যদি সবাই এমন কৃতজ্ঞতাপ্রবণ হতো

রিমা চিশতী

কয়দিন ধরে ওকে ঘরে হাঁটাচলা করতে দেখছি। ভালই লাগে যখন সাদা টাইলসের মেঝেতে সে তার গুটি গুটি পা ফেলে হেঁটে বেড়ায়। কিছু বলিনা। গতকাল দেখলাম আমার কম্পিউটার টেবিলের চারপাশে ঘোরাঘুরি করছে তার মনের আনন্দে। কী স্বাধীনতা তার এই রাজ্যের মুকুট বিহীন রাজা। আচ্ছা ওর মাথায় কি মুকুট আছে? ইচ্ছে হয় একবার কাছে গিয়ে দেখি। আবার ভাবি দেখেইবা কী হবে। মুকুট দিয়ে কি রাজা চেনা যায়? ও তো নিজের ইচ্ছে মতো যেখানে খুশি সেখানে যেতে পারে কোনো ভিসা বা পার্সপোট লাগে না। স্বাধীনরা তো এমনিতেই রাজা হয়। মুকুট থাকলেই কি আর না থাকলেই বা কী! শুধু শুধু ওকে বিরক্ত করা হবে।

আজ কিছু লিখব বলে ডায়েরিটা হাতে নিতেই দেখি ও বেচারা আমার ডায়েরির চারপাশ দিয়ে ঘোরাঘুরি করছে। মনে মনে হাসি পেল ওর সাহসের মাত্রাটা আরো একটু বেড়েছে। সেদিন কে যেন বলছিল বাদরকে আদর দিলে মাথায় চড়ে বসে। ওকে তো কিছু বলছিনা । ও কি আদর পেয়ে মাথায় চড়ে বসবে। বাদর মাথায় বসে উকুন খায়, ও মাথায় চড়ে কী করবে? ও কি কালো চুলের জঙ্গলে হেঁটে বেড়াবে? চুল বৃক্ষের মাঝ দিয়ে হেঁটে চলার সময় যদি উঁকুন প-িতকে দেখে তা হলে কি উঁকুনের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করবে এই জঙ্গল আমার বলে। তাহলে চুল জঙ্গলের রাজত্ব কার হবে? তাদের যুদ্ধে কে জিতবে সে ভাবনায় আমি যখন অতল গভীরে ডুবে যাচ্ছি তখন হাতের পিঠে ওর স্পর্শে চেতন ফিরল।

আঙ্গুলের মাঝে ওকে তুলে নিলাম। দুই আঙ্গুল এক সাথে করে টিপ দিলে এখনই সে মরে যাবে। সে দিন ক্লাসে ম্যাডাম বলছিলেন একটা পিঁপড়ের যে শক্তি আছে আমাদের সে শক্তি নেই। আমি তো দুই আঙ্গুলের চাপ দিলে এখনই সে মরে যাবে। তা হলে তার শক্তি আমার চেয়ে বেশি হয় কীভাবে। তা হলে কি একটা পিঁপড়ের বুদ্ধি আমার থেকে বেশি? আমার দুটি আঙ্গুলের মাঝে এখন যার জীবন-মরণ নির্ভর করছে তার বুদ্ধি চিন্তা শক্তি আমার থেকে বেশি! দুটি আঙ্গুল এক সাথে করে টিপ দিয়ে ওকে মেরে ফেলতে গিয়ে ঠিক তখনই মনে হলো ওর কি সংসার আছে? আজ সন্ধ্যায় কি ও ওর প্রেমিকার সাথে দেখা করতে যাবে বলে কথা দিয়ে ঘর থেকে বের হয়েছে? ওর কি সঠিক সময়ে ঘরে ফেরার তাড়া আছে, আছে বউ ছেলে মেয়ের চিন্তা? যদি সন্ধ্যার মধ্যে ঘরে না ফিরে তা হলে ওর বাবা বকা দেবে? রাত হলেই মা প্রদীপ হাতে নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকবে তার খোকার অপেক্ষায়? ও আমার হাতের র্স্পশে উঠে এসে কি খুব বড় কোনো অপরাধ করেছে? আচ্ছা আজ দুপুরে কি ওর খাওয়া হয়েছে? এমন নয়ত কয়েক দিন না খেয়ে থেকে ক্ষিদের যন্ত্রণায় আমার হাতকে তুলতুলে রুটি মনে করেছে?

