নির্যাতনের মুখে ‘ধর্ষণ ও হত্যার’ জবানবন্দি দিতে বাধ্য করে পুলিশ

নারায়ণগঞ্জে মৃত কিশোরীর জীবিত ফেরার ঘটনায় বিচারিক তদন্তে পুলিশের তদন্তে গাফিলতি ও নির্যাতনের মুখে তিন আসামির ‘ধর্ষণের পর হত্যার’ জবানবন্দি নেয়া হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে বিচারিক তদন্ত প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে জবানবন্দি নেয়ার ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটের কোন অনিয়ম পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

গতকাল দুপুরে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। আদালত এই বিষয়ে পরবর্তী শুনানির তারিখ ১৩ জানুয়ারি নির্ধারণ করেছেন। স্কুলছাত্রীকে অপহরণ মামলায় তিন আসামির ‘ধর্ষণের পর হত্যার’ জবানবন্দি ও দেড় মাস পর সেই স্কুলছাত্রী জিসা মনির ফিরে আসার ঘটনায় বিচারিক তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় নারায়ণগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা ফেরদৌসকে।

ফারহানা ফেরদৌস ওই প্রতিবেদনের মতামত অংশে হাইকোর্টকে জানান, ‘বিচারিক অনুসন্ধানে মামলার এজাহার, সাক্ষীদের প্রদত্ত জবানবন্দি, ভিকটিমের ২২ ধারায় প্রদত্ত জবানবন্দি, আসামিদের ১৬৪ ধারায় প্রদত্ত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, জব্দকৃত আলামতসহ মামলাটির সার্বিক দিক পর্যালোচনা করা হয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৭ ধারা অনুযায়ী আসামিদের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর, ১৬৪ ধারায় আসামিদের দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটদের কোন অনিয়ম বিচারিক অনুসন্ধানকালে প্রতীয়মান হয়নি। তবে পুলিশ হেফাজতে (পুলিশ রিমান্ড) থাকাকালীন তদন্ত কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার এসআই শামীম আল-মামুনের বিরুদ্ধে আসামিদের মারধর, ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে স্বীকারোক্তি প্রদানে বাধ্য করার অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়।’

উল্লেখ্য, গত বছরের ৪ জুলাই নিখোঁজ হয় দেওভোগের একটি সরকারি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণী ছাত্রী জিসা মনি। এই ঘটনার একমাস পর ৬ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় অপহরণ মামলা করেন জিসার বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন। গ্রেফতার করা হয় বন্দর উপজেলার বুরুন্ডি খলিলনগর এলাকার আমজাদ হোসেনের ছেলে আবদুল্লাহ (২২), বুরুন্ডি পশ্চিমপাড়া এলাকার সামসুদ্দিনের ছেলে রকিব (১৯) ও নৌকার মাঝি খলিলকে (৩৬)। নির্যাতনের মুখে আসামিরা ‘জিসা মনিকে অপহরণের পর গণধর্ষণ ও হত্যা করে শীতলক্ষ্যায় লাশ ভাসিয়ে দেয়ার’ কথা উল্লেখ করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। এরপর ২৩ আগস্ট সশরীরে ফিরে আসে জিসা মনি। সে জানায়, প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে গিয়ে তাকে বিয়ে করে আত্মগোপনে ছিল এতদিন।

এই ঘটনা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। প্রশ্নবিদ্ধ হয় পুলিশের তদন্ত ও আদালতে দেয়া আসামির জবানবন্দি। বিষয়টি হাইকোর্টের নজরে আনেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। এরপর আদালত আইনজীবীকে লিখিতভাবে হাইকোর্টে আবেদন করতে বলেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৫ আগস্ট ওই ঘটনায় রিভিশন আবেদন দাখিল করা হয়। রিভিশন আবেদনে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় করা মামলা এবং মামলা পরবর্তী প্রক্রিয়ার শুদ্ধতা, বৈধতা এবং যৌক্তিকতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা হয়। এছাড়া ওই মামলার নথি তলবেরও আবেদন করা হয়। নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক, চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ সুপার, সদর থানার ওসি, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, মূল মামলার বাদী এবং আসামিদের বিবাদী করা হয়।

গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম এবং বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ জীবিত থাকার পরও আপহরণ মামলার আসামিদের ধর্ষণের পর হত্যার স্বীকারোক্তি আদায় সংক্রান্ত সদর থানার কার্যক্রমের বিষয়ে বিচারিক তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্ত শেষে নারায়ণগঞ্জের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে এই প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করতে নির্দেশ দেয়া হয়। সে নির্দেশের ধারাবাহিকতায় ৪ জানুয়ারি হাইকোর্টে সিলগালা করে প্রতিবেদনটি দাখিল করা হয়। আদালত এই বিষয়ে পরবর্তী শুনানির তারিখ ১৩ জানুয়ারি নির্ধারণ করেছেন।

এদিকে এই মামলার তিন আসামি আবদুল্লাহ, রকিব ও খলিল বর্তমানে জামিনে আছেন। মামলাটির তদন্ত করছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মামলার বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘চাঞ্চল্যকর এই মামলাটি গুরুত্ব ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। ওই কিশোরী কোথায় ছিল, কীভাবে দিন কাটিয়েছে, আসামির সম্পৃক্ততা কী ছিল এসব বিষয় তদন্ত করা হচ্ছে। আশা করি দ্রুতই এই মামলার চার্জশিট প্রদান করা হবে।’

বুধবার, ০৬ জানুয়ারী ২০২১ , ২২ পৌষ ১৪২৭, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪২

