আগমনে তিনি চঞ্চল হয়ে ওঠেন। আমি আগ্রহ ভরে শুধু তাঁকে দেখছি। আঙুর, আপেল, হরেক পদের মিষ্টি সাজিয়ে মেয়েটির সামনে দেয়া হলো। আতিথিয়েতা দেখে আমি অনিবার্যভাবে ধরে নিলাম মেয়েটি তাঁর নিকটাত্মীয় হবে। তাঁর মুখ দেখে বুঝতে পারি তিনি তৃপ্ত নন, অনবরত উসখুস করছেন মেয়েটিকে আর কী কী দিয়ে সমাদর করা যায়। যেমনটা মনে মনে ভেবেছিলাম, পলক না ফেলতেই তাই সামনে দেখতে পেলাম। তাঁর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কিংবা তৃতীয় নয়ন দেখছি খুবই শক্তিশালী। আচ্ছা, তিনি কি টেলিপ্যাথি জানেন, কী জানি! তিনি রান্নাঘর হতে এটা ওটা এনে মেয়েটির দুই হাত, কোঁচড় প্লাবিত করে দিলেন। এবার তাঁর মুখাবয়বে রোদ্দুর খেলছে, আকাশ যেন বিশাল ঐশ্বর্য ফেলে তাঁর ঘরের জানালায় উঁকি দেয়। আমার সামনে রাখা পানি ভর্তি কাঁচের গ্লাস টেনে তিনি কয়েক ঢোক পানি খান। এ ঘর, ও ঘর পায়চারী করতে করতে বোধ হয় গলা শুকিয়ে এসেছে। তাঁর গ্রীবা এতই স্বচ্ছ যে অধোগামী পানির প্রবাহ প্রত্যক্ষ শেষে তাঁকে আমার চোখে রূপকথায় বর্ণিত ইরান দেশের সুন্দরী মনে হলো। মনোহারী আতিথেয়তা শেষে রাজিয়া যখন বিদায়ের জন্য প্রস্তুত হয় তখন তিনি ওর হাতে কিছু অর্থ গুঁজে দেন। অর্থের পরিমাণ না জানলেও মেয়েটিকে কেনো অর্থ দেয়া হলো, বিষয়টি আমার বোধগম্য হয় না। মেয়েটি কী হয় আপনার? রাজিয়ার প্রস্থান শেষে বসার ঘরের ডান কোণে বসে থাকা আমি মনের ঔৎসুক্য মেটাতে তাঁকে প্রশ্নটা করেই ফেলি। উত্তরে তিনি জানালেন, মেয়েটা তাঁর ঘরের সাহায্যকারীর খালাতো বোন, সাহায্যকারী আর আসবে না, ও অন্তঃসত্ত্বা, রাজিয়া এসেছে ওর হয়ে পাওনা টাকা বুঝে নিতে। যে মেয়েটিকে এতটা সময় ধরে ভেবেছিলাম কাছের কোনো বিশেষ আত্মীয়, ওর পরিচয় জেনে কিছুটা সময় হাঁ হয়ে থাকলেও পরে বুঝতে পারি, তাঁর ঘরজুড়ে এত আলো আর আকাশ ঝুঁকে থাকার হেতু!

