শেরপুর সীমান্তে হাতি আতঙ্ক ফসল রক্ষায় নির্ঘুম পাহারা

শেরপুরের শ্রীবরদী সীমান্তে আবারও বন্য হাতির আনাগোনা শুরু হয়েছে। কৃষকের খেতের ফসল পাকতে শুরু করতেই বন্যহাতির দল লোকালয়ে নেমে এসে হানা দেয় আবাদি জমিতে। গত এক সপ্তাহ ধরে হাতির দল খেয়ে সাবাড় করছে, পায়ে মাড়িয়ে নষ্ট করছে খেতের আধপাকা ধান, সীম-বরবটি, করলাসহ নানা ধরনের সবজির আবাদ। মূলত খাবারের সন্ধানেই বন্য হাতির দল লোকালয়ে নেমে আসছে। হাতি তাড়াতে রাত জেগে জান-মাল রক্ষার চেষ্টা করছেন সীমান্ত অঞ্চলের অধিবাসীরা।

এ ব্যাপারে শ্রীবরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিলুফা আক্তার বলেন, আমরা বন্য হাতির হামলায় নিহত, আহত ও ঘরবাড়িসহ ফসল ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে আসছি। তাছাড়া বন্যহাতি তাড়াতে মশাল জ্বালানোর জন্য এলাকাবাসীর মাঝে কেরোসিন তেল ও জেনারেটর চালাতে ডিজেল সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া স্থায়ীভাবে বন্য হাতির কবল থেকে রক্ষা পেতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জোরালো হস্তক্ষেপের কথা জানানো হয়েছে। খুব দ্রুতই পদক্ষেপ নেয়া হবে। বনবিভাগের শেরপুরের এসিএসফ (সহকারী বন সংরক্ষক) বলেন, পাহাড়ি অঞ্চলে হাতি-মানুষে দ্বন্দ্ব নিরসনে সহাবস্থান নিশ্চিত করতে বনবিভাগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এলাকায় এলাকায় এলিফেন্ট রেসপন্স টিম গঠন করে তাদের প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সহায়তা দেয়া হচ্ছে। যাতে লোকালয়ে আসা বন্যহাতিকে উত্ত্যক্ত না করে কিভাবে তাদের ফের বনে ফেরত পাঠানো যায়। বন্যহাতির দ্বারা ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণও দেয়া হচ্ছে।

বনের ভেতর সুফল প্রকল্পের মাধ্যমে হাতির খাবার উপযোগী বনবাগান সৃষ্টিরও চেষ্টা করা হচ্ছে। যাতে বন্যহাতি খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে না আসে। বন বিভাগ জানায়, ২০১৪-১৫ সনে শেরপুরের সীমান্তবর্তী ঝিনাইগাতী উপজেলার তাওয়াকুচা মৌজায় (ভারত সীমান্তঘেষা এলাকা) ময়মনসিংহ বন বিভাগের অধীন রাংটিয়া রেঞ্জের তাওয়াকুচা বিটের আওতায় ৫০ হেক্টর (১২৫ একর) বনভূমিতে বন বিভাগ বন্য হাতির উপদ্রব থেকে বাঁচার লক্ষ্যে হাতির খাদ্য উপযোগী বাগান সৃজন করেছে। সীমান্ত এলাকার মানুষের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে বন বিভাগ ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে ২৭ লক্ষ ৫১ হাজার টাকা ব্যয়ে শেরপুর-জামালপুর সীমান্ত এলাকায় মানুষ হাতি বিরোধ ব্যবস্থাপনা উপ-প্রকল্প হিসেবে বন্য হাতির খাদ্য উপযোগী বাগান সৃজন করা হয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গত ২০১৪-১৫ সনের সৃজিত হাতির খাদ্য হিসেবে ৫০ হেক্টর বাগানে বাঁশ, কলা গাছ, আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, জাম, চাপালিশ, বেল, বড়ই, জাম্বুরা, আমলকি, হরতকি, বহেরা, জলপাইসহ পাশাপাশি চিকরাশি, গামার ও গর্জন গাছ রোপন করা হয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জানান, বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ এর জন্য ১০৯৯ পিলার থেকে ১১০০ পিলার এর মধ্যে বাগানটি সৃজন করা হয়েছে। হাতি সহজেই সৃজিত বাগানে আসতে পারবে এবং হাতি খাদ্য পেলে অন্যান্য স্থানে ছুটোছুটি করবে না। এতে মানুষের জানমালসহ অন্যান্য দিকে ক্ষতিও হবে না। বর্তমানে সৃজিত বাগানের গাছগুলো ১০ থেকে ১১ ফুট উচ্চতা হয়েছে। বাগানটির দু’পাশে টিলার ওপর দুটি টঙ ঘর তৈরি করা হয়েছে। প্রতিদিন ২টি টঙ ঘরে ২৫ জন করে লোক পাহাড়া দিয়ে থাকত কিন্তু বর্তমানে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় বাগান পাহাড়ার কাজে কোন লোক নিয়োজিত নেই। ফলে সৃজিত বাগানটি বন্যহাতি দ্বারা রূপিত কলা গাছ ও বাঁশ গাছের ক্ষতিসাধন হয়েছে। যদি পাহাড়া দেয়ার কাজে লোক নিয়োগ থাকত তাহলে বাগানের অবস্থা আরও ভালো থাকত বলে গজনী বিট কর্মকর্তা মকরুল ইসলাম আকন্দ জানান, এলাকাবাসী বন বিভাগ কর্তৃক বন্য হাতির খাদ্য উপযোগী বাগানটি সৃজিত হওয়ায় বন বিভাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। এছাড়াও হাতি মানুষের মধ্যে নিরাপদ রাখতে সোলার পাওয়ার ফেন্সিং লাইটের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

