নজরুল ও তাঁর সুন্দর

সরকার আবদুল মান্নান

বিস্ময়কর এক জীবনযাপন করে গেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। সেই জীবন সুশৃঙ্খল ছিল না, নিয়ম-নীতির গ-িতে আবদ্ধ ছিল না, হিসাব-নিকাশের প্রথাগত মানসিকতায় সংকীর্ণ ছিল না। বরং যে জীবন তিনি যাপন করে গেছেন সে জীবন ছিল উচ্ছল, উশৃঙ্খল, অবারিত। আর সেখানেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর সুন্দরকে। সেই সুন্দরের নাম দিয়েছেন ‘আমার সুন্দর’। এই লেখাটিকে কবিতা বলা যাবে না; প্রথাগত অর্থে মন্ময় (subjective) বা তন্ময় (objective) প্রবন্ধের সীমায়ও ফেলা যাবে না একে। বরং তৃপ্তি-অতৃপ্তি ও আনন্দ-বেদনার এমন এক যুগল অনুভাবনার স্বতঃস্ফূর্ত উৎসারণ ঘটেছে এই ছোট লেখাটির মধ্যে, যেখানে পরিপূর্ণ এক নজরুলকে অবলীলায় খুঁজে নেওয়া যায়। খুঁজে পাওয়া যায় নজরুলের সকল সৃষ্টির উৎসমুখ। কবি লিখেছেন :

“আমার সুন্দর প্রথম এলেন ছোটগল্প হ’য়ে, তারপর এলেন কবিতা হ’য়ে। তারপর এলেন গান, সুর, ছন্দ ও ভাব হ’য়ে। উপন্যাস, নাটক লেখা (গদ্য) হ’য়েও মাঝে মাঝে এসেছিলেন। ‘ধূমকেত’ ‘লাঙল’ ‘গণবাণী’তে তার পর এই ‘নবযুগে’ তাঁর শক্তি-সুন্দর প্রকাশ এসেছিল; আর তা এল রুদ্র-তেজে, বিপ্লবের, বিদ্রোহের বাণী হয়ে। বলতে ভুলে গেছি, যখন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সৈনিকের সাজে দেশে ফিরে এলাম, তখন হক সাহেবের দৈনিক পত্র ‘নবযুগে’ কী লেখাই লিখলাম, আজ তা মনে নেই; কিন্তু পনের দিনের মধ্যেই কাগজের টাকা বাজেয়াপ্ত হয়ে গেল।

এই গান লিখি ও সুর দিই যখন, তখন অজস্র অর্থ, যশ-সম্মান, অভিনন্দন, ফুল, মালা- বাঙলার ছেলেমেয়েদের ভালোবাসা পেতে লাগলাম। তখন আমার বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ মাত্র। এই সম্মান পাওয়ার কারণ, সাহিত্যিক ও কবিদের মধ্যে আমি প্রথম জেলে যাই, জেলে গিয়ে চল্লিশ দিন অনশন-ব্রত পালন করি, রাজবন্দিদের উপর অত্যাচারের জন্য। এই অপরাধে আমাকে জেলের নানারকম শৃঙ্খলা-বন্ধন (‘লিঙ্ক ফেটার্স’, ‘বার-ফেটার্স’, ‘ক্রস- ফেটার্স’ প্রভৃতি) ও লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়। এই সময় রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বসন্ত’ নাটক আমায় উৎসর্গ করেন। তাঁর এই আশীর্বাদ-মালা পেয়ে আমি জেলের সর্ব-জ্বালা যন্ত্রণা, অনশন-ক্লেশ ভুলে যাই। আমার মতো নগণ্য তরুণ কবিতা-লেখককে কেন তিনি এত অনুগ্রহ ও আনন্দ দিয়েছিলেন, তিনিই জানেন।আমি কোনোদিন জিজ্ঞাসা করিনি, তিনিও বলেননি। আজ এই প্রথম মনে হলো, তাঁর দক্ষিণ হস্ত দিয়ে আমার সুন্দরের আর্শীবাদ এসেছিল, জেলের যন্ত্রণা-ক্লেশ দূর করতে।