মৃত কিশোরী জীবিত ফেরা

নির্যাতনের মুখে ‘ধর্ষণ ও হত্যার’ জবানবন্দি দিতে বাধ্য করে পুলিশ

নারায়ণগঞ্জে মৃত কিশোরীর জীবিত ফেরার ঘটনায় বিচারিক তদন্তে পুলিশের তদন্তে গাফিলতি ও নির্যাতনের মুখে তিন আসামির ‘ধর্ষণের পর হত্যার’ জবানবন্দি নেয়া হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে বিচারিক তদন্ত প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে জবানবন্দি নেয়ার ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটের কোন অনিয়ম পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

গতকাল দুপুরে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। আদালত এই বিষয়ে পরবর্তী শুনানির তারিখ ১৩ জানুয়ারি নির্ধারণ করেছেন। স্কুলছাত্রীকে অপহরণ মামলায় তিন আসামির ‘ধর্ষণের পর হত্যার’ জবানবন্দি ও দেড় মাস পর সেই স্কুলছাত্রী জিসা মনির ফিরে আসার ঘটনায় বিচারিক তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় নারায়ণগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা ফেরদৌসকে।

ফারহানা ফেরদৌস ওই প্রতিবেদনের মতামত অংশে হাইকোর্টকে জানান, ‘বিচারিক অনুসন্ধানে মামলার এজাহার, সাক্ষীদের প্রদত্ত জবানবন্দি, ভিকটিমের ২২ ধারায় প্রদত্ত জবানবন্দি, আসামিদের ১৬৪ ধারায় প্রদত্ত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, জব্দকৃত আলামতসহ মামলাটির সার্বিক দিক পর্যালোচনা করা হয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৭ ধারা অনুযায়ী আসামিদের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর, ১৬৪ ধারায় আসামিদের দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটদের কোন অনিয়ম বিচারিক অনুসন্ধানকালে প্রতীয়মান হয়নি। তবে পুলিশ হেফাজতে (পুলিশ রিমান্ড) থাকাকালীন তদন্ত কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার এসআই শামীম আল-মামুনের বিরুদ্ধে আসামিদের মারধর, ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে স্বীকারোক্তি প্রদানে বাধ্য করার অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়।’

উল্লেখ্য, গত বছরের ৪ জুলাই নিখোঁজ হয় দেওভোগের একটি সরকারি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণী ছাত্রী জিসা মনি। এই ঘটনার একমাস পর ৬ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় অপহরণ মামলা করেন জিসার বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন। গ্রেফতার করা হয় বন্দর উপজেলার বুরুন্ডি খলিলনগর এলাকার আমজাদ হোসেনের ছেলে আবদুল্লাহ (২২), বুরুন্ডি পশ্চিমপাড়া এলাকার সামসুদ্দিনের ছেলে রকিব (১৯) ও নৌকার মাঝি খলিলকে (৩৬)। নির্যাতনের মুখে আসামিরা ‘জিসা মনিকে অপহরণের পর গণধর্ষণ ও হত্যা করে শীতলক্ষ্যায় লাশ ভাসিয়ে দেয়ার’ কথা উল্লেখ করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। এরপর ২৩ আগস্ট সশরীরে ফিরে আসে জিসা মনি। সে জানায়, প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে গিয়ে তাকে বিয়ে করে আত্মগোপনে ছিল এতদিন।

এই ঘটনা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। প্রশ্নবিদ্ধ হয় পুলিশের তদন্ত ও আদালতে দেয়া আসামির জবানবন্দি। বিষয়টি হাইকোর্টের নজরে আনেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। এরপর আদালত আইনজীবীকে লিখিতভাবে হাইকোর্টে আবেদন করতে বলেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৫ আগস্ট ওই ঘটনায় রিভিশন আবেদন দাখিল করা হয়। রিভিশন আবেদনে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় করা মামলা এবং মামলা পরবর্তী প্রক্রিয়ার শুদ্ধতা, বৈধতা এবং যৌক্তিকতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা হয়। এছাড়া ওই মামলার নথি তলবেরও আবেদন করা হয়। নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক, চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ সুপার, সদর থানার ওসি, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, মূল মামলার বাদী এবং আসামিদের বিবাদী করা হয়।

গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম এবং বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ জীবিত থাকার পরও আপহরণ মামলার আসামিদের ধর্ষণের পর হত্যার স্বীকারোক্তি আদায় সংক্রান্ত সদর থানার কার্যক্রমের বিষয়ে বিচারিক তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্ত শেষে নারায়ণগঞ্জের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে এই প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করতে নির্দেশ দেয়া হয়। সে নির্দেশের ধারাবাহিকতায় ৪ জানুয়ারি হাইকোর্টে সিলগালা করে প্রতিবেদনটি দাখিল করা হয়। আদালত এই বিষয়ে পরবর্তী শুনানির তারিখ ১৩ জানুয়ারি নির্ধারণ করেছেন।

এদিকে এই মামলার তিন আসামি আবদুল্লাহ, রকিব ও খলিল বর্তমানে জামিনে আছেন। মামলাটির তদন্ত করছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মামলার বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘চাঞ্চল্যকর এই মামলাটি গুরুত্ব ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। ওই কিশোরী কোথায় ছিল, কীভাবে দিন কাটিয়েছে, আসামির সম্পৃক্ততা কী ছিল এসব বিষয় তদন্ত করা হচ্ছে। আশা করি দ্রুতই এই মামলার চার্জশিট প্রদান করা হবে।’