বর্তমানে সোলার পাউয়ার ফেন্সিং লাইট অকেজো থাকায় হাতি কৃষকদের ক্ষেত নষ্ট করছে। সেই সঙ্গে বন বিভাগ আরও জানায়, হাতির জন্য খাদ্যের সৃজিত বাগানে হাতির দলকে ফিরিয়ে নিতে চেষ্টা করছেন তারা।

গত ১৫ নভেম্বর সোমবার শেরপুর জেলার শ্রীবরদীতে মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব নিরসনে সচেতনতামূলক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। উপজেলার বালিজুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।

শুক্রবার, ১৯ নভেম্বর ২০২১ , ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ ১৩ রবিউস সানি ১৪৪৩

শেরপুর সীমান্তে হাতি আতঙ্ক ফসল রক্ষায় নির্ঘুম পাহারা

image

ঝিনাইগাতী (শেরপুর) : সীমান্তে অবাদে ঘুরে বেড়াচ্ছে বন্যাহাতি -সংবাদ

শেরপুরের শ্রীবরদী সীমান্তে আবারও বন্য হাতির আনাগোনা শুরু হয়েছে। কৃষকের খেতের ফসল পাকতে শুরু করতেই বন্যহাতির দল লোকালয়ে নেমে এসে হানা দেয় আবাদি জমিতে। গত এক সপ্তাহ ধরে হাতির দল খেয়ে সাবাড় করছে, পায়ে মাড়িয়ে নষ্ট করছে খেতের আধপাকা ধান, সীম-বরবটি, করলাসহ নানা ধরনের সবজির আবাদ। মূলত খাবারের সন্ধানেই বন্য হাতির দল লোকালয়ে নেমে আসছে। হাতি তাড়াতে রাত জেগে জান-মাল রক্ষার চেষ্টা করছেন সীমান্ত অঞ্চলের অধিবাসীরা।

এ ব্যাপারে শ্রীবরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিলুফা আক্তার বলেন, আমরা বন্য হাতির হামলায় নিহত, আহত ও ঘরবাড়িসহ ফসল ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে আসছি। তাছাড়া বন্যহাতি তাড়াতে মশাল জ্বালানোর জন্য এলাকাবাসীর মাঝে কেরোসিন তেল ও জেনারেটর চালাতে ডিজেল সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া স্থায়ীভাবে বন্য হাতির কবল থেকে রক্ষা পেতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জোরালো হস্তক্ষেপের কথা জানানো হয়েছে। খুব দ্রুতই পদক্ষেপ নেয়া হবে। বনবিভাগের শেরপুরের এসিএসফ (সহকারী বন সংরক্ষক) বলেন, পাহাড়ি অঞ্চলে হাতি-মানুষে দ্বন্দ্ব নিরসনে সহাবস্থান নিশ্চিত করতে বনবিভাগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এলাকায় এলাকায় এলিফেন্ট রেসপন্স টিম গঠন করে তাদের প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সহায়তা দেয়া হচ্ছে। যাতে লোকালয়ে আসা বন্যহাতিকে উত্ত্যক্ত না করে কিভাবে তাদের ফের বনে ফেরত পাঠানো যায়। বন্যহাতির দ্বারা ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণও দেয়া হচ্ছে।