মনের শরীরে কিছুটা আলো মেখে বসার ঘর ছেড়ে তাঁর সাজানো-গোছানো বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। হরেক রঙের ফুলসহ পাতাবাহারের অপূর্ব সবুজ ছেয়ে আছে সেখানে। রাজিয়ার সঙ্গে তাঁর মিত্রতা আমার ফেলে আসা শৈশবের বুবীর কথা মনে করিয়ে দেয়। বুবীর নিশ্চয়ই কোনো নাম ছিল, সে নাম আমার মা কিংবা আমি জানতাম না। জানার তো কোনো উপায়ও ছিল না। বুবী কথা বলতে পারতো না, কানে শুনতো না। বুবীর চোখ দুটি যেন পাখির ডানা। একমাত্র আমার মা-ই বুঝতেন তার ডানা ঝাপ্টানো চোখের ভাষা। আমার বয়স তখন সম্ভবত তেরো কি চৌদ্দ বছর। বুবী গ্রামের বাড়ি ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করতো, খাবার চাইতো। যেদিন খাবার জুটতো না সেদিন ¤্রয়িমাণ চোখে নীরবে মায়ের সঙ্গে ঘরের কাজে সাহায্য করতো। কাজ শেষে ঘরের বারান্দায় ছলছল চোখে বসে থাকতো। যথারীতি মা খাবার দিলে খাবার নিয়ে উঠে চলে যেতো। প্রতিদিন না হলেও নিয়ম করে সপ্তাহে দুই-তিন দিন বুবী আসতো। আমাদের পরিবারের সঙ্গে বুবীর একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যখনই বুবী বাড়ি আসতো মায়ের কোনো কাজ করা না লাগলেও মা তাকে খাবার দিতো। মায়ের দেয়া খাবার পেয়ে তার চোখেমুখে একটা তৃপ্তির আভা দেখা যেতো। খাবার ছাড়াও মা তার মাথায় নারকেল তেল লাগিয়ে দিতো। ঝটাওলা উকুন ভর্তি চুলে তেল লাগানোর পর নতুন লাইফবয় সাবান দিতেও দেখেছি। সাবান হাতে পেয়ে ওর চোখজোড়ার নাচন আজো আমার চোখের মণিতে ভাসছে জীবন্ত হয়ে। মাঝেমধ্যে সামর্থ্যনুযায়ী মা তাকে কাপড়ও দিতো। গরমের দিনে মা তাকে ট্যাং-এর শরবত দিলে আমি মায়ের গা ঘেঁষে বলতাম, আমাকে দিবেন না? মা কপালে চুমু খেয়ে বলতেন, ‘দেব পরে!’ আমাদের মা-মেয়ের আদরের দৃশ্য দেখে বুবী হাসতো। মা চলে গেলে বুবী ওর গ্লাস হতে আমাকে শরবত খেতে দিতো। শরবত খাওয়া শেষ হলে উদাস দুপুরে আমরা হাওয়ার মতো ছুটে বেড়াতাম আম-কাঁঠাল-লিচুর ডালে। দাবদাহে ব্রহ্মতালু ফেটে পড়লেও আমি আর বুবী মজে থাকতাম পাখির গানে, ফুলের হাসিতে। আমাদের মনে কোনো ভয়ভীতি ছিল না, আমরা ময়ূরের মতো পেখম মেলে নেচে বেড়াতাম, এক বাড়ি হতে আরেক বাড়ি। কোন গাছে পাখির ছানা ফুটেছে, কোন বাগানে ফল পেকেছে, এইসব ছিলো আমাদের ভাবনাজুড়ে। একদিন, বেগুনি বুনোফুলের অপার রূপ মাধুর্যের ছবি আমি যখন পায়ের নখ দিয়ে মাটির বুকে আঁকছিলাম, মনে পড়ে ঠিক তখনই অদূর হতে ভেসে আসা বিরহী কোকিলের ডাকে বুবীর চোখজোড়া কেমন উদাস হয়ে ওঠে, স্পষ্ট মনে পড়ছে সেই দৃশ্য। বুবী বয়সে আমার চেয়ে ঢের বড় হলেও আমাদের মধ্যে বেশ সখ্য ছিল। আমরা একসঙ্গে ঝিল হতে শাপলা তুলেছি, ধানক্ষেতের আলপথ ধরে হেঁটেছি, বৃষ্টিতে কাদা-জল মেখে উঠোনে ছুটে বেড়িয়েছি, মাটির গন্ধ শুঁকেছি, চোখ বুজে টিনের চালে বৃষ্টির মায়াময় শব্দ শুনেছি, নারকেল পাতার ফাঁক দিয়ে চাঁদের রূপ দেখেছি। সে সময় প্রকৃতির আদরে কত সবুজ, প্রাণবন্ত ছিলাম, আজ পাথরের শহরে আমি যেন এক কংক্রিটের কঙ্কাল।