তখনো এ কথা ভাবতে পারিনি, এ লেখা আমার নয়, এ লেখা আমারি সুন্দরের, আমারি আত্মা-বিজড়িত আমার পরমাত্মীয়ের।”

বাংলা কাব্যচর্”ার ইতিহাসে ব্যক্তি নজরুল ও তাঁর জীবনাদর্শের সঙ্গে তুলনা চলে এমন কবি দ্বিতীয় জন নেই। সবদিক থেকেই এ কথা সত্য। দারিদ্র্য ও ছন্নছাড়া যে জীবন তিনি যাপন করেছেন তার মর্মে নিহিত ছিল জীবনের প্রতি গভীর মমত্ববোধ, অফুরন্ত ভালোবাসা এবং সত্য, ন্যায় ও সুন্দরের জন্য আত্মোৎসর্গ। ফলে তাঁর দ্রোহে সুন্দর, প্রেমে সুন্দর, ঈশ্বর ভাবনায় সুন্দর, অসাম্প্রদায়িক জীবনভাবনায় সুন্দর, মুক্তি আকাক্সক্ষায় সুন্দর, তারুণ্যভাবনায় সুন্দর। তাঁর অসাধারণ মনোগড়নের সর্বাবয়ব জুড়ে শুধু সুন্দরের অধিষ্ঠান। তাঁর কবিতার মধ্যে আর গানের মধ্যে কাব্যভাষার পরতে পরতে তিনি গেঁথে দিয়েছেন অভিজ্ঞতার সুন্দরতম অনুভবপুঞ্জ। নৈঃসঙ্গের যন্ত্রণা, আকণ্ঠ নিমজ্জিত হতাশার ক্লেদ, যৌনতার বিচিত্র প্রক্ষেপ, ধর্মান্ধতার সঙ্গ-অনুষঙ্গ, সাম্প্রদায়িকতার কূট চাল, মতাদর্শগত অপর ইত্যাকার কোনো অসুন্দর দ্বারা তিনি কখনই অনুপ্রাণিত হননি। এমনকি তাঁর প্রবন্ধে, ভাষণে, গল্প ও উপন্যাসে কোথাও তিনি নেতির পক্ষাবলম্বন করেননি। তাঁর সৃষ্টির মধ্যে ইতি-র জয়জয়কার। কেননা তিনি সুন্দরের পক্ষে, কল্যাণের পক্ষে। বিপুলভাবে খ্যাত এবং বহু পঠিত একমাত্র ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটিকে যদি বিবেচনায় নেওয়া হয় তা হলেও কবির এই অনন্য সুন্দরতার পরিচয় পাওয়া যাবে। এই কবিতার শুরুতে মানবীয় উচ্চতার ও মাহাত্ম্যের যে অসাধারণ কাব্যভাষা তিনি সৃষ্টি করেছেন তা মানুষের মুক্তির সৌন্দর্যকে বিপুল করে তুলেছে। বাঙালি পাঠক মুক্তির এমন অপরিসীম উচ্চতার কথা কখনো কি ভাবতে পেরেছিলেন? ‘মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’/চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’/ ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া,/ খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া,/ উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাতৃর!’ কবি যখন ‘খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া’ এবং ‘ভগবান-বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন’ বলেন তখন তাঁর সাহসের সৌন্দর্য অনুভব করা যায়। কিছুকে বা কাউকে বিন্দুমাত্র পরোয়া না করে দ্রোহের, প্রেমের ও মমত্বের এমন বিস্ময়কর কণ্ঠ এর পূর্বে কখনো কি শোনা গেছে? এই হলো সেই নজরুল যিনি ব্রিটিশ শাসিত একটি পরাধীন ও ঔপনিবেশিক সময়ের সমস্ত গরল আকণ্ঠ পান করেছিলেন এবং সেই ক্লেদের মধ্যে ফোটাতে চেয়েছেন পুষ্প। মানুষের মর্যাদার সৌন্দর্যকে, মুক্তির আনন্দকে এবং ভালোবাসার মাহাত্ম্যকে এতটা প্রত্যক্ষতায় আর কোনো কবি উচ্চারণের সামর্থ্য দেখাননি। ফলে এ দেশের তরুণ পাঠকদের সামনে খুলে গিয়েছিল জীবনের অফুরন্ততার অর্গলসমূহ। তার প্রতিদানও কবিকে তারা দিয়েছেন এবং কবি লাভ করেছেন ‘অজস্র অর্থ, যশ-সম্মান, অভিনন্দন, ফুল, মালা- বাঙলার ছেলেমেয়েদের ভালোবাসা’।