যখন আমি এই ভাবনার অতল গহীনে মগ্ন তখন সে কোন সুযোগে দুই আঙ্গুলের ফাঁক থেকে বের হয়ে গেল বুঝতে পারিনি। তাকিয়ে দেখি ও আমার হাতের আঙ্গুলের মধ্যে নেই, ঘরের দেয়ালে বেয়ে উপড়ে উঠে যাচ্ছে। হয়ত তার নিজের ঘরে ফিরে যাচ্ছে। ভাল করে তাকিয়ে দেখি ঘরের দেয়াল বেয়ে ওদের দল নেমে আসছে কী সুন্দর এক লাইন ধরে সবাই হেঁটে যাচ্ছে।

তাদের একজন যদি একটু একেবেঁকে যায় তা হলে সম্পূর্ণ লাইন দলের সবাই একেবেঁকে যায়। কত সুন্দর তারা এক মেলবন্ধনে গন্তব্যের দিকে ছুটে চলে। আমার হাতের মুঠোয় থাকা ক্ষুদ্র প্রাণটাও সেই দলে যোগ দিয়েছে। লক্ষ্য করে দেখলাম ও যেন উল্টা পথ দিয়ে যাচ্ছে। যেতে যেতে তার সাথীদের কানে কানে কী যেন বলছে। ইচ্ছে হলো কাছে গিয়ে শুনি ওরা কানাকানি করে কী বলে। আবার ভাবলাম, ওদের ভাষা কি আমি বুঝব যে শুনতে যাব। আরো কি সব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি, মনে নেই।

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে গাছের গোড়ায় পানি দিতে গিয়ে দেখি গোড়ার মাটি এলেবেলে উলটপালট করে নিড়ানি দিয়ে রাখা। দেখে মনে হচ্ছে কেউ যেন খুব যতœ করে মাটি ঊর্বর করার জন্য গাছের গোড়ায় নিড়ানী দিয়ে রেখেছে। মা কয়দিন ধরে আমাকে বলছিল গাছের গোড়ার মাটিগুলো খুব শক্ত হয়ে গিয়েছে গাছগুলো পানি পাচ্ছে না। সেদিন একবার চেষ্টা করে ছুরি দিয়ে মাটি আলগা ও ঝরঝরে করতে পারিনি। মাটি নিড়ানো হয়নি বলে সার দেওয়া হয়নি। গাছগুলো পানি ও অক্সিজেনের অভাবে প্রায় মরে যাচ্ছিল। শুধু ভুলে যাই, একাজ সে কাজের অজুহাতে গাছের মাটি নিড়ানো হয় না আমার। ভুলে যাওয়ার জন্য আজও আবার মায়ের কাছে বকা খেতাম। কে করল এই কাজটি সামনে তাকিয়ে দেখি আমার ঘরময় পায়চারী করা সেই বন্ধুটি বীরদর্পে টবের পাশ দিয়ে হেটে যাচ্ছে। গতকাল ওকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলাম বলে নিজেকে খুব ছোট ও লজ্জিত মনে হলো।

বৃহস্পতিবার, ০৪ জুলাই ২০২৪ , ২০ আষাড় ১৪৩১ ২৬ জ্বিলহজ্ব ১৪৪৫

যদি সবাই এমন কৃতজ্ঞতাপ্রবণ হতো

রিমা চিশতী

image

কয়দিন ধরে ওকে ঘরে হাঁটাচলা করতে দেখছি। ভালই লাগে যখন সাদা টাইলসের মেঝেতে সে তার গুটি গুটি পা ফেলে হেঁটে বেড়ায়। কিছু বলিনা। গতকাল দেখলাম আমার কম্পিউটার টেবিলের চারপাশে ঘোরাঘুরি করছে তার মনের আনন্দে। কী স্বাধীনতা তার এই রাজ্যের মুকুট বিহীন রাজা। আচ্ছা ওর মাথায় কি মুকুট আছে? ইচ্ছে হয় একবার কাছে গিয়ে দেখি। আবার ভাবি দেখেইবা কী হবে। মুকুট দিয়ে কি রাজা চেনা যায়? ও তো নিজের ইচ্ছে মতো যেখানে খুশি সেখানে যেতে পারে কোনো ভিসা বা পার্সপোট লাগে না। স্বাধীনরা তো এমনিতেই রাজা হয়। মুকুট থাকলেই কি আর না থাকলেই বা কী! শুধু শুধু ওকে বিরক্ত করা হবে।

আজ কিছু লিখব বলে ডায়েরিটা হাতে নিতেই দেখি ও বেচারা আমার ডায়েরির চারপাশ দিয়ে ঘোরাঘুরি করছে। মনে মনে হাসি পেল ওর সাহসের মাত্রাটা আরো একটু বেড়েছে। সেদিন কে যেন বলছিল বাদরকে আদর দিলে মাথায় চড়ে বসে। ওকে তো কিছু বলছিনা । ও কি আদর পেয়ে মাথায় চড়ে বসবে। বাদর মাথায় বসে উকুন খায়, ও মাথায় চড়ে কী করবে? ও কি কালো চুলের জঙ্গলে হেঁটে বেড়াবে? চুল বৃক্ষের মাঝ দিয়ে হেঁটে চলার সময় যদি উঁকুন প-িতকে দেখে তা হলে কি উঁকুনের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করবে এই জঙ্গল আমার বলে। তাহলে চুল জঙ্গলের রাজত্ব কার হবে? তাদের যুদ্ধে কে জিতবে সে ভাবনায় আমি যখন অতল গভীরে ডুবে যাচ্ছি তখন হাতের পিঠে ওর স্পর্শে চেতন ফিরল।