তো, একদিন স্কুলে যাওয়ার পথে দেখি বুবী দ্রুতবেগে আমাকে পাশ কেটে সামনে চলে যায়, যেন আমাকে চেনেই না। খুব অভিমান হয়। স্কুল থেকে ফিরে মন খারাপ করে মায়ের কাছে বুবীর আমাকে না চেনার ঘটনা বলি। মা শোনেন, কিন্তু কিছুই বলেন না। বুবীর প্রতি মায়ের এহেন নীরব সমর্থনে মনে বেজায় কষ্ট পাই। পরদিন বুবী এলে আমি ওর দিকে আর ফিরেও তাকাই না। গৃহশিক্ষকের দেয়া অতিরিক্ত পড়ার চাপ, এস.এস.সি পরীক্ষার প্রস্তুতি, সব মিলিয়ে মাঝখানে অনেকদিন আর বুবীর কথা মনে পড়ে নি, কিংবা মনে করার ফুরসৎও পাই নি। পরীক্ষা শেষে কোনো এক আয়েসী দিনের শুরুতে নাশতা খেতে খেতে মাকে জিজ্ঞেস করলাম, মা, বুবী আমাদের বাড়িতে আর আসে না কেন? চা পানরত মা চায়ের কাপ হাত থেকে মাটিতে রেখে অনেকটা সময় চুপচাপ শূন্যে তাকিয়ে রইলেন। এরপর বললেন, ‘বুবী মা হতে চলেছিল, কিন্তু সন্তানের বাবার পরিচয় দিতে পারে নি বলে মসজিদের হুজুরসহ গ্রামের মাতব্বর, মুরুব্বিরা ওকে শাস্তি দিয়ে গ্রাম থেকে বের করে দিয়েছে। যেদিন বললি তোকে চেনে নি, সেদিন আমার কাছে এসে পেটে হাত দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে অঝোরে কেঁদেছিলো। আমি ওর চোখের ভাষা বুঝলেও সেদিন কোনো সাহায্য করতে পারি নি। শুধু মনে হয়েছে, যদি সৃষ্টিকর্তার ঠিকানা জানতাম, আমি আগুন, জল সাঁতরে হলেও ছুটে যেতাম সেখানে বুবীর জন্য। কোথায় আছে আজ বুবী, কে জানে!’ মায়ের কথাগুলো শুনে আমি রসুই ঘরের মাটিতে বসে পড়ি। আমার শরীর অবশ হয়ে আসে, চোখে অন্ধকার দেখতে থাকি। মাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলেছিলাম, আমি চারপাশে এত অন্ধকার দেখছি কেন? পৃথিবীর সব আলো কি নিভে গেছে, মা? আমাকে বুকের মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মা বলেছেন, ‘অন্ধকার চিনি না, চিনতেও চাই না। প্রতিদিনের নতুন সূর্য অন্ধকারাবৃত পৃথিবীর পোশাক পালটে ধীরে ধীরে ঠিক আলোর পোশাক পরিয়ে দিবে, আলো আসবেই।’

বুবীর কথা মনে করে মস্তিষ্কে যখন দুদ্দাড় কোলাহল, দৃষ্টিতে অন্ধকার, ঠিক তখনই সূর্যের মতো আলো ছড়িয়ে তিনি এসে আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ান। তাঁর ছোঁয়ায় মনের সব অন্ধকার যেন আলো হয়ে ফুটে ওঠে আমার চারপাশে। তিনি আমাকে নিয়ে কক্ষে ফিরে এসে ‘আনন্দ’ নামক তাঁর গল্পের ঝুড়ি খুলে বসেন, আমি গল্পে মনোযোগ দিই। তাঁর গল্পের বাঁকে বাঁকে আনন্দের ঢেউ, আমি ভেসে যেতে থাকি। গল্পের ছায়ায় হাঁটতে হাঁটতে আমরা পৌঁছে যাই পরাণ পুর গ্রামে। আহ্, সেই গ্রামে এত পাখি, ফুল, ফল, ভ্রমর, সবুজ, মানুষের গান, আমরা মহানন্দে মেতে উঠি। তিনি যেন বটগাছ, তাঁর মনের কোণে শীতিল পাটি পাতা, আমার ঘুম পায়। ঘুমের মধ্যে দেখি, সবুজ পাড়ের লাল একটা টাঙ্গাইল শাড়ি পরে আমার মা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে সুরমা লাগাচ্ছেন। কপালে সবুজ টিপ, গলায় সোনার হার, হাতে লাল কাঁচের চুড়ি, পায়ে রুপোর মল, নান্দনিক সাজে মাকে অপূর্ব লাগছে, আমি মায়ের দিকে অপলক তাকিয়ে আছি। ফুলঝুরি হাসিতে ঝলমল করছে মায়ের মুখ। কী যে ভালো লাগছে! মা হাসতে হাসতে শান করা ঘাটের উপর এসে বসেন। হালকা হাওয়ায় মায়ের চুল উড়ছে। জলের ঢেউয়ে মায়ের মুখের আলো দোল খাচ্ছে। মায়ের হাতে অর্ধসমাপ্ত সাদা কাপড়ের হাত পাখাটা, মা হাত পাখার শরীরে সোনামুখি সুঁই-সুতা দিয়ে নিখুঁত পলাশ ফুল আঁকছেন। আমি একবার মায়ের মোহন মুখ দেখি তো পরের বার রক্তরাঙা পলাশ দেখি। আমি আর মা, এখানে সময়ের যেন কোনো হস্তক্ষেপ নেই। মা, শান বাঁধানো ঘাট, উদাস হাওয়া, কোকিলের ডাক, পলাশ, এই যেন চির বসন্ত! আমাদের মাঝখানে বইছে অসীম আনন্দধারা। মায়ের চারপাশে ঝুনঝুন পায়ে আমি হাঁটছি, খেলছি। কখনো মাটিতে দাগ কেটে এক্কাদোক্কা খেলি তো, কখনো মাটিতে গর্ত খুঁড়ে মার্বেল খেলছি। আমার হাত-পায়ের কোনো অবসর নেই, কিছু না কিছু করেই যাচ্ছি। কমলা রোদ্দুরের মতন মা আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন।

কী বিড়বিড় করছো, কী দেখছো ওদিকে?

