প্রতারকের ‘সঙ্গে কানেকশন’, দায় এড়াতে পারেন না মুসা বিন শমসের

প্রতারক কাদেরের মামলায় ফাঁসতে পারেন বিতর্কিত মুসা বিন শমসের। কাদেরকে গ্রেপ্তারের পর প্রতারণার মামলা তদন্তের অংশ হিসেবে আলোচিত এ ব্যবসায়ীকে জিজ্ঞাসাবাদের পর এমন ইঙ্গিত দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তারা। ডিবির ভাষ্য, কাদেরের বিরুদ্ধে প্রতারণার যে অভিযোগ সেই দ্বায় এড়াতে পারবেন না মুসা বিন শমসের। কারণ কাদেরকে তিনিই আইন উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। অপরদিকে ব্যবসায়ী মুসার দাবি তিনি নিজেও প্রতারিত হয়েছেন প্রতারক কাদেরের দ্বারা।

অতিরিক্ত সচিব পরিচয় দিয়ে প্রতারণার অভিযোগে গত ৭ অক্টোবর আবদুল কাদের নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর অপরাধ তথ্য ও গোয়েন্দা বিভাগ ডিবি। এ সময় তার স্ত্রীসহ আরও কয়েকজনকেও আটক করা হয়। ওই অভিযানে একটি বিলাসবহুল গাড়িও উদ্ধার করা হয়। এছাড়া আটক কাদেরের কাছ থেকে সচিব পরিচয়পত্রের আইডিসহ বিভিন্ন কাগজপত্র উদ্ধার হয়। এ ঘটনায় মামলা করে ডিবি। মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কাদেরকে রিমান্ড হেফাজতেও আনে ডিবি পুলিশ। ডিবি তখন সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছিল, আটক কাদের ব্যবসায়ী মুসার আইন উপদেষ্টা হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন। এরপর এ মামলার তদন্তের নানা তথ্য উপাত্ত সম্পর্কে জানতে ডিবি থেকে ব্যবসায়ী মুসাকে কার্যালয়ে ডাকেন। ডিবির ডাকে সাড়া দিয়ে গতকাল ব্যবসায়ী মুসা, তার স্ত্রী শারমিন চৌধুরী এবং ছেলে জুবেরী হাজ্জাজকে সঙ্গে নিয়ে ডিবি কার্যালয়ে প্রবেশ করে। এরপর বেলা ৩টার পর থেকে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে ডিবি। প্রায় ৩ ঘণ্টা মুসা বিন সমশের ও তার পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ডিবি।

গতকাল সন্ধ্যার পর এক ব্রিফিংয়ে ডিবির যুগ্ম কমিশনসার হারুন অর রশীদ সাংবাদিকদের জানান, অতিরিক্ত সচিব পরিচয়দানকারী আবদুল কাদেরের প্রতারণার দায় মুসা বিন শমসের এড়াতে পারবেন না। কারণ মুসা বিন শমসের প্রতারক কাদেরকে তার আইন উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। তাকে ২০ কোটি টাকার চেক দিয়েছেন। তাকে ‘বাবা’, ‘সোনা’ বলেও ডাকতেন।

যুগ্ম কমিশনার হারুনের দাবি ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে মুসা বিন শমসের দাবি করেছেন তিনি কাদেরের প্রতারণার বিষয়ে কিছু জানেন না। আমরা তাকে বলেছি, একজন নাইন পাস লোককে আপনি না বুঝে কীভাবে নিয়োগ দিলেন, তার থেকে ১০ কোটি টাকা নিয়ে কীভাবে লাভসহ ২০ কোটি টাকার চেক দিলেন? এছাড়া মুসা সাহেব কাদেরের সম্পর্কে বেশি জানেন না বললেও আমরা তার সঙ্গে কাদেরের অজ¯্র কথপোকথন পেয়েছি।

হারুন অর রশীদ বলেছেন, প্রয়োজনে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আবারও ডাকা হতে পারে।

ডিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, সন্ধ্যা ৭টায় ডিবি কার্যালয় থেকে বের হওয়ার পর মুসাবিন শমসের সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। সেখানে তিনি দাবি করেন আমাকে পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার হারুন-অর-রশীদ ডেকেছিলেন। একজন প্রতারক আবদুল কাদের অতিরিক্ত সচিব পরিচয়ে আমার অফিসে গিয়েছিলেন। আমার সঙ্গে বিভিন্ন সময় সে ছবি তোলে। মাঝে মাঝে আমার সামনে বসে বড় পদের লোকদের সঙ্গে সে কথা বলতো। এক সময় আমার কাছে প্রমাণিত হয় সে কোন অতিরিক্ত সচিব নয়, একজন প্রতারক। পরে তাকে আমার এখান থেকে বের করে দেই।

তার বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। আমি স্পষ্ট করে যা জানা ছিল সবই বলেছি। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এতে সন্তুষ্ট হয়েছেন। ওই লোকটি মিথ্যাবাদী। আমিও তার প্রতারণার শিকার। আমি এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিব। এ বিষয়ে আমার আর বলার কিছু নাই। আমার শরীর-স্বাস্থ্য ভালো না।