‘মানুষ’ কবিতার মধ্যেও আমরা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের চিরকালের মর্যাদার সৌন্দর্য ধ্বনিত হতে দেখি। মানুষকে তিনি দেখতে চেয়েছেন ধর্ম-বর্ণ ও সম্প্রদাগত তুচ্ছতার ঊর্ধ্বে, দেশ-কাল ও ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে। মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় সত্য ও সৌন্দর্য আর কী হতে পারে? তিনি লিখেছেন :

“গাহি সাম্যের গান-

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।

নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,

সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।”

নজরুল লিখেছেন,

“জেলে আমার সুন্দর শৃংখলের কঠিন মালা পরিয়েছিলেন হাতে পায়ে; জেল থেকে বেরিয়ে এলেই আমার অন্তরতম সুন্দরকে সারা বাঙ্গালাদেশ দিয়েছিল ফুলের শৃংখল, ভালোবাসার চন্দন, আত্মীয়তার আকুলতা। আট বৎসর ধ’রে বাঙ্গালা দেশের প্রায় প্রতি জেলায়, প্রতি মহকুমায়, ছোট-বড় গ্রামে ভ্রমণ ক’রে দেশের স্বাধীনতার জন্য গান গেয়ে’, কখনো কখনো বক্তৃতা দিয়ে বেড়ালাম। এই প্রথম আমার মাতৃভূমি বাঙ্গালাদেশকে ভালোবাসলাম। মনে হ’ল এই আমার মা। তাঁর শ্যাম স্নিগ্ধ মমতায়, তাঁর গভীর স্নেহ-রসে, তাঁর উদার প্রশান্ত আকাশের কখনো ঘন, কখনো ফিরোজা নীলে আমার দেহ-মন-প্রাণ শান্ত উদার আনন্দ-ছন্দে ছন্দায়িত হয়ে উঠল। আমার অন্তরের সুন্দরের এই অপরূপ প্রকাশকে এই প্রথম দেখলাম প্রকাশ-সুন্দর-রূপে, আমার জননী জন্মভূমি-রূপে।”

দেশের প্রতি এই ভালোবাসাবোধ ঊনবিংশ শতকের গোড়া থেকেই আস্তে আস্তে উন্মোচিত হচ্ছিল। কিন্তু প্রায় পুরো এক শত বছর বাঙালি জীবনে দেশপ্রেমের কোনো আদর্শ ছিল না, লক্ষ্য ছিল না, সংগঠিত কোনো অবয়ব ছিল না। নজরুলের এই ভাবনার মধ্যে জাতীয়তাবোধের শাশ^ত এক রূপ ধরা দিল, যাকে বলা যায় চিরকালের সুন্দর। এই দেশপ্রেমের মধ্যে কোনো ক্ষুদ্রতা নেই, জাতপাত ও ধর্ম-বর্ণের কোনো ভেদাভেদ নেই, কোনো সংকীর্ণতা নেই। এর মধ্যে আছে অফুরন্ত উদারতা আর মাহাত্ম্য। এই হলো নজরুলের সুন্দর, তাঁর আনন্দ। দেশপ্রেমের ভিতর দিয়ে তিনি প্রথম তাঁর ‘যৌবন-সুন্দর’-কে ‘প্রেম-সুন্দরকে’ দেখতে পেলেন। এই সুন্দরের পরিচয় তাঁর কত কবিতায়, গানে, প্রবন্ধে আর ভাষণে প্রবল ধারায় প্রবাহিত হয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আর এই সুন্দরের শক্তিতে তিনি জাগিয়ে তুলেছিলেন একটি পরাধীন ও ঘুমন্তপ্রায় জাতির আত্মাকে। আজো তাঁর গান ও কবিতা আমাদের জাগানিয়া শক্তি, আমাদের প্রেরণার উৎস।