তাঁর গল্প হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম বলে, তাঁর ডাকে ঘোর থেকে বেরিয়ে মনে মনে অপরাধ বোধ হয়। যতদূর তাঁর গল্পের সঙ্গে ছিলাম, মনে পড়ে শেষ লাইনটা ছিল, ‘তোমার খালু রোজ বাড়ি ফিরে বহুদূর হতে আমার নাম ধরে একাধারে ডেকে যেতো, আমি দরজা খুলে না দেয়া পর্যন্ত কিংবা আমাকে না দেখা অবধি ডেকেই যেতো।’ বাক্যটি বলে তিনি বাচ্চার মতো হাসতে থাকেন। তাঁর ফর্সা মুখখানা জবা ফুলের মতো লাল হয়ে ওঠে, এরপর যে কী বলেছেন এতটা সময় ধরে, মনেনেই। যদি কিছু জানতে চান কী উত্তর দেব, এই দ্বিধা নিয়ে তাঁর দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাতেই তিনি চঞ্চল কিশোরীর মতো আমার হাত ধরে বিছানা ছেড়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ান। বহুদূর দৃষ্টি ছড়িয়ে বলেন, ‘দেখো কী সুন্দর বাতাস বইছে, কত কোকিল ডাকছে, বসন্ত বোধ হয় এসে গেছে।’

তাঁর দৃষ্টি অনন্তের দিকে, যেখানে আকাশ মিশেছে জমিনের সঙ্গে। তিনি প্রকৃতি দেখছেন, আমি দেখছি তাঁকে। তাঁর মুখেচোখে আমি আমার মায়ের ছবি আঁকা দেখছি। তাঁর সর্বাঙ্গ ফুঁড়ে আমার মায়ের ঘ্রাণ বেরিয়ে আসছে। শুনেছি, মায়েরা অমর হয়। তাঁর দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে মনে করার চেষ্টা করছি, জন্মের আগে আমি অদেখা যে শূন্য পিঞ্জিরায় ছিলাম, তিনি কী সেই ব্যক্তি? আমি কি হারিয়ে গিয়েছিলাম কোনো গভীর অরণ্যে? কিংবা ওড়ে গিয়েছিলাম ঝড়ো বাতাসে? যদি এসব কিছুই না হয়, তবে অতিদূর হতে কেমন করে মাটির সাথে মিশে যাওয়া আমার মায়ের আলো, ঘ্রাণ, আদর, স্নেহ ভেসে ভেসে এলো আজ আমার কাছে, তাঁর সান্নিধ্যে? কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে না পেয়ে আনন্দাশ্রু লুকিয়ে আমি তাঁর সমুদ্রসম মা মা গন্ধমাখা বুকের সঙ্গে লেপ্টে থাকি।

বৃহস্পতিবার, ০৪ জুলাই ২০২৪ , ২০ আষাড় ১৪৩১ ২৬ জ্বিলহজ্ব ১৪৪৫

অলীক সুখ

পলি শাহীনা

image

তাঁর সুনসান ঘরটিতে ঢুকতেই নীরবতার দেয়াল ঘেঁষে একটা শুভ্র মেঘদল কাশফুলের মতো ছুঁয়ে যায় আমাকে। সামনে-পেছনে, ডানে-বামে, নরম আদরে ঝুঁকে থেকেই টের পাই একটা মিষ্টি ঘ্রাণ বাতাসে ভেসে ভেসে ছড়িয়ে পড়ছে ঘরময়। ঘ্রাণটা ঠিকঠাক চেনা হলেও ভেবে পাই না, যেই ঘ্রাণ চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলেছি সেই ঘ্রাণ এত বছর পর কোথা হতে ভেসে আসছে? ভাবি, জীবন তার পরতে পরতে কার জন্য কী জমিয়ে রেখেছে, তা কারো পক্ষে জানা সম্ভব না। আরো অনেক ভাবনা প্রাণিত করার আগেই মোলায়েম রোদের কাজল পরে তিনি সামনে এসেই জড়িয়ে ধরেন বুকে। তাঁর বুক যেন সবুজ ঘাসের উদ্যান, আমি নিঃশব্দে শিশিরের মতো মিশে থাকি। কিছুক্ষণ যেতেই আবিষ্কার করি, একটা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া অনুভূতি প্রবল আত্মবিশ্বাসী স্বরে ডাকনাম ধরে আমাকে ডাকছে। ক্রমশ, আমি মোমের মতো গলে গলে পড়ছি শুধু। তিনি শিশুর মতো খিলখিল হাসেন, তাঁর হাসিতে যেনো ফুল ফোটে, ঘরে বেড়াতে আসে অলীক সব রঙিন প্রজাপতি। তাঁর চোখজোড়া যেন সূর্যমুখী ক্ষেত, পাশ ঘেঁষে আনন্দ চিত্তে খেলছে ঘাসফড়িংয়ের দল। পানের বাটার মতো তাঁর গোল মুখম-ল ঠিকরে আলোর বিকিরণ সর্বত্র। তাঁর প্রতি আমার বিস্ময় বর্ষার জলধারার মতো বাড়তেই থাকে, মায়াবী ভ্রম হয় স্বপ্ন ভেবে। অন্য রকম এক ঘোরে আমি তাঁর দ্যুতিতে ডুবে যেতে থাকি।