তিনি বলেন, ওই প্রতারক নিজেকে আমার প্রতিষ্ঠানের আইন উপদেষ্টা পরিচয় দিত। সে কখনও আমার প্রতিষ্ঠানের আইন উপদেষ্টা ছিল না। কেউ আমার সঙ্গে যদি ছবি তোলে পরবর্তী সময়ে সে যদি প্রতারণার সঙ্গে জড়িত থাকে তাহলে আমার করার কিছু আছে। আমি তার দ্বারা কিভাবে এবং কী পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি তার সবকিছু গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে দিয়েছি।

ডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, ৭ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত রাজধানীর কাওরান বাজার, মিরপুর ও গুলশানে অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ। এতে নেতৃত্ব দেন ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের (উত্তর) যুগ্ম-পুলিশ কমিশনার হারুন-অর-রশীদ, গোয়েন্দা গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মশিউর রহমান ও অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. কামরুজ্জামান সরদার। ওই অভিযানে অতিরিক্ত সচিব পরিচয় দিয়ে প্রতারণার অভিযোগে কাদেরকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।

কাদেরের শিক্ষাগত যোগ্যতা দশম শ্রেণী। তবে পরিচয় দিতেন অতিরিক্ত সচিব। এক কোটি ২০ লাখ টাকার প্রাডো গাড়িতে চলাচল। সেই গাড়িতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের স্টিকার ও ফ্ল্যাগস্ট্যান্ড লাগিয়ে ঢুকতেন সচিবালয়ে। ঘনিষ্ঠতা ছিল ক্যাসিনোকা-ে গ্রেপ্ততার ঠিকাদার জিকে শামীমের সঙ্গে। চলাফেরার সময় অস্ত্র ও ওয়াকিটকি নিজেই রাখতেন। নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীও ছিল তার। এক সময় মাছ ধরে জীবিকা উপার্জন করেছেন। সে নোয়াখালীর সুবর্ণচরের ভূমিহীন এক কৃষক পরিবারের সন্তান ছিল। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে দেশের শত শত মানুষের কাছ থেকে সরকারি অনুদানে বাড়ি ও খামার তৈরির নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। আটক করার সময় তার পকেটে অতিরিক্ত সচিবের ভুয়া আইডি কার্ড ও ভিজিটিং কার্ড, অবৈধ বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও এক রাউন্ড গুলি পাওয়া যায়।

বুধবার, ১৩ অক্টোবর ২০২১ , ২৮ আশ্বিন ১৪২৮ ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

প্রতারকের ‘সঙ্গে কানেকশন’, দায় এড়াতে পারেন না মুসা বিন শমসের

প্রতারক কাদেরের মামলায় ফাঁসতে পারেন বিতর্কিত মুসা বিন শমসের। কাদেরকে গ্রেপ্তারের পর প্রতারণার মামলা তদন্তের অংশ হিসেবে আলোচিত এ ব্যবসায়ীকে জিজ্ঞাসাবাদের পর এমন ইঙ্গিত দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তারা। ডিবির ভাষ্য, কাদেরের বিরুদ্ধে প্রতারণার যে অভিযোগ সেই দ্বায় এড়াতে পারবেন না মুসা বিন শমসের। কারণ কাদেরকে তিনিই আইন উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। অপরদিকে ব্যবসায়ী মুসার দাবি তিনি নিজেও প্রতারিত হয়েছেন প্রতারক কাদেরের দ্বারা।

অতিরিক্ত সচিব পরিচয় দিয়ে প্রতারণার অভিযোগে গত ৭ অক্টোবর আবদুল কাদের নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর অপরাধ তথ্য ও গোয়েন্দা বিভাগ ডিবি। এ সময় তার স্ত্রীসহ আরও কয়েকজনকেও আটক করা হয়। ওই অভিযানে একটি বিলাসবহুল গাড়িও উদ্ধার করা হয়। এছাড়া আটক কাদেরের কাছ থেকে সচিব পরিচয়পত্রের আইডিসহ বিভিন্ন কাগজপত্র উদ্ধার হয়। এ ঘটনায় মামলা করে ডিবি। মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কাদেরকে রিমান্ড হেফাজতেও আনে ডিবি পুলিশ। ডিবি তখন সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছিল, আটক কাদের ব্যবসায়ী মুসার আইন উপদেষ্টা হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন। এরপর এ মামলার তদন্তের নানা তথ্য উপাত্ত সম্পর্কে জানতে ডিবি থেকে ব্যবসায়ী মুসাকে কার্যালয়ে ডাকেন। ডিবির ডাকে সাড়া দিয়ে গতকাল ব্যবসায়ী মুসা, তার স্ত্রী শারমিন চৌধুরী এবং ছেলে জুবেরী হাজ্জাজকে সঙ্গে নিয়ে ডিবি কার্যালয়ে প্রবেশ করে। এরপর বেলা ৩টার পর থেকে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে ডিবি। প্রায় ৩ ঘণ্টা মুসা বিন সমশের ও তার পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ডিবি।