আঙ্গুলের মাঝে ওকে তুলে নিলাম। দুই আঙ্গুল এক সাথে করে টিপ দিলে এখনই সে মরে যাবে। সে দিন ক্লাসে ম্যাডাম বলছিলেন একটা পিঁপড়ের যে শক্তি আছে আমাদের সে শক্তি নেই। আমি তো দুই আঙ্গুলের চাপ দিলে এখনই সে মরে যাবে। তা হলে তার শক্তি আমার চেয়ে বেশি হয় কীভাবে। তা হলে কি একটা পিঁপড়ের বুদ্ধি আমার থেকে বেশি? আমার দুটি আঙ্গুলের মাঝে এখন যার জীবন-মরণ নির্ভর করছে তার বুদ্ধি চিন্তা শক্তি আমার থেকে বেশি! দুটি আঙ্গুল এক সাথে করে টিপ দিয়ে ওকে মেরে ফেলতে গিয়ে ঠিক তখনই মনে হলো ওর কি সংসার আছে? আজ সন্ধ্যায় কি ও ওর প্রেমিকার সাথে দেখা করতে যাবে বলে কথা দিয়ে ঘর থেকে বের হয়েছে? ওর কি সঠিক সময়ে ঘরে ফেরার তাড়া আছে, আছে বউ ছেলে মেয়ের চিন্তা? যদি সন্ধ্যার মধ্যে ঘরে না ফিরে তা হলে ওর বাবা বকা দেবে? রাত হলেই মা প্রদীপ হাতে নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকবে তার খোকার অপেক্ষায়? ও আমার হাতের র্স্পশে উঠে এসে কি খুব বড় কোনো অপরাধ করেছে? আচ্ছা আজ দুপুরে কি ওর খাওয়া হয়েছে? এমন নয়ত কয়েক দিন না খেয়ে থেকে ক্ষিদের যন্ত্রণায় আমার হাতকে তুলতুলে রুটি মনে করেছে?

যখন আমি এই ভাবনার অতল গহীনে মগ্ন তখন সে কোন সুযোগে দুই আঙ্গুলের ফাঁক থেকে বের হয়ে গেল বুঝতে পারিনি। তাকিয়ে দেখি ও আমার হাতের আঙ্গুলের মধ্যে নেই, ঘরের দেয়ালে বেয়ে উপড়ে উঠে যাচ্ছে। হয়ত তার নিজের ঘরে ফিরে যাচ্ছে। ভাল করে তাকিয়ে দেখি ঘরের দেয়াল বেয়ে ওদের দল নেমে আসছে কী সুন্দর এক লাইন ধরে সবাই হেঁটে যাচ্ছে।

তাদের একজন যদি একটু একেবেঁকে যায় তা হলে সম্পূর্ণ লাইন দলের সবাই একেবেঁকে যায়। কত সুন্দর তারা এক মেলবন্ধনে গন্তব্যের দিকে ছুটে চলে। আমার হাতের মুঠোয় থাকা ক্ষুদ্র প্রাণটাও সেই দলে যোগ দিয়েছে। লক্ষ্য করে দেখলাম ও যেন উল্টা পথ দিয়ে যাচ্ছে। যেতে যেতে তার সাথীদের কানে কানে কী যেন বলছে। ইচ্ছে হলো কাছে গিয়ে শুনি ওরা কানাকানি করে কী বলে। আবার ভাবলাম, ওদের ভাষা কি আমি বুঝব যে শুনতে যাব। আরো কি সব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি, মনে নেই।

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে গাছের গোড়ায় পানি দিতে গিয়ে দেখি গোড়ার মাটি এলেবেলে উলটপালট করে নিড়ানি দিয়ে রাখা। দেখে মনে হচ্ছে কেউ যেন খুব যতœ করে মাটি ঊর্বর করার জন্য গাছের গোড়ায় নিড়ানী দিয়ে রেখেছে। মা কয়দিন ধরে আমাকে বলছিল গাছের গোড়ার মাটিগুলো খুব শক্ত হয়ে গিয়েছে গাছগুলো পানি পাচ্ছে না। সেদিন একবার চেষ্টা করে ছুরি দিয়ে মাটি আলগা ও ঝরঝরে করতে পারিনি। মাটি নিড়ানো হয়নি বলে সার দেওয়া হয়নি। গাছগুলো পানি ও অক্সিজেনের অভাবে প্রায় মরে যাচ্ছিল। শুধু ভুলে যাই, একাজ সে কাজের অজুহাতে গাছের মাটি নিড়ানো হয় না আমার। ভুলে যাওয়ার জন্য আজও আবার মায়ের কাছে বকা খেতাম। কে করল এই কাজটি সামনে তাকিয়ে দেখি আমার ঘরময় পায়চারী করা সেই বন্ধুটি বীরদর্পে টবের পাশ দিয়ে হেটে যাচ্ছে। গতকাল ওকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলাম বলে নিজেকে খুব ছোট ও লজ্জিত মনে হলো।