আমাদের মাঝখানে ১৭/১৮ বছরের নতুন একটি মেয়ে এলো তাঁর ঘরটিতে। মেয়েটির নাম রাজিয়া। এবার তাঁর সবটুকু আলো গিয়ে পড়লো রাজিয়ার উপরে। মেয়েটির আগমনে তিনি চঞ্চল হয়ে ওঠেন। আমি আগ্রহ ভরে শুধু তাঁকে দেখছি। আঙুর, আপেল, হরেক পদের মিষ্টি সাজিয়ে মেয়েটির সামনে দেয়া হলো। আতিথিয়েতা দেখে আমি অনিবার্যভাবে ধরে নিলাম মেয়েটি তাঁর নিকটাত্মীয় হবে। তাঁর মুখ দেখে বুঝতে পারি তিনি তৃপ্ত নন, অনবরত উসখুস করছেন মেয়েটিকে আর কী কী দিয়ে সমাদর করা যায়। যেমনটা মনে মনে ভেবেছিলাম, পলক না ফেলতেই তাই সামনে দেখতে পেলাম। তাঁর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কিংবা তৃতীয় নয়ন দেখছি খুবই শক্তিশালী। আচ্ছা, তিনি কি টেলিপ্যাথি জানেন, কী জানি! তিনি রান্নাঘর হতে এটা ওটা এনে মেয়েটির দুই হাত, কোঁচড় প্লাবিত করে দিলেন। এবার তাঁর মুখাবয়বে রোদ্দুর খেলছে, আকাশ যেন বিশাল ঐশ্বর্য ফেলে তাঁর ঘরের জানালায় উঁকি দেয়। আমার সামনে রাখা পানি ভর্তি কাঁচের গ্লাস টেনে তিনি কয়েক ঢোক পানি খান। এ ঘর, ও ঘর পায়চারী করতে করতে বোধ হয় গলা শুকিয়ে এসেছে। তাঁর গ্রীবা এতই স্বচ্ছ যে অধোগামী পানির প্রবাহ প্রত্যক্ষ শেষে তাঁকে আমার চোখে রূপকথায় বর্ণিত ইরান দেশের সুন্দরী মনে হলো। মনোহারী আতিথেয়তা শেষে রাজিয়া যখন বিদায়ের জন্য প্রস্তুত হয় তখন তিনি ওর হাতে কিছু অর্থ গুঁজে দেন। অর্থের পরিমাণ না জানলেও মেয়েটিকে কেনো অর্থ দেয়া হলো, বিষয়টি আমার বোধগম্য হয় না। মেয়েটি কী হয় আপনার? রাজিয়ার প্রস্থান শেষে বসার ঘরের ডান কোণে বসে থাকা আমি মনের ঔৎসুক্য মেটাতে তাঁকে প্রশ্নটা করেই ফেলি। উত্তরে তিনি জানালেন, মেয়েটা তাঁর ঘরের সাহায্যকারীর খালাতো বোন, সাহায্যকারী আর আসবে না, ও অন্তঃসত্ত্বা, রাজিয়া এসেছে ওর হয়ে পাওনা টাকা বুঝে নিতে। যে মেয়েটিকে এতটা সময় ধরে ভেবেছিলাম কাছের কোনো বিশেষ আত্মীয়, ওর পরিচয় জেনে কিছুটা সময় হাঁ হয়ে থাকলেও পরে বুঝতে পারি, তাঁর ঘরজুড়ে এত আলো আর আকাশ ঝুঁকে থাকার হেতু!