গতকাল সন্ধ্যার পর এক ব্রিফিংয়ে ডিবির যুগ্ম কমিশনসার হারুন অর রশীদ সাংবাদিকদের জানান, অতিরিক্ত সচিব পরিচয়দানকারী আবদুল কাদেরের প্রতারণার দায় মুসা বিন শমসের এড়াতে পারবেন না। কারণ মুসা বিন শমসের প্রতারক কাদেরকে তার আইন উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। তাকে ২০ কোটি টাকার চেক দিয়েছেন। তাকে ‘বাবা’, ‘সোনা’ বলেও ডাকতেন।

যুগ্ম কমিশনার হারুনের দাবি ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে মুসা বিন শমসের দাবি করেছেন তিনি কাদেরের প্রতারণার বিষয়ে কিছু জানেন না। আমরা তাকে বলেছি, একজন নাইন পাস লোককে আপনি না বুঝে কীভাবে নিয়োগ দিলেন, তার থেকে ১০ কোটি টাকা নিয়ে কীভাবে লাভসহ ২০ কোটি টাকার চেক দিলেন? এছাড়া মুসা সাহেব কাদেরের সম্পর্কে বেশি জানেন না বললেও আমরা তার সঙ্গে কাদেরের অজ¯্র কথপোকথন পেয়েছি।

হারুন অর রশীদ বলেছেন, প্রয়োজনে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আবারও ডাকা হতে পারে।

ডিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, সন্ধ্যা ৭টায় ডিবি কার্যালয় থেকে বের হওয়ার পর মুসাবিন শমসের সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। সেখানে তিনি দাবি করেন আমাকে পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার হারুন-অর-রশীদ ডেকেছিলেন। একজন প্রতারক আবদুল কাদের অতিরিক্ত সচিব পরিচয়ে আমার অফিসে গিয়েছিলেন। আমার সঙ্গে বিভিন্ন সময় সে ছবি তোলে। মাঝে মাঝে আমার সামনে বসে বড় পদের লোকদের সঙ্গে সে কথা বলতো। এক সময় আমার কাছে প্রমাণিত হয় সে কোন অতিরিক্ত সচিব নয়, একজন প্রতারক। পরে তাকে আমার এখান থেকে বের করে দেই।

তার বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। আমি স্পষ্ট করে যা জানা ছিল সবই বলেছি। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এতে সন্তুষ্ট হয়েছেন। ওই লোকটি মিথ্যাবাদী। আমিও তার প্রতারণার শিকার। আমি এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিব। এ বিষয়ে আমার আর বলার কিছু নাই। আমার শরীর-স্বাস্থ্য ভালো না।

তিনি বলেন, ওই প্রতারক নিজেকে আমার প্রতিষ্ঠানের আইন উপদেষ্টা পরিচয় দিত। সে কখনও আমার প্রতিষ্ঠানের আইন উপদেষ্টা ছিল না। কেউ আমার সঙ্গে যদি ছবি তোলে পরবর্তী সময়ে সে যদি প্রতারণার সঙ্গে জড়িত থাকে তাহলে আমার করার কিছু আছে। আমি তার দ্বারা কিভাবে এবং কী পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছি তার সবকিছু গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে দিয়েছি।

ডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, ৭ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত রাজধানীর কাওরান বাজার, মিরপুর ও গুলশানে অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ। এতে নেতৃত্ব দেন ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের (উত্তর) যুগ্ম-পুলিশ কমিশনার হারুন-অর-রশীদ, গোয়েন্দা গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মশিউর রহমান ও অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. কামরুজ্জামান সরদার। ওই অভিযানে অতিরিক্ত সচিব পরিচয় দিয়ে প্রতারণার অভিযোগে কাদেরকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।

কাদেরের শিক্ষাগত যোগ্যতা দশম শ্রেণী। তবে পরিচয় দিতেন অতিরিক্ত সচিব। এক কোটি ২০ লাখ টাকার প্রাডো গাড়িতে চলাচল। সেই গাড়িতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের স্টিকার ও ফ্ল্যাগস্ট্যান্ড লাগিয়ে ঢুকতেন সচিবালয়ে। ঘনিষ্ঠতা ছিল ক্যাসিনোকা-ে গ্রেপ্ততার ঠিকাদার জিকে শামীমের সঙ্গে। চলাফেরার সময় অস্ত্র ও ওয়াকিটকি নিজেই রাখতেন। নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীও ছিল তার। এক সময় মাছ ধরে জীবিকা উপার্জন করেছেন। সে নোয়াখালীর সুবর্ণচরের ভূমিহীন এক কৃষক পরিবারের সন্তান ছিল। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে দেশের শত শত মানুষের কাছ থেকে সরকারি অনুদানে বাড়ি ও খামার তৈরির নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। আটক করার সময় তার পকেটে অতিরিক্ত সচিবের ভুয়া আইডি কার্ড ও ভিজিটিং কার্ড, অবৈধ বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও এক রাউন্ড গুলি পাওয়া যায়।