একসময় তাঁর পরিচয় ঘটে অন্য এক সুন্দরের সঙ্গে। এর নাম শোক। মমতারসে ¯িœগ্ধ করে তাঁর কোল আলো করে যে পুত্রসন্তানের আগম ঘটে, যে ছিল মোমের মতো সুন্দর, কোমল, করুণ, পেলভ, মমতার মধু-মাধুরী মাখা ছিল যার হাসিতে রস-সুরভি ভরা ছিল যার অন্তর, বসন্ত-রোগে ভুগে একদিন সে হাসতে হাসতে চলে গেল অন্য এক আনন্দধামে। নজরুল লিখেছেন, ‘আমার সুন্দর পৃথিবীর আলো যেন এক নিমেষে নিভে গেল। আমার আনন্দ, কবিতা, হাসি, গান যেন কোথায় পালিয়ে গেল, আমার বিরহ, আমার বেদনা সইতে না পেরে। এই আমার শোক-সুন্দর।’ এই শোক-সুন্দরের প্রবল টানে তাঁকে পেয়ে বসেছিল অধ্যাত্মবাদের চোরাবালি। তিনি ক্রমেই সরে যাচ্ছিলেন সৃষ্টির পথ থেকে, কর্মের পথ থেকে। ইহ-জাগতিকতাকে চেয়েছিলেন অস্বীকার করতে। কিন্তু একসময় তাঁর বোধোদয় ঘটে, ‘মাটির মানুষ মাটিতে ফিরে’ এলেন। কবি লিখেছেন :

“আমি আমার পৃথ্বী-মাতার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের, বাঙ্গলার দিকে, ভারতের দিকে চেয়ে’ দেখলাম; দৈন্যে, দারিদ্র্যে, আনন্দ নেই, দেহে শক্তি নেই, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দৈত্য-দানব-রাক্ষসের নির্যাতনে ক্ষত-বিক্ষত। আমি উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার ক’রে বললাম, “আমি ব্রহ্ম চাই না, আল্লাহ্চাই না, ভগবান চাই না। এই সব নামের কেউ যদি থাকেন তিনি নিজে এসে দেখা দেবেন। আমার বিপুল কর্ম আছে, আমার অপার অসীম এই ধরিত্রী-মাতার ঋণ আছে, আমার বন্দিনী মাকে অসুরের অত্যাচার থেকে ঊদ্ধার ক’রে আবার পূর্ণশ্রী-সুন্দর আনন্দ-সুন্দর না করা পর্যন্ত আমার মুক্তি নেই, আমার শান্তি নেই।”

এই হলো নজরুলের সুন্দরের স্বরূপ। তাঁর মানবী-প্রেম, প্রকৃতি-প্রেম, ধর্ম-প্রেম- সব প্রেমভাবনার মূলে আছে দেশপ্রেম। এই সুন্দরকে আশ্রয় করে গড়ে উঠেছে তাঁর সুন্দরের সৌধ। তিনি একটি ভালোবাসার পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছিলেন, একটি আনন্দিত জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই পৃথিবীতে শোষণ থাকবে না, বঞ্চনা থাকবে না, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ থাকবে না, হিংসা-দ্বেষ ও নিষ্ঠুরতা থাকবে না। এই সুন্দরের আরাধনায় তাঁর কবিতায় ও গানে প্রেমময় সুন্দর ধরা দিয়েছে আনন্দে, উচ্ছ্বাসে ও অফুরন্ত প্রাণময়তায়। সুতরাং তাঁর সৃষ্টির জগৎ তারই সুন্দরের জগৎ, তারই আত্মা-বিজড়িত পরমাত্মীয়ের জগৎ।”