মনের শরীরে কিছুটা আলো মেখে বসার ঘর ছেড়ে তাঁর সাজানো-গোছানো বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। হরেক রঙের ফুলসহ পাতাবাহারের অপূর্ব সবুজ ছেয়ে আছে সেখানে। রাজিয়ার সঙ্গে তাঁর মিত্রতা আমার ফেলে আসা শৈশবের বুবীর কথা মনে করিয়ে দেয়। বুবীর নিশ্চয়ই কোনো নাম ছিল, সে নাম আমার মা কিংবা আমি জানতাম না। জানার তো কোনো উপায়ও ছিল না। বুবী কথা বলতে পারতো না, কানে শুনতো না। বুবীর চোখ দুটি যেন পাখির ডানা। একমাত্র আমার মা-ই বুঝতেন তার ডানা ঝাপ্টানো চোখের ভাষা। আমার বয়স তখন সম্ভবত তেরো কি চৌদ্দ বছর। বুবী গ্রামের বাড়ি ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করতো, খাবার চাইতো। যেদিন খাবার জুটতো না সেদিন ¤্রয়িমাণ চোখে নীরবে মায়ের সঙ্গে ঘরের কাজে সাহায্য করতো। কাজ শেষে ঘরের বারান্দায় ছলছল চোখে বসে থাকতো। যথারীতি মা খাবার দিলে খাবার নিয়ে উঠে চলে যেতো। প্রতিদিন না হলেও নিয়ম করে সপ্তাহে দুই-তিন দিন বুবী আসতো। আমাদের পরিবারের সঙ্গে বুবীর একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যখনই বুবী বাড়ি আসতো মায়ের কোনো কাজ করা না লাগলেও মা তাকে খাবার দিতো। মায়ের দেয়া খাবার পেয়ে তার চোখেমুখে একটা তৃপ্তির আভা দেখা যেতো। খাবার ছাড়াও মা তার মাথায় নারকেল তেল লাগিয়ে দিতো। ঝটাওলা উকুন ভর্তি চুলে তেল লাগানোর পর নতুন লাইফবয় সাবান দিতেও দেখেছি। সাবান হাতে পেয়ে ওর চোখজোড়ার নাচন আজো আমার চোখের মণিতে ভাসছে জীবন্ত হয়ে। মাঝেমধ্যে সামর্থ্যনুযায়ী মা তাকে কাপড়ও দিতো। গরমের দিনে মা তাকে ট্যাং-এর শরবত দিলে আমি মায়ের গা ঘেঁষে বলতাম, আমাকে দিবেন না? মা কপালে চুমু খেয়ে বলতেন, ‘দেব পরে!’ আমাদের মা-মেয়ের আদরের দৃশ্য দেখে বুবী হাসতো। মা চলে গেলে বুবী ওর গ্লাস হতে আমাকে শরবত খেতে দিতো। শরবত খাওয়া শেষ হলে উদাস দুপুরে আমরা হাওয়ার মতো ছুটে বেড়াতাম আম-কাঁঠাল-লিচুর ডালে। দাবদাহে ব্রহ্মতালু ফেটে পড়লেও আমি আর বুবী মজে থাকতাম পাখির গানে, ফুলের হাসিতে। আমাদের মনে কোনো ভয়ভীতি ছিল না, আমরা ময়ূরের মতো পেখম মেলে নেচে বেড়াতাম, এক বাড়ি হতে আরেক বাড়ি। কোন গাছে পাখির ছানা ফুটেছে, কোন বাগানে ফল পেকেছে, এইসব ছিলো আমাদের ভাবনাজুড়ে। একদিন, বেগুনি বুনোফুলের অপার রূপ মাধুর্যের ছবি আমি যখন পায়ের নখ দিয়ে মাটির বুকে আঁকছিলাম, মনে পড়ে ঠিক তখনই অদূর হতে ভেসে আসা বিরহী কোকিলের ডাকে বুবীর চোখজোড়া কেমন উদাস হয়ে ওঠে, স্পষ্ট মনে পড়ছে সেই দৃশ্য। বুবী বয়সে আমার চেয়ে ঢের বড় হলেও আমাদের মধ্যে বেশ সখ্য ছিল। আমরা একসঙ্গে ঝিল হতে শাপলা তুলেছি, ধানক্ষেতের আলপথ ধরে হেঁটেছি, বৃষ্টিতে কাদা-জল মেখে উঠোনে ছুটে বেড়িয়েছি, মাটির গন্ধ শুঁকেছি, চোখ বুজে টিনের চালে বৃষ্টির মায়াময় শব্দ শুনেছি, নারকেল পাতার ফাঁক দিয়ে চাঁদের রূপ দেখেছি। সে সময় প্রকৃতির আদরে কত সবুজ, প্রাণবন্ত ছিলাম, আজ পাথরের শহরে আমি যেন এক কংক্রিটের কঙ্কাল।