বনের ভেতর সুফল প্রকল্পের মাধ্যমে হাতির খাবার উপযোগী বনবাগান সৃষ্টিরও চেষ্টা করা হচ্ছে। যাতে বন্যহাতি খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে না আসে। বন বিভাগ জানায়, ২০১৪-১৫ সনে শেরপুরের সীমান্তবর্তী ঝিনাইগাতী উপজেলার তাওয়াকুচা মৌজায় (ভারত সীমান্তঘেষা এলাকা) ময়মনসিংহ বন বিভাগের অধীন রাংটিয়া রেঞ্জের তাওয়াকুচা বিটের আওতায় ৫০ হেক্টর (১২৫ একর) বনভূমিতে বন বিভাগ বন্য হাতির উপদ্রব থেকে বাঁচার লক্ষ্যে হাতির খাদ্য উপযোগী বাগান সৃজন করেছে। সীমান্ত এলাকার মানুষের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে বন বিভাগ ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে ২৭ লক্ষ ৫১ হাজার টাকা ব্যয়ে শেরপুর-জামালপুর সীমান্ত এলাকায় মানুষ হাতি বিরোধ ব্যবস্থাপনা উপ-প্রকল্প হিসেবে বন্য হাতির খাদ্য উপযোগী বাগান সৃজন করা হয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গত ২০১৪-১৫ সনের সৃজিত হাতির খাদ্য হিসেবে ৫০ হেক্টর বাগানে বাঁশ, কলা গাছ, আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, জাম, চাপালিশ, বেল, বড়ই, জাম্বুরা, আমলকি, হরতকি, বহেরা, জলপাইসহ পাশাপাশি চিকরাশি, গামার ও গর্জন গাছ রোপন করা হয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জানান, বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ এর জন্য ১০৯৯ পিলার থেকে ১১০০ পিলার এর মধ্যে বাগানটি সৃজন করা হয়েছে। হাতি সহজেই সৃজিত বাগানে আসতে পারবে এবং হাতি খাদ্য পেলে অন্যান্য স্থানে ছুটোছুটি করবে না। এতে মানুষের জানমালসহ অন্যান্য দিকে ক্ষতিও হবে না। বর্তমানে সৃজিত বাগানের গাছগুলো ১০ থেকে ১১ ফুট উচ্চতা হয়েছে। বাগানটির দু’পাশে টিলার ওপর দুটি টঙ ঘর তৈরি করা হয়েছে। প্রতিদিন ২টি টঙ ঘরে ২৫ জন করে লোক পাহাড়া দিয়ে থাকত কিন্তু বর্তমানে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় বাগান পাহাড়ার কাজে কোন লোক নিয়োজিত নেই। ফলে সৃজিত বাগানটি বন্যহাতি দ্বারা রূপিত কলা গাছ ও বাঁশ গাছের ক্ষতিসাধন হয়েছে। যদি পাহাড়া দেয়ার কাজে লোক নিয়োগ থাকত তাহলে বাগানের অবস্থা আরও ভালো থাকত বলে গজনী বিট কর্মকর্তা মকরুল ইসলাম আকন্দ জানান, এলাকাবাসী বন বিভাগ কর্তৃক বন্য হাতির খাদ্য উপযোগী বাগানটি সৃজিত হওয়ায় বন বিভাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। এছাড়াও হাতি মানুষের মধ্যে নিরাপদ রাখতে সোলার পাওয়ার ফেন্সিং লাইটের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

বর্তমানে সোলার পাউয়ার ফেন্সিং লাইট অকেজো থাকায় হাতি কৃষকদের ক্ষেত নষ্ট করছে। সেই সঙ্গে বন বিভাগ আরও জানায়, হাতির জন্য খাদ্যের সৃজিত বাগানে হাতির দলকে ফিরিয়ে নিতে চেষ্টা করছেন তারা।

গত ১৫ নভেম্বর সোমবার শেরপুর জেলার শ্রীবরদীতে মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব নিরসনে সচেতনতামূলক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। উপজেলার বালিজুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।