বৃহস্পতিবার, ০৪ জুলাই ২০২৪ , ২০ আষাড় ১৪৩১ ২৬ জ্বিলহজ্ব ১৪৪৫

নজরুল ও তাঁর সুন্দর

সরকার আবদুল মান্নান

image

বিস্ময়কর এক জীবনযাপন করে গেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। সেই জীবন সুশৃঙ্খল ছিল না, নিয়ম-নীতির গ-িতে আবদ্ধ ছিল না, হিসাব-নিকাশের প্রথাগত মানসিকতায় সংকীর্ণ ছিল না। বরং যে জীবন তিনি যাপন করে গেছেন সে জীবন ছিল উচ্ছল, উশৃঙ্খল, অবারিত। আর সেখানেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর সুন্দরকে। সেই সুন্দরের নাম দিয়েছেন ‘আমার সুন্দর’। এই লেখাটিকে কবিতা বলা যাবে না; প্রথাগত অর্থে মন্ময় (subjective) বা তন্ময় (objective) প্রবন্ধের সীমায়ও ফেলা যাবে না একে। বরং তৃপ্তি-অতৃপ্তি ও আনন্দ-বেদনার এমন এক যুগল অনুভাবনার স্বতঃস্ফূর্ত উৎসারণ ঘটেছে এই ছোট লেখাটির মধ্যে, যেখানে পরিপূর্ণ এক নজরুলকে অবলীলায় খুঁজে নেওয়া যায়। খুঁজে পাওয়া যায় নজরুলের সকল সৃষ্টির উৎসমুখ। কবি লিখেছেন :

“আমার সুন্দর প্রথম এলেন ছোটগল্প হ’য়ে, তারপর এলেন কবিতা হ’য়ে। তারপর এলেন গান, সুর, ছন্দ ও ভাব হ’য়ে। উপন্যাস, নাটক লেখা (গদ্য) হ’য়েও মাঝে মাঝে এসেছিলেন। ‘ধূমকেত’ ‘লাঙল’ ‘গণবাণী’তে তার পর এই ‘নবযুগে’ তাঁর শক্তি-সুন্দর প্রকাশ এসেছিল; আর তা এল রুদ্র-তেজে, বিপ্লবের, বিদ্রোহের বাণী হয়ে। বলতে ভুলে গেছি, যখন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সৈনিকের সাজে দেশে ফিরে এলাম, তখন হক সাহেবের দৈনিক পত্র ‘নবযুগে’ কী লেখাই লিখলাম, আজ তা মনে নেই; কিন্তু পনের দিনের মধ্যেই কাগজের টাকা বাজেয়াপ্ত হয়ে গেল।

এই গান লিখি ও সুর দিই যখন, তখন অজস্র অর্থ, যশ-সম্মান, অভিনন্দন, ফুল, মালা- বাঙলার ছেলেমেয়েদের ভালোবাসা পেতে লাগলাম। তখন আমার বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ মাত্র। এই সম্মান পাওয়ার কারণ, সাহিত্যিক ও কবিদের মধ্যে আমি প্রথম জেলে যাই, জেলে গিয়ে চল্লিশ দিন অনশন-ব্রত পালন করি, রাজবন্দিদের উপর অত্যাচারের জন্য। এই অপরাধে আমাকে জেলের নানারকম শৃঙ্খলা-বন্ধন (‘লিঙ্ক ফেটার্স’, ‘বার-ফেটার্স’, ‘ক্রস- ফেটার্স’ প্রভৃতি) ও লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়। এই সময় রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বসন্ত’ নাটক আমায় উৎসর্গ করেন। তাঁর এই আশীর্বাদ-মালা পেয়ে আমি জেলের সর্ব-জ্বালা যন্ত্রণা, অনশন-ক্লেশ ভুলে যাই। আমার মতো নগণ্য তরুণ কবিতা-লেখককে কেন তিনি এত অনুগ্রহ ও আনন্দ দিয়েছিলেন, তিনিই জানেন।আমি কোনোদিন জিজ্ঞাসা করিনি, তিনিও বলেননি। আজ এই প্রথম মনে হলো, তাঁর দক্ষিণ হস্ত দিয়ে আমার সুন্দরের আর্শীবাদ এসেছিল, জেলের যন্ত্রণা-ক্লেশ দূর করতে।