তো, একদিন স্কুলে যাওয়ার পথে দেখি বুবী দ্রুতবেগে আমাকে পাশ কেটে সামনে চলে যায়, যেন আমাকে চেনেই না। খুব অভিমান হয়। স্কুল থেকে ফিরে মন খারাপ করে মায়ের কাছে বুবীর আমাকে না চেনার ঘটনা বলি। মা শোনেন, কিন্তু কিছুই বলেন না। বুবীর প্রতি মায়ের এহেন নীরব সমর্থনে মনে বেজায় কষ্ট পাই। পরদিন বুবী এলে আমি ওর দিকে আর ফিরেও তাকাই না। গৃহশিক্ষকের দেয়া অতিরিক্ত পড়ার চাপ, এস.এস.সি পরীক্ষার প্রস্তুতি, সব মিলিয়ে মাঝখানে অনেকদিন আর বুবীর কথা মনে পড়ে নি, কিংবা মনে করার ফুরসৎও পাই নি। পরীক্ষা শেষে কোনো এক আয়েসী দিনের শুরুতে নাশতা খেতে খেতে মাকে জিজ্ঞেস করলাম, মা, বুবী আমাদের বাড়িতে আর আসে না কেন? চা পানরত মা চায়ের কাপ হাত থেকে মাটিতে রেখে অনেকটা সময় চুপচাপ শূন্যে তাকিয়ে রইলেন। এরপর বললেন, ‘বুবী মা হতে চলেছিল, কিন্তু সন্তানের বাবার পরিচয় দিতে পারে নি বলে মসজিদের হুজুরসহ গ্রামের মাতব্বর, মুরুব্বিরা ওকে শাস্তি দিয়ে গ্রাম থেকে বের করে দিয়েছে। যেদিন বললি তোকে চেনে নি, সেদিন আমার কাছে এসে পেটে হাত দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে অঝোরে কেঁদেছিলো। আমি ওর চোখের ভাষা বুঝলেও সেদিন কোনো সাহায্য করতে পারি নি। শুধু মনে হয়েছে, যদি সৃষ্টিকর্তার ঠিকানা জানতাম, আমি আগুন, জল সাঁতরে হলেও ছুটে যেতাম সেখানে বুবীর জন্য। কোথায় আছে আজ বুবী, কে জানে!’ মায়ের কথাগুলো শুনে আমি রসুই ঘরের মাটিতে বসে পড়ি। আমার শরীর অবশ হয়ে আসে, চোখে অন্ধকার দেখতে থাকি। মাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলেছিলাম, আমি চারপাশে এত অন্ধকার দেখছি কেন? পৃথিবীর সব আলো কি নিভে গেছে, মা? আমাকে বুকের মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মা বলেছেন, ‘অন্ধকার চিনি না, চিনতেও চাই না। প্রতিদিনের নতুন সূর্য অন্ধকারাবৃত পৃথিবীর পোশাক পালটে ধীরে ধীরে ঠিক আলোর পোশাক পরিয়ে দিবে, আলো আসবেই।’

বুবীর কথা মনে করে মস্তিষ্কে যখন দুদ্দাড় কোলাহল, দৃষ্টিতে অন্ধকার, ঠিক তখনই সূর্যের মতো আলো ছড়িয়ে তিনি এসে আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ান। তাঁর ছোঁয়ায় মনের সব অন্ধকার যেন আলো হয়ে ফুটে ওঠে আমার চারপাশে। তিনি আমাকে নিয়ে কক্ষে ফিরে এসে ‘আনন্দ’ নামক তাঁর গল্পের ঝুড়ি খুলে বসেন, আমি গল্পে মনোযোগ দিই। তাঁর গল্পের বাঁকে বাঁকে আনন্দের ঢেউ, আমি ভেসে যেতে থাকি। গল্পের ছায়ায় হাঁটতে হাঁটতে আমরা পৌঁছে যাই পরাণ পুর গ্রামে। আহ্, সেই গ্রামে এত পাখি, ফুল, ফল, ভ্রমর, সবুজ, মানুষের গান, আমরা মহানন্দে মেতে উঠি। তিনি যেন বটগাছ, তাঁর মনের কোণে শীতিল পাটি পাতা, আমার ঘুম পায়। ঘুমের মধ্যে দেখি, সবুজ পাড়ের লাল একটা টাঙ্গাইল শাড়ি পরে আমার মা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে সুরমা লাগাচ্ছেন। কপালে সবুজ টিপ, গলায় সোনার হার, হাতে লাল কাঁচের চুড়ি, পায়ে রুপোর মল, নান্দনিক সাজে মাকে অপূর্ব লাগছে, আমি মায়ের দিকে অপলক তাকিয়ে আছি। ফুলঝুরি হাসিতে ঝলমল করছে মায়ের মুখ। কী যে ভালো লাগছে! মা হাসতে হাসতে শান করা ঘাটের উপর এসে বসেন। হালকা হাওয়ায় মায়ের চুল উড়ছে। জলের ঢেউয়ে মায়ের মুখের আলো দোল খাচ্ছে। মায়ের হাতে অর্ধসমাপ্ত সাদা কাপড়ের হাত পাখাটা, মা হাত পাখার শরীরে সোনামুখি সুঁই-সুতা দিয়ে নিখুঁত পলাশ ফুল আঁকছেন। আমি একবার মায়ের মোহন মুখ দেখি তো পরের বার রক্তরাঙা পলাশ দেখি। আমি আর মা, এখানে সময়ের যেন কোনো হস্তক্ষেপ নেই। মা, শান বাঁধানো ঘাট, উদাস হাওয়া, কোকিলের ডাক, পলাশ, এই যেন চির বসন্ত! আমাদের মাঝখানে বইছে অসীম আনন্দধারা। মায়ের চারপাশে ঝুনঝুন পায়ে আমি হাঁটছি, খেলছি। কখনো মাটিতে দাগ কেটে এক্কাদোক্কা খেলি তো, কখনো মাটিতে গর্ত খুঁড়ে মার্বেল খেলছি। আমার হাত-পায়ের কোনো অবসর নেই, কিছু না কিছু করেই যাচ্ছি। কমলা রোদ্দুরের মতন মা আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন।

কী বিড়বিড় করছো, কী দেখছো ওদিকে?

তাঁর গল্প হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম বলে, তাঁর ডাকে ঘোর থেকে বেরিয়ে মনে মনে অপরাধ বোধ হয়। যতদূর তাঁর গল্পের সঙ্গে ছিলাম, মনে পড়ে শেষ লাইনটা ছিল, ‘তোমার খালু রোজ বাড়ি ফিরে বহুদূর হতে আমার নাম ধরে একাধারে ডেকে যেতো, আমি দরজা খুলে না দেয়া পর্যন্ত কিংবা আমাকে না দেখা অবধি ডেকেই যেতো।’ বাক্যটি বলে তিনি বাচ্চার মতো হাসতে থাকেন। তাঁর ফর্সা মুখখানা জবা ফুলের মতো লাল হয়ে ওঠে, এরপর যে কী বলেছেন এতটা সময় ধরে, মনেনেই। যদি কিছু জানতে চান কী উত্তর দেব, এই দ্বিধা নিয়ে তাঁর দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাতেই তিনি চঞ্চল কিশোরীর মতো আমার হাত ধরে বিছানা ছেড়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ান। বহুদূর দৃষ্টি ছড়িয়ে বলেন, ‘দেখো কী সুন্দর বাতাস বইছে, কত কোকিল ডাকছে, বসন্ত বোধ হয় এসে গেছে।’

তাঁর দৃষ্টি অনন্তের দিকে, যেখানে আকাশ মিশেছে জমিনের সঙ্গে। তিনি প্রকৃতি দেখছেন, আমি দেখছি তাঁকে। তাঁর মুখেচোখে আমি আমার মায়ের ছবি আঁকা দেখছি। তাঁর সর্বাঙ্গ ফুঁড়ে আমার মায়ের ঘ্রাণ বেরিয়ে আসছে। শুনেছি, মায়েরা অমর হয়। তাঁর দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে মনে করার চেষ্টা করছি, জন্মের আগে আমি অদেখা যে শূন্য পিঞ্জিরায় ছিলাম, তিনি কী সেই ব্যক্তি? আমি কি হারিয়ে গিয়েছিলাম কোনো গভীর অরণ্যে? কিংবা ওড়ে গিয়েছিলাম ঝড়ো বাতাসে? যদি এসব কিছুই না হয়, তবে অতিদূর হতে কেমন করে মাটির সাথে মিশে যাওয়া আমার মায়ের আলো, ঘ্রাণ, আদর, স্নেহ ভেসে ভেসে এলো আজ আমার কাছে, তাঁর সান্নিধ্যে? কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে না পেয়ে আনন্দাশ্রু লুকিয়ে আমি তাঁর সমুদ্রসম মা মা গন্ধমাখা বুকের সঙ্গে লেপ্টে থাকি।