তখনো এ কথা ভাবতে পারিনি, এ লেখা আমার নয়, এ লেখা আমারি সুন্দরের, আমারি আত্মা-বিজড়িত আমার পরমাত্মীয়ের।”

বাংলা কাব্যচর্”ার ইতিহাসে ব্যক্তি নজরুল ও তাঁর জীবনাদর্শের সঙ্গে তুলনা চলে এমন কবি দ্বিতীয় জন নেই। সবদিক থেকেই এ কথা সত্য। দারিদ্র্য ও ছন্নছাড়া যে জীবন তিনি যাপন করেছেন তার মর্মে নিহিত ছিল জীবনের প্রতি গভীর মমত্ববোধ, অফুরন্ত ভালোবাসা এবং সত্য, ন্যায় ও সুন্দরের জন্য আত্মোৎসর্গ। ফলে তাঁর দ্রোহে সুন্দর, প্রেমে সুন্দর, ঈশ্বর ভাবনায় সুন্দর, অসাম্প্রদায়িক জীবনভাবনায় সুন্দর, মুক্তি আকাক্সক্ষায় সুন্দর, তারুণ্যভাবনায় সুন্দর। তাঁর অসাধারণ মনোগড়নের সর্বাবয়ব জুড়ে শুধু সুন্দরের অধিষ্ঠান। তাঁর কবিতার মধ্যে আর গানের মধ্যে কাব্যভাষার পরতে পরতে তিনি গেঁথে দিয়েছেন অভিজ্ঞতার সুন্দরতম অনুভবপুঞ্জ। নৈঃসঙ্গের যন্ত্রণা, আকণ্ঠ নিমজ্জিত হতাশার ক্লেদ, যৌনতার বিচিত্র প্রক্ষেপ, ধর্মান্ধতার সঙ্গ-অনুষঙ্গ, সাম্প্রদায়িকতার কূট চাল, মতাদর্শগত অপর ইত্যাকার কোনো অসুন্দর দ্বারা তিনি কখনই অনুপ্রাণিত হননি। এমনকি তাঁর প্রবন্ধে, ভাষণে, গল্প ও উপন্যাসে কোথাও তিনি নেতির পক্ষাবলম্বন করেননি। তাঁর সৃষ্টির মধ্যে ইতি-র জয়জয়কার। কেননা তিনি সুন্দরের পক্ষে, কল্যাণের পক্ষে। বিপুলভাবে খ্যাত এবং বহু পঠিত একমাত্র ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটিকে যদি বিবেচনায় নেওয়া হয় তা হলেও কবির এই অনন্য সুন্দরতার পরিচয় পাওয়া যাবে। এই কবিতার শুরুতে মানবীয় উচ্চতার ও মাহাত্ম্যের যে অসাধারণ কাব্যভাষা তিনি সৃষ্টি করেছেন তা মানুষের মুক্তির সৌন্দর্যকে বিপুল করে তুলেছে। বাঙালি পাঠক মুক্তির এমন অপরিসীম উচ্চতার কথা কখনো কি ভাবতে পেরেছিলেন? ‘মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’/চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’/ ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া,/ খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া,/ উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাতৃর!’ কবি যখন ‘খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া’ এবং ‘ভগবান-বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন’ বলেন তখন তাঁর সাহসের সৌন্দর্য অনুভব করা যায়। কিছুকে বা কাউকে বিন্দুমাত্র পরোয়া না করে দ্রোহের, প্রেমের ও মমত্বের এমন বিস্ময়কর কণ্ঠ এর পূর্বে কখনো কি শোনা গেছে? এই হলো সেই নজরুল যিনি ব্রিটিশ শাসিত একটি পরাধীন ও ঔপনিবেশিক সময়ের সমস্ত গরল আকণ্ঠ পান করেছিলেন এবং সেই ক্লেদের মধ্যে ফোটাতে চেয়েছেন পুষ্প। মানুষের মর্যাদার সৌন্দর্যকে, মুক্তির আনন্দকে এবং ভালোবাসার মাহাত্ম্যকে এতটা প্রত্যক্ষতায় আর কোনো কবি উচ্চারণের সামর্থ্য দেখাননি। ফলে এ দেশের তরুণ পাঠকদের সামনে খুলে গিয়েছিল জীবনের অফুরন্ততার অর্গলসমূহ। তার প্রতিদানও কবিকে তারা দিয়েছেন এবং কবি লাভ করেছেন ‘অজস্র অর্থ, যশ-সম্মান, অভিনন্দন, ফুল, মালা- বাঙলার ছেলেমেয়েদের ভালোবাসা’।

‘মানুষ’ কবিতার মধ্যেও আমরা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের চিরকালের মর্যাদার সৌন্দর্য ধ্বনিত হতে দেখি। মানুষকে তিনি দেখতে চেয়েছেন ধর্ম-বর্ণ ও সম্প্রদাগত তুচ্ছতার ঊর্ধ্বে, দেশ-কাল ও ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে। মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় সত্য ও সৌন্দর্য আর কী হতে পারে? তিনি লিখেছেন :

“গাহি সাম্যের গান-

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।

নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,

সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।”

নজরুল লিখেছেন,

“জেলে আমার সুন্দর শৃংখলের কঠিন মালা পরিয়েছিলেন হাতে পায়ে; জেল থেকে বেরিয়ে এলেই আমার অন্তরতম সুন্দরকে সারা বাঙ্গালাদেশ দিয়েছিল ফুলের শৃংখল, ভালোবাসার চন্দন, আত্মীয়তার আকুলতা। আট বৎসর ধ’রে বাঙ্গালা দেশের প্রায় প্রতি জেলায়, প্রতি মহকুমায়, ছোট-বড় গ্রামে ভ্রমণ ক’রে দেশের স্বাধীনতার জন্য গান গেয়ে’, কখনো কখনো বক্তৃতা দিয়ে বেড়ালাম। এই প্রথম আমার মাতৃভূমি বাঙ্গালাদেশকে ভালোবাসলাম। মনে হ’ল এই আমার মা। তাঁর শ্যাম স্নিগ্ধ মমতায়, তাঁর গভীর স্নেহ-রসে, তাঁর উদার প্রশান্ত আকাশের কখনো ঘন, কখনো ফিরোজা নীলে আমার দেহ-মন-প্রাণ শান্ত উদার আনন্দ-ছন্দে ছন্দায়িত হয়ে উঠল। আমার অন্তরের সুন্দরের এই অপরূপ প্রকাশকে এই প্রথম দেখলাম প্রকাশ-সুন্দর-রূপে, আমার জননী জন্মভূমি-রূপে।”

দেশের প্রতি এই ভালোবাসাবোধ ঊনবিংশ শতকের গোড়া থেকেই আস্তে আস্তে উন্মোচিত হচ্ছিল। কিন্তু প্রায় পুরো এক শত বছর বাঙালি জীবনে দেশপ্রেমের কোনো আদর্শ ছিল না, লক্ষ্য ছিল না, সংগঠিত কোনো অবয়ব ছিল না। নজরুলের এই ভাবনার মধ্যে জাতীয়তাবোধের শাশ^ত এক রূপ ধরা দিল, যাকে বলা যায় চিরকালের সুন্দর। এই দেশপ্রেমের মধ্যে কোনো ক্ষুদ্রতা নেই, জাতপাত ও ধর্ম-বর্ণের কোনো ভেদাভেদ নেই, কোনো সংকীর্ণতা নেই। এর মধ্যে আছে অফুরন্ত উদারতা আর মাহাত্ম্য। এই হলো নজরুলের সুন্দর, তাঁর আনন্দ। দেশপ্রেমের ভিতর দিয়ে তিনি প্রথম তাঁর ‘যৌবন-সুন্দর’-কে ‘প্রেম-সুন্দরকে’ দেখতে পেলেন। এই সুন্দরের পরিচয় তাঁর কত কবিতায়, গানে, প্রবন্ধে আর ভাষণে প্রবল ধারায় প্রবাহিত হয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আর এই সুন্দরের শক্তিতে তিনি জাগিয়ে তুলেছিলেন একটি পরাধীন ও ঘুমন্তপ্রায় জাতির আত্মাকে। আজো তাঁর গান ও কবিতা আমাদের জাগানিয়া শক্তি, আমাদের প্রেরণার উৎস।

একসময় তাঁর পরিচয় ঘটে অন্য এক সুন্দরের সঙ্গে। এর নাম শোক। মমতারসে ¯িœগ্ধ করে তাঁর কোল আলো করে যে পুত্রসন্তানের আগম ঘটে, যে ছিল মোমের মতো সুন্দর, কোমল, করুণ, পেলভ, মমতার মধু-মাধুরী মাখা ছিল যার হাসিতে রস-সুরভি ভরা ছিল যার অন্তর, বসন্ত-রোগে ভুগে একদিন সে হাসতে হাসতে চলে গেল অন্য এক আনন্দধামে। নজরুল লিখেছেন, ‘আমার সুন্দর পৃথিবীর আলো যেন এক নিমেষে নিভে গেল। আমার আনন্দ, কবিতা, হাসি, গান যেন কোথায় পালিয়ে গেল, আমার বিরহ, আমার বেদনা সইতে না পেরে। এই আমার শোক-সুন্দর।’ এই শোক-সুন্দরের প্রবল টানে তাঁকে পেয়ে বসেছিল অধ্যাত্মবাদের চোরাবালি। তিনি ক্রমেই সরে যাচ্ছিলেন সৃষ্টির পথ থেকে, কর্মের পথ থেকে। ইহ-জাগতিকতাকে চেয়েছিলেন অস্বীকার করতে। কিন্তু একসময় তাঁর বোধোদয় ঘটে, ‘মাটির মানুষ মাটিতে ফিরে’ এলেন। কবি লিখেছেন :

“আমি আমার পৃথ্বী-মাতার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের, বাঙ্গলার দিকে, ভারতের দিকে চেয়ে’ দেখলাম; দৈন্যে, দারিদ্র্যে, আনন্দ নেই, দেহে শক্তি নেই, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দৈত্য-দানব-রাক্ষসের নির্যাতনে ক্ষত-বিক্ষত। আমি উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার ক’রে বললাম, “আমি ব্রহ্ম চাই না, আল্লাহ্চাই না, ভগবান চাই না। এই সব নামের কেউ যদি থাকেন তিনি নিজে এসে দেখা দেবেন। আমার বিপুল কর্ম আছে, আমার অপার অসীম এই ধরিত্রী-মাতার ঋণ আছে, আমার বন্দিনী মাকে অসুরের অত্যাচার থেকে ঊদ্ধার ক’রে আবার পূর্ণশ্রী-সুন্দর আনন্দ-সুন্দর না করা পর্যন্ত আমার মুক্তি নেই, আমার শান্তি নেই।”

এই হলো নজরুলের সুন্দরের স্বরূপ। তাঁর মানবী-প্রেম, প্রকৃতি-প্রেম, ধর্ম-প্রেম- সব প্রেমভাবনার মূলে আছে দেশপ্রেম। এই সুন্দরকে আশ্রয় করে গড়ে উঠেছে তাঁর সুন্দরের সৌধ। তিনি একটি ভালোবাসার পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছিলেন, একটি আনন্দিত জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই পৃথিবীতে শোষণ থাকবে না, বঞ্চনা থাকবে না, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ থাকবে না, হিংসা-দ্বেষ ও নিষ্ঠুরতা থাকবে না। এই সুন্দরের আরাধনায় তাঁর কবিতায় ও গানে প্রেমময় সুন্দর ধরা দিয়েছে আনন্দে, উচ্ছ্বাসে ও অফুরন্ত প্রাণময়তায়। সুতরাং তাঁর সৃষ্টির জগৎ তারই সুন্দরের জগৎ, তারই আত্মা-বিজড়িত পরমাত্মীয়ের জগৎ।”